|
|
|
|
| |
| সীমান্ত-বিরোধও মিটছে মনমোহনের সফরে |
| জয়ন্ত ঘোষাল • নয়াদিল্লি |
ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে প্রায় সব বকেয়া বিবাদেরই অবসান ঘটতে চলেছে আগামী ৬ সেপ্টেম্বর। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের মধ্য দিয়ে যে বিতর্কের জন্ম, ’৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের পরেও গত চল্লিশ বছরে যে বিবাদের মীমাংসা হয়নি, আগামী মাসে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের ঢাকা সফরে সেই সীমান্ত-বিতর্কও মেটার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
 দু’দেশের মধ্যে সীমান্ত চুক্তি, তিস্তা জলবণ্টন চুক্তি তো হচ্ছেই। পাশাপাশি, এক দিকে নেপাল ও অন্য দিকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত বাণিজ্য যোগাযোগ গড়ে তুলতে সড়ক তৈরি করা হবে। বাংলাদেশের বহু পণ্যের উপর ভারতীয়
বাজারে যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। অনুপ চেটিয়ার মতো আলফা জঙ্গিকে ভারতের হাতে তুলে দিতে আইনানুগ ব্যবস্থাও নেবে ঢাকা কর্তৃপক্ষ। আজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা এবং
বিশেষ প্রতিনিধি গহর রিজভি এবং আর্থিক উপদেষ্টা মশিউর রহমান এই সংক্রান্ত বোঝাপড়া ও চুক্তিগুলির সমস্ত খসড়া দিল্লির সঙ্গে চূড়ান্ত করে হাসিমুখে ঢাকা ফিরে গেলেন। তাঁরা প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ের অফিসারদের সঙ্গে
বৈঠক করেন। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরম এবং কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গেও বৈঠক করেন। ছিলেন দিল্লিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারিক করিমও।
গহর রিজভি আজ আনন্দবাজারকে বলেন, “এটুকু বলতে পারি, ৬ সেপ্টেম্বর দু’দেশের জন্যই এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ রচিত হতে চলেছে। এমন সব চুক্তি হবে, যাতে দু’দেশের মানুষই খুশি হবে এবং ভবিষ্যতে চলার পথ আরও পাকাপোক্ত হবে। বাংলাদেশের দায়িত্ব গ্রহণের পর শেখ মুজিবর রহমান যেমন ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতি গঠনের কাজ শুরু করেছিলেন, চেয়েছিলেন ভারত বাংলাদেশের সীমান্ত বিতর্কেরও অবসান হোক। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আকস্মিক মৃত্যু পরিস্থিতিকে বিঘ্নিত করে।” রিজভি বলেন, আজ এত বছর পরে তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেই বিতর্কের অবসান ঘটতে চলেছে। ঢাকার অভিযোগ ছিল, ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা সীমান্ত চুক্তির স্বীকৃতি ভারত কখনওই দেয়নি। তিন বিঘা করিডর নিয়েও প্রতিশ্রুতি রাখা হয়নি। নয়াদিল্লিও এত দিন অভিযোগ করে এসেছে, ভারত-বিরোধী জঙ্গিরা আশ্রয় পাচ্ছে বাংলাদেশের মাটিতে।
এই পারস্পরিক অভিযোগের বরফ গলতে শুরু করে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পরই। তাঁর ভারত সফরে শুরু হয় এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের। স্থির হয়েছে, মনমোহন সিংহের আসন্ন সফরে দু’দেশের প্রধানমন্ত্রী একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করবেন। তাতে ছিটমহল হস্তান্তরের চুক্তির কথা থাকবে। এই চুক্তি অনুসারে ভারতের দিকে ৩০টি ও বাংলাদেশের দিকে ২০টি ছিটমহল রাখা হবে। চিদম্বরম জানিয়েছেন, ওখানে জনগণনা হয়েছে। ওখানকার মানুষ কে কোন দিকে যেতে চান, তা স্থির করার ব্যাপারে তাঁদের মতকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তিস্তা চুক্তির ক্ষেত্রে ঠিক হয়েছে যে, শতকরা ৫০ ভাগ করে জল বণ্টন হবে। জানা গিয়েছে, জল যতটা
পাওয়া যাচ্ছে তার ভিত্তিতে অন্তর্বর্তীকালীন এই চুক্তি হচ্ছে। |
| ঢাকায় লক্ষ্য |
| • তিস্তার জলবণ্টন চুক্তি |
| • সীমান্ত-বিবাদের সমাধান |
| • অনুপ চেটিয়ার হস্তান্তর |
| • ছিটমহল চুক্তির ঘোষণা |
| • নেপাল থেকে চট্টগ্রাম সড়ক |
| • মৈত্রী এক্সপ্রেসেই ইমিগ্রেশন |
|
মশিউর রহমানের বক্তব্য, “আলোচনায় আমরা খুশি। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে বাংলাদেশে যাচ্ছেন, এটা অত্যন্ত ইতিবাচক বিষয়।” কলকাতা ও ঢাকার মধ্যে সপ্তাহে দু’টি ট্রেন চলাচল করে। কিন্তু এই মৈত্রী এক্সপ্রেসে যাত্রী সংখ্যা অত্যন্ত কম। কারণ, মাঝ রাস্তায় চার ঘণ্টা সেটি দাঁড়িয়ে থাকে শুধু অভিবাসনের জন্য। সম্প্রতি চিদম্বরমের ঢাকা সফরে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে আবেদন জানানো হয়, যাতে চলন্ত ট্রেনেই এই অভিবাসনের কাজ সেরে নেওয়া হয়। চিদম্বরম আশ্বাস দেন পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো হবে। পরিকল্পনা রয়েছে, ট্রেনের মধ্যেই একটি বাড়তি কামরা দেওয়া হবে, যাতে চলার পথেই যাত্রীরা অভিবাসন করে নিতে পারেন। আর বাংলাদেশ নামার পরই তৎক্ষণাৎ ভিসা দেওয়া হবে। এই যোগাযোগ বৃদ্ধির ফলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যও বাড়বে বলে মনে করছে দু’দেশই। এ ছাড়া, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী থাকার সময় প্রস্তাব দিয়েছিলেন কলকাতা থেকে অজমের ট্রেন চালু করার। বাংলাদেশ সরকার চাইছেন ওই ট্রেনের সঙ্গে ঢাকার ট্রেনটিকেও যুক্ত করে দেওয়া হোক। বিষয়টি নিয়েও কথা হবে প্রধানমন্ত্রীর সফরে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গে যাচ্ছেন আগামী ২৭ তারিখ।
সেখানে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে তিনি যাবেন পেট্রাপোল সীমান্তে।
মশিউর রহমানের বক্তব্য, সার্কের কাঠামোর মধ্যে যে আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়টি রয়েছে, তা দ্বিপাক্ষিক স্তরে কাজে লাগানো এবং বাড়িয়ে নিয়ে যাওয়াও দু’দেশের লক্ষ্য। ঢাকা চাইছে দু’দেশের মধ্যে জলবিদ্যুৎ ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়িয়ে ভুটানের মতো সস্তায় বিদ্যুৎ পেতে। বাংলাদেশের বক্তব্য, বাণিজ্য বাড়ানোর প্রশ্নে দেশের নিরাপত্তা যাতে বিঘ্নিত না হয় তা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর খোলার ব্যাপারেও সেই সমস্যা রয়েছে। পণ্যবাহী ট্রেনের ক্ষেত্রেও কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে।
তবে ধাপে ধাপে সমস্যার সমাধান করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরে মমতা যাচ্ছেনই। উত্তর পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকেও প্রধানমন্ত্রী তাঁর সঙ্গে বাংলাদেশ নিয়ে যেতে চাইছেন। দেশ ভাগের পর উত্তর পূর্বাঞ্চল সব থেকে বেশি উপদ্রুত হয়েছে। ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়লে স্বাভাবিক ভাবেই দেশের এই অংশ উপকৃত হবে। তাই অসম, মেঘালয় বা মণিপুরের মতো রাজ্যের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়েই আলোচনার টেবিলে বসতে চাইছেন মনমোহন সিংহ। বিদেশ মন্ত্রক সূত্রের খবর, প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরে তিস্তা জল চুক্তির পাশাপাশি ১৯৯৬ সালে করা গঙ্গা চুক্তিরও মূল্যায়ন হতে পারে। |
|
|
 |
|
|