দূরত্বটা হয়তো খুব বেশি নয়। তাই বলে ডেলি প্যাসেঞ্জারি!

সেই বেলডাঙা থেকে উল্টোডাঙা — নিত্য দিন এই ১৬০ কিলোমিটার যাতায়াত করতে হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি কলেজের ছাত্রী সুলেখা সরকারকে। বছরভর করতে হয় না। তবে, গত দু’মাস ধরে এটাই রুটিন। সৌজন্যে, ডেঙ্গির দাপট।

মুর্শিদাবাদের মেয়ে সুলেখা পড়েন সল্টলেক সেক্টর ফাইভের কলেজে। ‘পেয়িং গেস্ট’ হিসেবে ছিলেন কেষ্টপুরের ফ্ল্যাটে। কিন্তু সে বাড়িতে দেওয়ালে পেরেক ঠোকা নিষেধ। মশারি টাঙানোরও তাই উপায় নেই।

দিন তিনেক রাতভর মশা মারার কয়েল জ্বালিয়ে ঘুমিয়ে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গিয়েছিল সুলেখার। তার পরেই সে আর তার ‘রুমমেট’, হাড়োয়ার রিতা খাতুন ফ্ল্যাট ছেড়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছেন। আপাতত সেখান থেকেই চলছে কলেজে যাতায়াত।

কলকাতায় পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকেন এমন হাজার-হাজার পড়ুয়া এবং চাকরিজীবী। তাঁদের অনেকেরই একই অভিজ্ঞতা হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফ্ল্যাটের দেওয়ালে পেরেক ঠোকা মানা। কিছু-কিছু বাড়িতে আবার আবাসিকেরা এত গাদাগাদি করে থাকেন যে, সবার মশারি টাঙানোর জায়গা হয় না। ফলে কেউই মশারি টাঙাতে পারেন না।

কলকাতার উত্তর হোক বা দক্ষিণ, ডেঙ্গি আতঙ্ক ছড়ানোর পরে অনেকেই আপাতত গিয়ে ঠাঁই নিয়েছেন দেশের বাড়িতে। দমদম, দক্ষিণ দমদম এবং বিধাননগর পুর এলাকায় সংখ্যাটা বেশি। শুধু পেয়িং গেস্ট বা মেস বাড়ির আবাসিকেরাই নন, অনেক ভাড়াটেও ফিরে গিয়েছেন ডেঙ্গির আতঙ্কে। কোথাও সপরিবার, কোথাও বা পরিবারের বাকিদের পাঠিয়ে শুধু চাকরিজীবীরা মাটি কামড়ে পড়ে আছেন।

ফ্ল্যাট মালিকদের একাংশ পেরেক ঠুকতে না দেওয়ার অভিযোগ স্বীকার করতে নারাজ। কেউ-কেউ আবার ফরমানের সপক্ষে যুক্তি সাজাচ্ছেন। সল্টলেক ‘এ জে’ ব্লকের সুবিকাশ চক্রবর্তী জানান, তিনি বছর দশেক ধরে ‘পেয়িং গেস্ট’ রাখছেন। আগে মশারি টাঙানো নিয়ে কিছু বলতাম না। কিন্তু আবাসিকেরা নিজেদের প্রয়োজন মতো দেওয়ালের নানা জায়গায় পেরেক মারেন। কেউ খাট ঘুরিয়ে নতুন জায়গায় পেরেক ঠোকেন তো কেউ জামাকাপড় রাখার জন্য সুবিধা মতো পেরেক বসিয়ে নেন। দেওয়াল নষ্ট হয়। তাঁর দাবি, ‘‘আমায় দু’বার দেওয়াল সারাতে হয়েছে। বাধ্য হয়ে পেরেক মারা বন্ধ করে দিয়েছি।’’ তাঁর বাড়ি থেকেও এক জন গেস্ট চলে গিয়েছেন। তবে, তার কারণ মশারি টাঙাতে না পারা নয় বলে দাবি সুবিকাশবাবুর।

মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জের বিকাশ হাজরার বড় মেয়ে হাজরার একটি ফ্ল্যাটে পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকতেন। সেখানে তাঁকে মশারি টাঙাতে দেওয়া হত না। ডাক্তারির ছাত্রী ওই তরুণী এখন হস্টেলে থাকেন। তাঁর ছোট মেয়ে থাকছিলেন সল্টলেকে। সেখানে একই সমস্যা হওয়ায় মেয়েকে তিনি বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছেন।

কেষ্টপুরের একটি ফ্ল্যাটে পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকেন তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার কর্মী সুরজ জায়সবাল। তাঁরও আক্ষেপ, ‘‘বাড়ির মালিক পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, দেওয়ালে পেরেক বসানো যাবে না। অগত্যা অন্য বাড়ি খুঁজছিলাম। কিন্তু যেখানেই যাই, এক ফরমান।’’ সারা গায়ে মশারোধী ক্রিম মেখে আপাতত চালাচ্ছেন তাঁরা।

অতিথি তাড়িয়ে আপাতত পেয়িং গেস্ট থাকছে মশারাই!

 

কলকাতার আরও খবর পড়তে চোখ রাখুন আনন্দবাজারে।