ছেলেপুলে হয়নি, অত সাজগোজ কীসের— এই ছিল যুক্তি। তারই জেরে স্ত্রীকে গলায় ফাঁস লাগিয়ে খুনের অভিযোগ উঠল বাদুড়িয়ার পুঁড়ো বাজারের তেঁতুলতলা পাড়ার মানারুলের বিরুদ্ধে।

ঘটনাটা মেনে নিতে পারেননি মানারুলের পরিবারও। তার দুই ভাই থানায় এনে ধরিয়ে দিয়েছেন মানারুলকে। পুলিশ গ্রেফতার করেছে ওই ব্যক্তিকে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের খবর, ৩১ জানুয়ারি সকালে হাড়োয়ার সদরপুরে বেগুন খেত থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক মহিলার দেহ মেলে। আশেপাশের থানাগুলিতে সেই ছবি পাঠিয়েছিল হাড়োয়ার পুলিশ। বাদুড়িয়া থানায় গিয়ে দায়ুদ গাজি জানান, দেহটি তাঁর মেয়ে রেনুকা বিবির (৩৫)। জানা যায়, বসিরহাটের সংগ্রামপুরে বোনের বাড়ি যাবেন বলে শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন রেনুকা। তারপর কয়েক দিন খোঁজ মিলছিল না। থানার দ্বারস্থ হন তাঁর বাপের বাড়ির লোকজন।

পুলিশ পরে জানতে পেরেছে, সিনেমা দেখতে যাবে বলে স্ত্রীকে বাড়ি থেকে নিয়ে বেরিয়েছিল মানারুল। সদরপুরে নিয়ে রেনুকাকে সে শ্বাসরোধ করে খুন করে বলে অভিযোগ।

কী ভাবে জানাজানি হল ঘটনাটা?

বুধবার মানারুলকে ধরে বাদুড়িয়া থানায় আনেন তাঁর দাদা আনারুল ও ভাই এবাদুল। তাঁরাই পুলিশকে জানান, খুনের কথা কবুল করেছে ভাই। পুলিশকে আনারুলরা জানান, রেনুকা বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যাওয়ার পর থেকে মানারুলের আচার-আচরণ সন্দেহজনক ঠেকছিল। বাড়িতেও নিয়মিত ফিরছিল না সে। সোমবার বসিরহাটের ইছামতী সেতুতে ঘুরে বেড়াতে দেখে মানারুলকে ধরেন আনারুল-এবাদুলরা। মানারুলকে গ্রেফতারের পরে বসিরহাটের এসিজেএম আদালতে তোলা বুধবার। বিচারক তাকে ৩ দিন পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।  

ঘটনাক্রমে

হাড়েয়ায় উদ্ধার অজ্ঞাত পরিচয় মহিলার দেহ।

দেহ শনাক্ত করলেন বাবা। মৃতার নাম রেনুকা বিবি।
রেনুকার স্বামী মানারুলের আচরণে সন্দেহ ভাইদের। ধরে থানায় নিয়ে গেলেন তাঁরা।
রেনুকার বাড়ির লোকজন ভাঙচুর চালাল মানারুলের ঘরে।

ঘটনা জানতে পেরে মঙ্গলবার রেনুকার আত্মীয়-স্বজন চড়াও হয় মানারুলের বাদুড়িয়ার বাড়িতে। ভাঙচুর করে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় দু’টি ঘর। পুড়িয়ে দেওয়া হয় আসবাবপত্র। দরজা-জানলা, আলমারি-সহ মালপত্র লুঠ হয়ে যায়। গোয়াল ভেঙে গবাদি পশুও নিয়ে পালায় উত্তেজিত জনতা। 

বাদুড়িয়া পুরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের পুঁড়ো বাজারের মানারুলের সঙ্গে আঠারো বছর আগে বিয়ে হয়েছিল স্বরূপনগরের হাকিমপুর গ্রামের দাউদ সাহাজির মেয়ে রেনুকার। সন্তান না হওয়ায় স্বামীর কাছ থেকে গঞ্জনা শুনতে হত ওই মহিলাকে। তবে শ্বশুরবাড়িতে বাকিদের সঙ্গে রেনুকার সম্পর্ক ছিল ভাল।

প্রথম স্ত্রী নিঃসন্তান হওয়ায় দ্বিতীয়বার বিয়ে করে মানারুল। সে পক্ষের একটি সন্তান জন্মায়। তারপরেও অবহেলা, গঞ্জনা, হেনস্থা কমেনি রেনুকার। শ্বশুর-শাশুড়ি, দেওর-ভাসুরদের সঙ্গে থাকতেন রেনুকা। পাশের মাটির ঘরে দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীকে নিয়ে থাকত মানারুল।

মেজোছেলের চরম শাস্তি চেয়ে এ দিন কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা গেল মানারুলের বাবা আবুল খলিফা, মা আনোয়ারা বিবিকে। বৃদ্ধ বলেন, ‘‘সন্তান হয়নি তো কী হয়েছে, মেজো বৌমাকে আমরা মেয়ের মতো দেখতাম। বিড়ি বাঁধার টাকায় ও আমাদের দেখাশোনা করত। মেজো ছেলেটার মাথা খারাপ। ও বিনা দোষে মেয়েটাকে খুন করল।’’

এবাদুলদের কথায়, ‘‘মা-দিদির মতো আদর-যত্ন করত বৌদি। এমন মানুষকে কেউ খুন করতে পারে?’’ এবাদুল-আনারুলরা জানান, মানারুলকে জিজ্ঞাসা করায় এক সময়ে খুনের কথা কবুল করে সে। বলে, যার সন্তান হয়নি, তার এত সাজগোজ করে ঘুরে বেড়ানোর
কী আছে!