জি ডি বিড়লার পরে এ বার পথ অবরোধ করলেন এম পি বিড়লা ফাউন্ডেশন হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের অভিভাবকেরা। তিন মাস আগে ওই স্কুলের সাড়ে তিন বছরের এক ছাত্রীর শ্লীলতাহানি করার অভিযোগ উঠেছিল দু’জন শিক্ষাকর্মীর বিরুদ্ধে। তাদের গ্রেফতারের দাবিতে সোমবার প্রায় পাঁচ ঘণ্টা জেমস লং সরণি অবরোধ করলেন ওই স্কুলের পড়ুয়াদের অভিভাবকেরা। বেহালার ওই গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা অবরোধ করায় সারা দিন নাস্তানাবুদ হতে হল সাধারণ মানুষকে। কিন্তু সন্ধ্যায় স্কুলের বাস বেরোনোর সময়ে বিক্ষোভকারীরা পথ আটকালে অভিভাবকদের সরাতে পুলিশ লাঠি চালায়। এমনকী, নির্যাতিতা ছাত্রীর বাবাকেও লাঠি দিয়ে মারা হয়েছে বলে অভিযোগ।

লালবাজারের এক কর্তা জানান, ওই বাসে চেপে স্কুলপড়ুয়াদের সঙ্গে শিক্ষকেরাও বেরোচ্ছিলেন কি না, তা সরেজমিন দেখতে চেয়েছিলেন অভিভাবকেরা। সেই উদ্দেশ্যেই কয়েক জন অভিভাবক বাসের গায়ে ও পুলিশের গাড়িতে হেলমেট দিয়ে মারেন বলে অভিযোগ। ওই পরিস্থিতি সামলাতেই পুলিশকে বলপ্রয়োগ করতে হয়েছে। তবে ছাত্রীর বাবাকে মারধর করার অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

লালবাজার সূত্রের খবর, এ দিন রাতে অভিযুক্তদের মধ্যে এক জন, মনোজ মান্নাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

অবরোধ: জেমস লং সরণি আটকে বসে আছেন বিক্ষোভকারী অভিভাবকেরা। সোমবার। নিজস্ব চিত্র

নির্যাতিতা শিশুটির মায়ের অভিযোগ, গত জুন ও সেপ্টেম্বরে দু’বার ওই স্কুলের ভিতরেই তাঁর সাড়ে তিন বছরের মেয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। স্কুলের দুই শিক্ষাকর্মীর বিরুদ্ধে পুলিশ ও স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানোর পরেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘‘তখন বারবার পুলিশের দ্বারস্থ হয়ে নিরাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে আমাকে।’’ কিন্তু জি ডি বিড়লা স্কুলে চার বছরের ছাত্রীর শ্লীলতাহানির অভিযোগকে নিয়ে তোলপাড় শুরু হতেই তাঁর মেয়ের বিষয়টি সামনে আসে। সোমবার, অভিযুক্তের গ্রেফতারির দাবিতে সকাল থেকেই স্কুলের সামনে জমায়েত শুরু হয়। প্রথমে রাজি না হলেও পরে অভিভাবকদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে কথা বলেন স্কুলের প্রিন্সিপাল হার্বার্ট জর্জ। স্কুলের ভিতর থেকেই মাইকে ঘোষণা করে জানান, পুলিশ নির্দিষ্ট করে অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে
দিলে তাদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করা হবে। কিন্তু দ্রুত গ্রেফতারির দাবি না মানায় বেলা বারোটা থেকে জেমস লং সরণি অবরোধ শুরু করেন অভিভাবকেরা।

আর তা নিয়েই প্রশ্ন তুলতে থাকেন কয়েক জন অভিভাবক। তাঁদের একাংশ পথ অবরোধের বিরোধিতা করে বলেন, সন্তানদের নিরাপত্তার প্রশ্নে অবশ্যই কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহি করতে হবে। অভিযোগের তদন্তও করতে হবে। কিন্তু পথ অবরোধ করে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলা উচিত নয়। অন্য এক অভিভাবকের মন্তব্য, ‘‘বহু পড়ুয়া অনেক ক্ষণ স্কুলে আটকে রয়েছে। এটা ঠিক নয়। তিন মাসের আগের ঘটনা নিয়ে এখন কেন এত হইচই?’’ পূজা প্রসাদ নামের এক মহিলা বলেন, ‘‘আমাদের আবাসন থেকে ৩৫ জন পড়ুয়া এই স্কুলে পড়ে। এ দিন আট জন এসেছে। আতঙ্কে আমি সন্তানকে আনিনি।’’ এর পরে তাঁদের দিকে তেড়ে আসেন অবরোধের পক্ষে থাকা অভিভাবকেরা। পরে মহিলা পুলিশকর্মীরা গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। অবরোধ তোলার জন্য আবেদন করেন স্থানীয় কাউন্সিলর মানিকলাল চট্টোপাধ্যায়। তাতেও কাজ হয়নি। স্কুলে ঢোকা ও বেরোনোর সময়ে রীতিমতো আতঙ্কিত হয়েছিল পড়ুয়াদের একাংশ।

এই অবরোধের জেরে তখন বাড়তি চাপ পড়তে থাকে ডায়মন্ড হারবার রোডের উপরে। যানজট তৈরি হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। ওই রাস্তার গাড়িগুলিকে অন্যত্র ঘুরিয়ে দিতে হয়। অ্যাম্বুল্যান্স ছাড়া হলেও সাইকেল নিয়ে যেতে গেলেও বহু বার অনেককে আটকে দেন বিক্ষোভকারীরা। স্কুলের জেনারেল ম্যানেজার সুরেন্দ্রকুমার সিংহ দুপুরে অবশ্য বলেছিলেন, ‘‘ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, মেয়েটির ক্লাস শেষ হয়ে যায় সকাল সওয়া দশটায়। কিন্তু মনোজের ডিউটি শুরু হয় তারও পরে।’’

এর পরেও অবরোধ চলতেই থাকে। সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটা নাগাদ স্কুলের কয়েকটি বাস বার হওয়ার সময়ে গোলমাল শুরু হয়। অভিভাবকদের অভিযোগ, ওই বাসে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরা বেরিয়ে যাচ্ছেন।
প্রতিটি বাস পরীক্ষা করে দেখতে চান তাঁরা। বাস ঘিরে ধরে বিক্ষোভ শুরু হয়। ওই ছাত্রীর মা বলেন, ‘‘সাসপেন্ড নয়, গ্রেফতারি চাই। না হলে
বৃহত্তর আন্দোলনের পথে যাব।’’ তার পরেই পুলিশ জোর করে বিক্ষুব্ধদের সরিয়ে দেয়। শুরু হয় লাঠিচার্জ। কিন্তু প্রশ্ন, অভিযুক্তদের নামে নির্দিষ্ট করে অভিযোগ করা থাকলেও কেন তাঁকে গ্রেফতার করছে না পুলিশ? লালবাজার সূত্রের খবর, ওই দিন সিসিটিভি ফুটেজে দুই অভিযুক্তের ধারেকাছে এক বারও মেয়েটিকে দেখা যায়নি। তদন্ত চলছে। একই ভাবে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদও চলছে। প্রয়োজন মতো পদক্ষেপ করা হবে।

 

 

কলকাতার আরও খবর পড়তে চোখ রাখুন আনন্দবাজারে।