ডাব্‌ল সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে বছরটা শেষ করল সেনসেক্স। একই সঙ্গে আপাতত থিতু হল ৩৪ হাজারের ঘরে। কম যায়নি নিফ্‌টিও। বছর শেষ হওয়ার আগেই পার করেছে ১০,৫০০ অঙ্কের বাধা। গোটা বছর ধরে দুই সূচক এমন দৌড়েছে, যা দেখে মনে হতে পারে, এ যেন রোহিত-বিরাটের যুগলবন্দি।

৭,৪৩০ পয়েন্ট অর্থাৎ ২৭.৯১ শতাংশ বেড়ে ২০১৭ সালের শেষে সেনসেক্স পৌঁছেছে ৩৪,০৫৭ অঙ্কে। আগের বছর সেনসেক্স বেড়েছিল মাত্র ৫০৯ পয়েন্ট বা ১.৯৪ শতাংশ। গত ১২ মাসে মুম্বই শেয়ার বাজারে নথিবদ্ধ সব শেয়ারের বাজার-মূল্য বা মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন বেড়েছে ৪৫ লক্ষ কোটি টাকা। পৌঁছেছে প্রায় ১৫২ লক্ষ কোটি টাকায়। গত বছর নিফ্‌টি বেড়েছে ২৩৪৫ অঙ্ক, অর্থাৎ ২৮.৬৫ শতাংশ। দুই সূচকের এই জয়যাত্রায় বেজায় খুশি লগ্নিকারীরা। মনে রাখতে হবে, সূচক প্রায় ২৮ শতাংশ বাড়লেও অনেক শেয়ার বেড়েছে আরও বেশি হারে। অনেক মিউচুয়াল ফান্ড প্রকল্পও ২০১৭ সালে ৩০ শতাংশের বেশি লাভ বা বৃদ্ধির সুযোগ দিয়েছে। পড়তি সুদের জমানায় এত ভাল রিটার্ন বহু মানুষকে ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে ফান্ডে আসতে উৎসাহিত করছে। গত বছর বিএসই মিডক্যাপ শেয়ার যখন বেড়েছে ৪৮ শতাংশ, তখন স্মলক্যাপ শেয়ার সূচক বেড়েছে কমবেশি ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ লগ্নিকারীদের জন্য বছরটা শেষ হয়েছে এক দারুণ জায়গায়। এ বার চোখ রাখতে হবে নতুন বছরে।

ইকুইটির বাজার এতটা ভাল করলেও গত কয়েক মাস বেশ হতাশ করেছে বন্ড বাজার। ভাল বর্ষা সত্ত্বেও পণ্যমূল্য বাড়তে থাকায় এবং তার জেরে সুদ হ্রাসের আশা কমে আসায় বাজারে পড়তে থাকে বন্ডের দাম। ফলে বাড়তে থাকে তার ইল্ড বা প্রকৃত আয়। ২৮ ডিসেম্বর ইল্ড পৌঁছয় ৭.৩৯৬ শতাংশে, যা আগের ১৭ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। বন্ডের দাম কমতে থাকায় ভাল রকম ন্যাভ কমেছে বন্ড তথা ঋণপত্র ফান্ডগুলির। তবে ইকুইটির অংশটি আশাতীত ভাবে বেড়ে ওঠায় ব্যালান্সড ফান্ডগুলি এতে ততটা আঘাত পায়নি।

বছরের শেষে সুদ-নির্ভর মানুষ বিশেষ ভাবে হতাশ হয়েছেন স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পগুলিতে আর এক দফা সুদ কমায়। তাও ১০ নয়, এক লাফে ২০ বেসিস পয়েন্ট। পণ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং বন্ড ইল্ড বাড়া সত্ত্বেও ডাকঘরে সুদ ছাঁটাই প্রত্যাশিত ছিল না। তবে আশার কথা, প্রবীণ নাগরিকদের প্রকল্পে এই দফায় সুদ কমানো হয়নি। ওই প্রকল্পে বর্তমান সুদের হার ৮.৩ শতাংশ। সুদ কমানো হয়নি ডাকঘর সেভিংস ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেও (৪ %)। প্রবীণ নাগরিকদের জন্য ১০ বছর মেয়াদি বন্ড ছাড়ার পথে এগোচ্ছে ন্যাশনাল হাইওয়ে অথরিটি। এই বন্ডে সুদ দেওয়া হতে পারে ৭.২৫ % থেকে ৭.৫ %। ফেব্রুয়ারির মধ্যেই এই বন্ড বাজারে আসতে পারে। ইস্যুটির প্রাথমিক আকার হতে পারে ৫,০০০ কোটি টাকা।

নতুন ইস্যুর দিক থেকেও ২০১৭ সালটি ছিল অত্যন্ত সফল। এই বছরে বাজারে এসেছিল মোট ১৬৩টি আইপিও। সংগৃহীত হয়েছে প্রায় ৭৬,০০০ কোটি টাকা। আইপিও-র সংখ্যা এবং সংগ্রহের পরিমাণ দু’দিক থেকেই এটি একটি রেকর্ড। রিটার্নের নিরিখে বছরের শ্রেষ্ঠ আইপিও ছিল অ্যাপেক্স ফ্রোজেন ফুডস। ১৭৫ টাকায় ইস্যু করা এই শেয়ার বছরের শেষ দিকে হাতবদল হয়েছে ৮৪০ টাকায়। শতাংশের দিক থেকে লাভ পৌঁছেছে ৩৮০ শতাংশে। অন্যান্য আইপিও, যেগুলি অত্যন্ত ভাল রিটার্ন দিতে পেরেছে, তার মধ্যে আছে শঙ্কর বিল্ডিং, অ্যাভিনিউ সুপার মার্টস, পিএসপি প্রজেক্টস ইত্যাদি।

বিমা ক্ষেত্র থেকে গত বছর বাজারে এসেছে বেশ কয়েকটি নতুন ইস্যু। এই শিল্পের আরও কয়েকটি ইস্যু বাজারে আসবে নতুন বছরে। এ ছাড়া আইপিও নিয়ে বাজারে আসতে চলছে এইচডিএফসি মিউচুয়াল ফান্ড। সারা বছর ধরে উত্থান-পতন চললেও বছরের শেষ দিন পাকা সোনা দৌড় শেষ করেছে ২৯,৯১০ টাকায়। ফলে খানিকটা স্বস্তি পেয়েছেন গোল্ড ইটিএফ-এর লগ্নিকারীরা। তবে শতাংশের হিসেবে ২০১৭ সালে সোনা থেকে লাভ আদৌ নজর টানতে পারেনি। বছরের শেষ দিকে শক্তি প্রদর্শন করেছে ভারতীয় টাকাও। শুক্রবার ডলারে টাকার দাম বেড়ে পৌঁছেছে ৬৩.৮৭ টাকায়। পাউন্ড ৮৬.২৭ টাকা ও ইউরো ৭৬.৫৩ টাকা।

এখন প্রশ্ন, কেমন যাবে ২০১৮?

এই প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে, গত বছর বাজারের ভিত অনেকটাই উপরে উঠে এসেছে। সেই জায়গা থেকে আরও বাড়তে হলে কিন্তু শক্তি দরকার হবে। দরকার সব দিক থেকে অর্থনীতির উন্নয়ন। আর্থিক দিক দিয়ে সরকারের এখন বেশ নাজেহাল অবস্থা। এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে সরকার কী ভাবে সামলায়, তা-ই এখন দেখার! এর কিছুটা উত্তর পাওয়া যেতে পারে বাজেটে, যা পেশ হতে আর মাত্র এক মাস বাকি। তারই মধ্যে প্রকাশিত হবে বেশির ভাগ সংস্থার তৃতীয় ত্রৈমাসিক ফল। এরও একটি বড় প্রভাব থাকবে দুই সূচকের উপর।