রডোড্রেনডনের পাতা এখন ধবধবে সাদা। সুউচ্চ সিঙ্গালিলা অরণ্যের পাহাড়ি পাইনও এখন ধবধবে সাদা। চিরহরিৎ বনভূমিতে কুচি বরফ এমনই মাখামাখি। যা দেখলে মনে হতে পারে সুদক্ষ কোনও শিল্পীর আঁকা জীবন্ত ক্যানভাস। মঙ্গলবার সকালে দার্জিলিঙের সান্দাকফু দেখার পরে এমনই বিবরণ ভেসে বেড়াচ্ছে নানা সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে। সৌজন্য, পশ্চিমী ঝঞ্ঝা! যার হাত ধরেই অবশেষে হাড় কাঁপানো শীতের ছোঁয়া লাগল উত্তরের পাহাড় ও সমতলে। বরফে ঢেকে গেল রাজ্যের সবচেয়ে উঁচু এলাকার ঘরদোর, দোকানপাট।

সেই তুষারপাতের হিমশীতল আমেজ অনুভব করতে রুকস্যাক পিঠে ল্যান্ডরোভারে চেপে সান্দাকফুর দিকে যেতে তাই হুড়োহুড়ি বাড়ছে দার্জিলিঙের মানেভঞ্জনে। রমেশ লামা, প্রেমা শিরিংরা তো মহা খুশি। ওঁরা বললেন, ‘‘নাথু লা-এ তো অনেক আগে থেকেই বরফ পড়ছে। আমরা জমজমাট তুষারপাতের আশায় ছিলাম।’’ অবশেষে তা হওয়ায় এখন বরফপ্রেমীদের ভিড় বাড়বে। হাড় কাঁপিয়ে দেওয়া শীতল হলে কী হবে, সেটা উপভোগ করতেও বেশ ভিড় হয়। গাড়ি, হোটেল, হোম স্টে, রেস্তোরাঁর ব্যবসাটা ভাল হয়।

ঘটনা হল, চার দিন ধরেই সান্দাকফুর তাপমাত্রা হিমাঙ্কের কাছাকছি ঘোরাফেরা করছে। মঙ্গলবার তা শূন্যের নীচে নেমে যায়। আকাশে মেঘও ছিল। বিকেলে সূর্যাস্তের আগেই শুরু হয়ে যায় তুষারপাত। মিহি কুচি বরফে ঢেকে যায় রাস্তা, বাড়ির ছাদ। বরফের চাদরে রাস্তা মুড়ে যাওয়ায় গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। মানেভঞ্জন-সান্দাকফু রুটের ল্যান্ডরোভার মালিক-চালকদের সংগঠনের সম্পাদক চন্দন তামাঙ্গ বলেন, ‘‘এমন হিমশীতল আবহাওয়া হলেও ২০ জন পর্যটক ছিলেন। তুষারপাত হতে থাকলে তা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।’’ ইতিমধ্যেই কলকাতা, মেদিনীপুর, রাঁচি থেকেও ট্যুর অপারেটররা ফোন করতে শুরু করেছেন। ইস্টার্ন হিমালয়ান ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশনের কার্যকরী সভাপতি সম্রাট সান্যাল বললেন, ‘‘পুরু বরফে

মোড়া সান্দাকফু দেখার রোমাঞ্চই আলাদা। তার উপরে তুষারপাতের সময়ে থাকতে পারলে অসাধারণ একটা অভিজ্ঞতা হয়। সে জন্যই নানা এলাকা থেকে ফোনে খবরাখবর নেওয়া শুরু হয়েছে। আবহাওয়া হিমশীতল থাকলে নোট বাতিলের জেরে যে মন্দা হয়েছিল, তার কিছুটা হলেও পোষাতে পারে।’’

কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতর সূত্রে অবশ্য জানা গিয়েছে, পশ্চিমী ঝঞ্ঝার জন্যই উত্তুরে হাওয়া প্রবল। সঙ্গে ঘূর্ণাবর্তই বয়ে এনেছে মেঘ। দুয়ের দাপটে গত তিন দিন ধরে তাপমাত্রা ক্রমশ কমছে। এ দিন সকালে শিলিগুড়ির অনুভূত তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রিতে নেমে আসে। গত কয়েক দিন গড় তাপমাত্রা ছিল ২১ ডিগ্রি। আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, গত কয়েক দিন ধরেই একটির পর একটি পশ্চিমী ঝঞ্ঝা উত্তরের আকাশ দিয়ে যাচ্ছে। হিমালয়ের পাদদেশ এলাকার ওপরে এখনও একটি পশ্চিমী ঝঞ্ঝা রয়েছে সেটি ক্রমশ অসমের দিকে সরে যাচ্ছে। জম্মু-কাশ্মীর থেকে আসা ঝঞ্ঝার টানে হিমালয় থেকে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকতে শুরু করেছে উত্তরবঙ্গে। অন্য দিকে, আর একটি ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হয়েছে, যার টানে বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয় বাষ্প ঢুকছে উত্তরবঙ্গে। সে জন্য উত্তরবঙ্গের অনেক জায়গাতেই এ দিন আকাশ ছিল মেঘে ঢাকা। কোথাও কোথাও কয়েক পশলা বৃষ্টিও হয়েছে। কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতরের সিকিমের আধিকারিক গোপীনাথ রাহা বলেন, ‘‘পশ্চিমী ঝঞ্ঝাটি ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সরে যাবে বলে মনে হচ্ছে। তবে ঘূর্ণাবর্তটি ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। ঘূর্ণাবর্তের জেরেই সমতলে বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি হচ্ছে এবং পাহাড়ে তুষারপাত চলছে।’’

জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ারেও বেশ জমিয়ে ঠান্ডা পড়ায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন অনেকেই। জানুয়ারির মাঝামাঝি হতে চলেছে, এখনও যদি উত্তরবঙ্গে জমজমাট ঠান্ডা না পড়ে, কুয়াশায় পথঘাট ঢেকে না যায়, তা হলেই উদ্বেগ বেশি— মজা করে বলছেন অনেকে। হিমালয়ান নেচার অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার পাউন্ডেশনের (ন্যাফ) কো-অর্ডিনেটর অনিমেষ বসু বলেন, ‘‘একটু দেরি হলেও কনকনে ঠান্ডা পড়ায় ভালই লাগছে।’’