মু খ্যমন্ত্রী শিক্ষকদের অনুরোধ করিয়াছেন, তাঁহাকে ভুলিয়া না যাইতে। ইহাই গত সপ্তাহের শিক্ষক সম্মিলনের মূল বার্তা, উদ্দেশ্য এবং বিধেয়। তাঁহার উদ্বেগের বিন্দুমাত্র কারণ নাই। পশ্চিমবঙ্গের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের তাবৎ শিক্ষককুল তাঁহাকে মনে রাখিবেন, প্রত্যুষে নিদ্রাভঙ্গমাত্র তাঁহার মুখপটের উদ্দেশ্যে মনে মনে অজস্র ফুলচন্দন নিক্ষেপ করিবেন, সম্ভবত প্রয়োজনকালে তাঁহাদের সংখ্যার ওজনও তাঁহার নামেই উৎসর্গ করিবেন। শনিবারের পর প্রেমবায়ু বড় জোর বহিতেছে: তিনিও খুশি, উঁহারাও খুশি। উঁহাদের খুশি করিবার জন্য ঠিক জায়গাটিগুলিতে লক্ষ্যভেদ হইয়াছে, চার দিকে দানপাত্রের অনিঃশেষ লুট লাগিয়াছে। শিক্ষকরাও যারপরনাই খুশি হইয়া প্রবল করতালিতে আভূমি-আকাশ মুখরিত করিয়াছেন, নেত্রীর জয়গান কণ্ঠে লইয়া নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়াম হইতে ঘরমুখো হইয়াছেন। যাত্রাপথে প্রসন্নমনে ছকিতে ছকিতে গিয়াছেন, এ বৎসর, নাকি পর বৎসর— সরকারি টাকায় প্রতিশ্রুত বিদেশভ্রমণের টিকিট কোন সময় কোন অভিমুখে কাটিবেন। এমন অদৃষ্টপূর্ব কল্পতরুকে তাঁহারা কি ভুলিতে পারেন? সে যুগে কিংবা এ যুগে, কল্পতরু হইতে তো কত নেতানেত্রীই চেষ্টা করিয়াছেন, কিন্তু বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর মতো করিয়া পারেন নাই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানেন, কোন ছিদ্র দিয়া ঢুকিয়া কাহাকে কেমন ভাবে খুশি করিতে হয়। খুশি-রাজনীতির বিষয়টি তিনি যত বোঝেন, সকলেই কি তেমন?

এই শিক্ষাশ্রী নীতি, কিংবা শিক্ষাক্ষেত্রে খুশি-রাজনীতির ফাঁক গলিয়া যদি উচ্চশিক্ষা নামক বেচারি ক্ষেত্রটির পঞ্চত্ব প্রাপ্তি হয়, কাঁদাকাটা চলিবে না। সব তো সমান ভাবে হয় না। খুশির পাল্লা অনেক সময় কাজের পাল্লার বিপরীতেই চলে, মানিতে হইবে। শিক্ষকদের চাকরির সীমা ষাট বৎসর থেকে বাড়াইয়া বাষট্টি বৎসর করিবার মধ্যেও সেই ঝুঁকি থাকিতে পারে। সমালোচকরা প্রায়শ বলেন, লঘুগুরুবিচার-ব্যতিরেকে সমস্ত কর্মরত শিক্ষকদের চাকরির মেয়াদ বাড়াইলে তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষাদানের সুযোগ হইতে আটকানো হয়, শিক্ষার মানবৃদ্ধিতে বাধা পড়ে। সেই যুক্তি যদি না-ও মানা হয়, তবু নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, সংস্কারটির মধ্যে শিক্ষার মান বিষয়ে ততখানি গভীর ভাবনা নাই, ভাবনা আসলে শিক্ষকদের প্রসন্নতার মাত্রা বিষয়েই। বেড়াইতে যাইবার সুবিধার সহিত যে শিক্ষার মানের সম্পর্ক অতি ক্ষীণ, তাহা না হয় স্বতঃসিদ্ধ হিসাবে উহ্যই থাকুক। শিক্ষকদের স্বাস্থ্যবিমা অবশ্যই একটি জরুরি ভাবনা, যদিও তাহা কেন সরকারি অর্থ দিয়াই করিতে হইবে, সে প্রশ্ন অনাবশ্যক নহে।

সুতরাং মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাসবাণীর মধ্যে শিক্ষাদানের উপযুক্ত পরিকাঠামো, গবেষণার পরিবেশের উন্নতি ইত্যাদি লইয়া বিশেষ মাথাব্যথা নাই, এই মর্মে অনিশ্চয়তা কিলবিল করিলে তাহা গিলিয়া ফেলাই উত্তম। নিশ্চিত ভাবে বলা যায়, অমন মাথাব্যথা থাকিলে আশ্বাসগুলি সহজেই উচ্চশিক্ষার সহিত যুক্ত হইতে পারিত। দেশবিদেশ ভ্রমণের সহিত সারস্বত সাধনার সংযোগ স্থাপনে জোর দেওয়া যাইত। গবেষণায় অগ্রসর হইলে কিছু অতিরিক্ত সুবিধার ব্যবস্থা থাকিতে পারিত। অর্থাৎ শিক্ষার মান উন্নয়নের সহিত শিক্ষকদের খুশির একটি সমঞ্জসতা তৈরি করা যাইত। মুখ্যমন্ত্রীর অভীষ্ট স্পষ্টতই তাহা নহে। তাঁহার অভীষ্ট কম পরিশ্রমে হাততালি ও অন্যান্য প্রতিদানের ব্যবস্থা করা। তিনি ভাতার কার্যকারিতায় আস্থা রাখেন। শিক্ষকসমাজের মধ্যেও  ভাতামুখী মানসিকতা তিনি প্রোথিত করিয়া দিয়াছেন। এই ভাতা-নীতির টানেই শ্রেষ্ঠ আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা এক দিন বাংলার প্রতিষ্ঠানগুলিতে পড়িমরি ছুটিয়া আসিবে। পারস্পরিক হৃষ্টতার নিম্নাভিমুখী মডেলটির রমরমা দেখিতে।