দামোদরের চেকড্যামে মাছ ধরতে নেমে তলিয়ে গেলেন এক ছাত্র। তাঁর সঙ্গী দুই তরুণ উঠে আসতে পারলেও তুহিন কোলে নামে ওই ছাত্রের কোনও হদিস মেলেনি সোমবার রাত পর্যন্ত। বাঁকুড়ার সোনামুখীর পূর্ব পাত্রহাটী গ্রামের বছর আঠেরোর তুহিন এই বছর উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছিল।

সোমবার সকালে বুদবুদের রণডিহা লকগেটের কাছে এই ঘটনার পরে বেআইনি ভাবে বালি তোলা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। স্থানীয় রাধামোহনপুর পঞ্চায়েতের প্রধান পীযূষ ঘোষ ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়েই অভিযোগ করেন, ‘‘অনুমতির তোয়াক্কা না করে অপরিকল্পিত ভাবে চেকড্যামের বিভিন্ন জায়গা থেকে ট্রাক্টরে করে বালি তোলা হচ্ছে। এর ফলে ওই জায়গাগুলিতে ‘দ’ হয়ে ঘুর্ণি তৈরি হচ্ছে। প্রশাসনকে অনেক বার জানিয়েও বালি তোলা আটকানো যায়নি।’’ বিষ্ণুপুর মহকুমা ভূমি ও ভূমি সংস্কার আধিকারিক কিঙ্করনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘‘আমরা অনেক জায়গা থেকেই এমন অভিযোগ পাই। সীমিত পরিকাঠামো নিয়ে অভিযানও চালাই। ওখানেও অভিযান হবে।’’

পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, এ দিন সকাল ৬টা নাগাদ তুহিন তাঁর মাসতুতো ভাই সুব্রত বেরা ও জেঠতুতো দাদা অচিন্ত্য কোলের সঙ্গে মোটরবাইকে চড়ে মাছ ধরতে যান। অচিন্ত্য জানান, তাঁর যখন চেকড্যামে পৌঁছন তখন দামোদরে জলের স্রোত কম ছিল। চেকড্যামের কাছে একটি উঁচু জায়গায় গিয়ে তাঁরা মাছ ধরার চেষ্টা করছিলেন। সেখানে আরও দু’তিন জন ছিলেন। চেষ্টা করেও মাছ না পাওয়ায় সকাল ৭টা নাগাদ বাড়ি ফেরার তোড়জোড় শুরু করেন তাঁরা। তখন জলের স্রোত বাড়ছিল।

অবাধে: রণ়ডিহা চেকড্যামের কাছেই দামোদর থেকে অবৈধ ভাবে চলছে বালি তোলা। সোমবার। নিজস্ব চিত্র

অচিন্ত্য বলেন, ‘‘আমি ও সুব্রত অনেকটা ঘুরে জল কেটে পাড়ে চলে আসি। কিন্তু তুহিন সোজা চেকড্যামের দিকে এগোনোর চেষ্টা করছিল। আমরা নিষেধ করলেও শোনেনি।’’ তিনি জানান, তাঁরা পাড়ে ওঠার পরেই পিছন থেকে শুনতে পান, তুহিন হাত পা ছুঁড়ে চিৎকার করে তাঁকে বাঁচাতে বলছেন। পাশে রণডিহার এক জেলে মাছ ধরছিলেন। অচিন্ত্য বলেন, ‘‘আমি ঝাঁপাতে গেলে ওই জেলে বাধা দিয়ে জানান, তুহিন যেখানে পড়েছে সেটা একটা ঘূর্ণি। তবু আমি ঝাঁপিয়ে সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু জলের তোড়ে যেতে পারিনি। তুহিন চোখের সামনেই তলিয়ে যায়।’’

খবর পেয়ে আশপাশের লোকজন জড়ো হয়ে যান। মাছ ধরার ছোট নৌকো নিয়ে খোঁজ শুরু হয়। পুলিশেও খবর দেওয়া হয়। স্থানীয় বাসিন্দা শিবু বাগদি, তরুণ রুইদাস, তুলসী কারকদের অভিযোগ, পুলিশ পৌঁছয় দুপুরে। কিন্তু তারা মোবাইলে ছবি তুলে গাড়ি নিয়ে ফিরে যায়। আশ্বাস দিয়ে যায়, বাঁকুড়ায় খবর দেওয়া হচ্ছে। ডুবুরি আসবে। যদিও এসডিপিও (বিষ্ণুপুর) লাল্টু হালদার বলেন, ‘‘বিপর্যয় মোকাবিলা বিভাগের লোকজন আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু জলের স্রোত ও পাথরের জন্য বাধ্য হয়ে এ দিনের মতো অভিযান শেষ করতে হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে ফের অভিযান হবে।’’

মাস দুয়েক আগে ওই চেকড্যাম পেরোতে গিয়ে জলের স্রোতে ভেসে গিয়ে মৃত্যু হয় এক আনাজ বিক্রেতার। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, তার পরেও কারও হুঁশ ফেরেনি। পুলিশ ও প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, চেকড্যামের উপর দিয়ে যাতায়াত নিষিদ্ধ। তবু অনেকে হেঁটে তো বটেই, মোটরবাইক ও গাড়ি নিয়েও অবাধে যাতায়াত করেন। এলাকায় কোনও সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তিও দেখা যায়নি। এ দিন ঘটনার পরে কিছু লোকজনকে ঝুঁকি নিয়ে ওই জায়গাতেই মাছ ধরতে দেখা যায়। এসডিপিও জানান, ওই এলাকায় অবাধ যাতায়াত বন্ধ করতে ব্যবস্থার ভাবনাচিন্তা চলছে।