ওম পুরী (ছবিতে) প্রয়াত হইলেন। তিনি, শাবানা আজমি, নাসিরুদ্দিন শাহ ও স্মিতা পাটিল যে ধরনের ভারতীয় চলচ্ছবির ‘মুখ’ ছিলেন, তাহা লুপ্ত হইয়াছে। কেবল তাহাই নহে, সেই প্রকারের শিল্প লইয়া তীব্র অবজ্ঞা ও পরিহাসের বাতাবরণ রচিত হইয়াছে। সেই শিল্প ভাবিত: শিল্প সমাজের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ, তাহার সমাজ বদলাইবার দায় রহিয়াছে, ক্ষমতাও রহিয়াছে। সত্তর বা আশির দশকে প্রচুর ছবির মূল প্রণোদনা ছিল সামাজিক অন্যায় সংশোধনের প্রখর অভিলাষ এবং দরিদ্র ও পরাজিতের প্রতি প্রবল দরদ। কেহ কেহ বলিয়াছেন সেই দরদ প্রকৃত প্রস্তাবে কৃত্রিম, তাহা কেবল প্রাইজ আনিবার জন্য পরিচালকের ভান, কিন্তু মনে রাখিতে হইবে, শিল্পীর দরদ ভান হইলেও, তাহাতে ইহা প্রমাণ হয় না যে শিল্প হইতে যে দরদ বিচ্ছুরিত হইতেছে, তাহা মূল্যহীন। দর্শকের নিকট সেই দরদ অকৃত্রিম হিসাবে প্রতিভাত হইতে পারে এবং উদ্দেশ্য সাধন করিতে পারে। আর, কতিপয় পরিচালক স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই প্রকারের ছবি করিলেও, অভিযোগটি সমগ্র শিল্পধরনটির প্রতি প্রয়োগ এক অশুভ সরলীকরণ। আর্থিক লাভ অর্জনকে চলচ্চিত্র রচনার লক্ষ্য হিসাবে গ্রহণ করিয়াছে যে ধারা, তাহার পার্শ্বেই এই সমাজ-সচেতন ছবির স্রোতটি বহিয়া যাইত, এবং মুনাফা না করিলেও, সম্মান আদায় করিত যথেষ্ট। এই ছবির স্রষ্টারাও সমান্তরাল তারকার আসনে অভিষিক্ত হইতেন।

এখন গরিবের বেদনা লইয়া চিত্ররচনাকে ন্যাকামি ভাবা হয়, এবং প্রকাণ্ড ধনী যুবকের প্রেমের বেদনা লইয়া ছবি করিলে জনগণ লাফাইয়া দেখিতে যায়। জনতা পূর্বেও ‘আর্ট ফিল্ম’গুলিকে আলিঙ্গন করিত তাহা নহে, কিন্তু টেলিভিশনে নিয়মিত প্রদর্শন ও সংবাদে ফেস্টিভ্যাল-প্রশস্তির বিবরণের ফলে ওই ছবি সম্পর্কে কিছু মাত্রায় অবগত ও উৎসাহী থাকিত। উচ্চবিত্ত মানুষের সম্পর্কের জটিলতা লইয়া নিশ্চয় ছবি করা যাইতে পারে, কিন্তু গরিবের না-খাইতে পাইবার বেদনাকে একেবারে উড়াইয়া দিলে তাহা এক দরিদ্র দেশে অতি বিসদৃশ শিল্প-অভ্যাস হিসাবে বিরাজ করিতে থাকে। অনাহারের যন্ত্রণা যে বিরহবেদনার অধিক, এমন মতামতও উপেক্ষণীয় নহে। কিন্তু নিঃশর্ত বাজার-বশ্যতার কালে কেবল তাহাই শিল্প বলিয়া নন্দিত হইবে, যাহা এমন বিশ্ব রচনা করিবে যে স্থানে নর্দমা ব্যাধি লক-আউট নাই, আর দারিদ্র যদি বা থাকে, তাহা শেষ দৃশ্যে দরিদ্র মানুষের কুস্তি ম্যাচ জয়ের ফলে তৎক্ষণাৎ অন্তর্হিত হইয়া যায়। এই ইচ্ছাপূরণের আখ্যানগুলির সহিত সত্তর বা আশির দশকের ওম বা নাসির অভিনীত ছবিগুলির মূল পার্থক্যই হইল: তাহা মানুষকে স্বস্তি বিলাইবার প্রয়োজন বোধ করে না, বরং কর্কশ ও আশাহীন বাস্তবের সহিত সম্যক পরিচয় করাইয়া, আরাম বিনাশ করে। এই প্রকল্পটিই এখন উদ্ভট বলিয়া অভিহিত। কারণ দর্শক আরাম না পাইলে পয়সা দিবে কেন? আর পয়সা না পাইলে শিল্প করিবার অর্থ কী?

ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন বা এনএফডিসি-ই মুখ্যত পূর্বের ‘আর্ট’ ছবিগুলির প্রযোজনা করিত, এখন এই সংস্থা নিতান্ত নিষ্প্রভ, এবং এই চিত্রধারার মেরুদণ্ড যে বাম রাজনীতি, তাহাও ভারতে অস্তমিত। এক সময়ে বামপন্থা শিল্পীদের ক্ষেত্রে প্রায় বাধ্যতামূলক ছিল, ইদানীং বহু শিল্পীই বামপন্থী তকমাকে বিষবৎ পরিহার করেন। সব মিলাইয়া, এই ঘরানার ছবি ফসিল হইয়া গিয়াছে। ওম পুরীকেও বহু অকিঞ্চিৎকর মূলস্রোতের ছবিতে অভিনয় করিতে হইয়াছে বহু বৎসর, পেট চালাইবার দায়ে। তাহাতে তাঁহার প্রতিভার ও কর্মশক্তির অপমানই ঘটিয়াছে। ওম প্রয়াত হইলেন। এমন শক্তিশালী অভিনেতার প্রয়াণ অতি দুঃখের, কিন্তু তিনি যে ছবি-ধারণার প্রতিনিধিত্ব করিতেন তাহা বহু পূর্বেই প্রয়াত হইয়াছে, সেই শোকও পালনীয়।

যৎকিঞ্চিৎ

পণ্ডিত বলে গেছেন, নতুন বলে কিছু হয় না, পুরনোই ফিরে ফিরে আসে। এ বছরটা নতুন, কিন্তু ফিরে আসছে সারদা-নারদার ছায়া, এর পর কে ধরা পড়বে তা নিয়ে আড্ডায় স্বাদু জল্পনা। শোনা যাচ্ছে ফিরে আসছেন সৌরভ, ক্রিকেটকর্তৃত্বে। তা সত্যি হলে জনপ্রিয় কুইজ শো  কোথায় যাবে, মৃদু দুঃখ। ধোনির আচম্বিত অধিনায়কত্ব-ত্যাগে ফিরে আসছে তাঁর প্রতি অনুরাগ। বাপ-ছেলের উচ্চণ্ড ঝগড়ায় ফিরে আসছে মুষলপর্ব রিভাইজের দায়। ফিরে আসবে মহাভারতের সেল, আশা।