|
|
|
|
| |
| মমতার গাড়ির পিছনে ছুটে আলোর হদিস |
| দেবারতি সিংহচৌধুরী |
মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি সেই সবে বেরিয়েছে মহাকরণ থেকে।
গাড়ির পাশে পাশে ছুটছে রোগাপাতলা বছর চোদ্দোর এক কিশোর। পরনে মলিন জামাকাপড়, পায়ে রবারের চটি। ‘দিদি দিদি’ বলে চিৎকার করছে ছেলেটি।
সোমবার রাত তখন ৯টা।
চিৎকার শুনে গাড়ি থামাতে বললেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রশ্ন করলেন, “কী হয়েছে তোমার?”
ছেলেটি নির্ভয়ে তরতরিয়ে বলল, “মামার কাছে থাকতাম। মামা আমাকে বাড়ি থেকে বার করে দিয়েছে। থাকার জায়গা নেই। খেতে পাচ্ছি না। দু’মাস ধরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি। লেখাপড়া করতে চাই। ক্রিকেট খেলতে চাই। আপনি কিছু ব্যবস্থা করে দেবেন দিদি?”
ছেলেটির কথা শোনামাত্র কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারদের ডাকলেন মুখ্যমন্ত্রী। নির্দেশ দিলেন, “ওর জন্য এখনই কিছু একটা ব্যবস্থা করুন।” মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ পেয়ে পুলিশকর্মীরা ছেলেটিকে নিয়ে গেলেন হেয়ার স্ট্রিট থানায়। থানা-পুলিশ দেখে কিছুটা যেন গুটিয়ে গেল ছেলেটি। তার সঙ্গে কথা বলতে ডাকা হল শিশু-কিশোরদের নিয়ে কাজ করা একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে।
ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার নিতাইদাস মুখোপাধ্যায় বলেন, “ছেলেটি প্রথমে হোমে যেতে রাজি হচ্ছিল না। ভয় পাচ্ছিল। ওর সব কথা শুনলাম। হোমে যে ওর কোনও ভয় নেই, এ কথা বোঝাতে ও শেষ পর্যন্ত যেতে রাজি হল। নিয়ে যাওয়া হল পটারি রোডের একটি হোমে।” |
 |
| স্বপ্ন ছোঁয়ার হাসি বিক্রম পোড়েলের। -সুমন বল্লভ |
মঙ্গলবার দুপুরে সেখান থেকে বিক্রম পোড়েল নামে সেই কিশোরকে নিয়ে যাওয়া হয় চাইল্ড ওয়েলফেয়ার (শিশু কল্যাণ) কমিটি বা সিডব্লিউসি-তে। কী ভাবে সে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পৌঁছল, বিক্রমের মুখে সে-কথা শুনে বিস্মিত ওই কমিটির চেয়ারপার্সন অমিতা সেন।
বিক্রম বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল কেন?
বিক্রম বলেছে, ‘‘ছোটবেলায় বাবা-মা মারা গিয়েছে। পড়াশোনা করেছি সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত। দমদম ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনের পাশের সুভাষ পল্লি বস্তিতে থাকতাম মামার সঙ্গে। কিন্তু মামি আমাকে পছন্দ করতেন না। অনেক বার বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছেন মামি। গত ৫ জুন মামি আর মামা বাংলাদেশে চলে যান।” মামার সঙ্গে যেতে চেয়েছিল বিক্রমও। সে জানায়, “কিন্তু কিছুতেই ওঁরা রাজি হলেন না। বললেন, তুই আমাদের কেউ না। যেখানে খুশি চলে যা।’’
হাঁটতে হাঁটতে সে-দিনই কলকাতায় চলে আসে ওই কিশোর। সৌরভ-সচিনের ভক্ত বিক্রম ইডেন গার্ডেন্সের সামনের ফুটপাথে রাত কাটিয়েছে প্রায় দু’সপ্তাহ। এক পোশাকে, না-খেয়ে এক বিকেলে সে হাঁটতে হাঁটতেই চলে যায় কালীঘাটে। তার কথায়, “খালি মনে হচ্ছিল, দিদি হয়তো আমার অবস্থার কথা শুনলে কিছু একটা ব্যবস্থা করবেন। লোককে জিজ্ঞাসা করতে করতে গেলাম কালীঘাটে দিদির বাড়ি। কিন্তু পুলিশ দেখাই করতে দিল না।” একটু থেমে বিক্রম বলল, “দিদির বাড়ির কাছে একটি পানের দোকানে রাত কাটালাম। ঠিক করলাম, মহাকরণে গিয়েই দেখা করব দিদির সঙ্গে।” হাঁটতে হাঁটতে সেখান থেকে সোজা মহাকরণ।
সেটা মে মাসের শেষ। মহাকরণের সামনে অগণিত পুলিশের নজরদারি, গাড়ির ভিড়, মানুষের আনাগোনা দেখে থতমত খেয়ে
গিয়েছিল বিক্রম। রোজ সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মহাকরণের সামনের রাস্তায় একলা একটি ছেলেকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কৌতূহল হয় শশা বিক্রেতা এক মহিলার। বিক্রমের কথায়, “ওই মহিলাই পাশের মিনিবাস স্ট্যান্ডের কাছে রাস্তার ধারের একটা হোটেলে আমার জন্য কাজের ব্যবস্থা করে দেন। সেখানে খেটে দু’বেলার খাওয়াটা পেতাম। কিন্তু সকাল ৬টায় ঘুম থেকে উঠেই মহাকরণের সামনে চলে যেতাম। দেখতাম, দিদি রোজ মহাকরণে ঢুকছেন, বেরোচ্ছেন। কিন্তু পুলিশ সামনে যেতে দিত না।”
এক মাস পরে অবশেষে দেখা হল ‘দিদি’র সঙ্গে। সোমবার রাতে। “মহাকরণ থেকে দিদির গাড়িটা বেরোচ্ছে দেখেই ছুটতে শুরু করি। আমার চিৎকার শুনে দিদি গাড়িটা থামালেন। শুনলেন আমার সব কথা।” বিক্রমের মুখে এই ঘটনার কথা শুনে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির চেয়ারপার্সন অমিতাদেবী বললেন, “ও নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। পড়তে চায়। পছন্দের বিষয় বিজ্ঞান। ক্রিকেট খেলতে চায়। আর যে-ভাবে টানা দু’মাস রাস্তায় থেকে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ওর নিজের কথা বলতে পেরেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।” তাই সাধারণ কোনও হোমে নয়। বিক্রমকে সল্টলেকের একটি বেসরকারি হোমে রাখার ব্যবস্থা হয়েছে। সেখানে খেলাধুলা, পড়াশোনার ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানালেন অমিতাদেবী। দিন সাতেকের মধ্যেই বিক্রমের ঠিকানা হবে ওই হোম। |
|
|
 |
|
|