গবেষক, সমাজবিজ্ঞানী এবং সরকারি নীতিচর্চার দৌলতে সংঘাতময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মেয়েদের নানা ভূমিকার কথা জনগোচরে এসেছে। বিদ্রোহী দলগুলিতে মেয়েরা সেনানী রূপে যোগ দিয়েছে, আহত সৈনিকদের সেবাশ্রূষার কাজ করেছে, ধৃত সন্তানদের ছাড়াতে থানা এবং ফৌজি শিবিরের সামনে জড়ো হয়েছে, ফেরারি স্বামী, পিতা এবং ভাইদের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করেছে। সংবাদমাধ্যমের দৌলতে এই সব আমরা এখন কিছু কিছু জানি।

কিন্তু এ তো গেল সংঘাতের মাঝে নারীর ভূমিকা। প্রশ্ন হল: শান্তির জন্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মেয়েরা কী ভূমিকা নিয়েছে? এবং, সরকার যে পথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে চাইছে, তাতে মেয়েদের কী ভূমিকা? সরকারি শান্তিপ্রতিষ্ঠার মানচিত্রে নারী আন্দোলনের স্থান কোথায়, কী ধরনের? গত কুড়ি বছরে সরকার যখন বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণে এবং শান্তি ফেরাতে ব্যস্ত ছিল, তখন মেয়েরা কেমন ছিল? সামাজিক পরিস্থিতি কি তাদের শান্তির সেনানী হতে সাহায্য করেছে? না কি, নানা সরকারি নীতি ও কর্মকাণ্ডে এই অঞ্চলের নারীসমাজে যে পরিবর্তন এসেছে, তা সংঘাতের অন্য মাত্রা খুলে উন্মোচন করেছে?

শান্তি ফেরার প্রথম ইঙ্গিত হল জনজীবনে নিরাপত্তার প্রত্যাবর্তন। কিন্তু উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নানা অংশে এখনও বিশেষ সামরিক আইন চালু রয়েছে। গত কুড়ি বছরে নানা সময়ে মেয়েরা এই আইনের শিকার হয়েছে। মেয়েদের উপর সামরিক বাহিনীর অত্যাচার ও লাঞ্ছনার কোনও প্রতিকার হয়নি। একটি সাম্প্রতিক পর্যালোচনা অনুসারে, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে পঁচিশটি যৌন নিপীড়নের অভিযোগের মাত্র দুটির তদন্ত হয়েছে। ২০০৪ সালের এক বিশেষ পর্যালোচনা কমিটি সরকারকে বিশেষ সামরিক আইন বাতিল করার সুপারিশ করেছিল। সরকার সে সুপারিশ মানেনি।

এই নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাপক নারী, শিশু ও শ্রমিক পাচার। বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সংঘর্ষ নারী-শিশু পাচারের আদর্শ পটভূমি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোকরাঝাড়, চিরাঙ, ধুবরি এবং বনগাইগাঁও—পশ্চিম অসমের চারটি জেলা থেকে ২০১৩’র দাঙ্গায় চার লক্ষের বেশি মানুষ বাসস্থানচ্যুত হয়, বহু মেয়ে আজ নিরুদ্দেশ। ২০১১-১২ সালে অসমের নিখোঁজ ১৫৬৫ শিশুর মধ্যে ৬০০ শিশু আজও খোঁজহীন, ১২৪৩ নিখোঁজ নারীর মধ্যে খোঁজহীন ৫৭১।

আর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অঞ্চলে সব ধরনের পাচার হওয়া মানুষের জন্য নির্দিষ্ট দর আছে। বিবাহযোগ্যার মূল্য ১ লাখ, বারবনিতা হওয়ার জন্য ১৫ লাখ, বেগার শ্রমিকের জন্য ৫০০০ থেকে ৬০০০। অসমে ২০০৯ থেকে ২০১০, এক বছরে স্বামীর হাতে লাঞ্ছনার সংখ্যা ৪৩৫৫ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৫১৮৯। অবশ্য সব রাজ্যে অবস্থা এক নয়। ২০০১-১১’র মধ্যে ৪৮,৩৩৮টি শিশুধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়, তার মধ্যে ত্রিপুরায় ৪৫৭টি, মেঘালয়ে ৪৫২, অসমে ৩১৬, মিজোরামে ২১৭, মণিপুরে ৯৮, অরুণাচল প্রদেশে ৯৩, নাগাল্যান্ডে ৩৮।

জনস্বাস্থ্যের বিচার সমান গুরুত্বপূর্ণ। ২০১১’র জনগণনা অনুযায়ী সমগ্র দেশে প্রতি ১০০০ পুরুষের অনুপাতে ৯৪০ জন নারী। অসমে এই সংখ্যা ৯৫৪, মণিপুরে ৯৮৭, মেঘালয়ে ৯৮৬, মিজোরামে ৯৭৫, ত্রিপুরায় ৯৬১। একমাত্র নাগাল্যান্ডে এই অনুপাত জাতীয় গড়ের নীচে—৯৩১। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভ্রূণহত্যা এবং শিশুহত্যা প্রায় অনুপস্থিত। অসম, সিকিম এবং ত্রিপুরায় এই সংখ্যা ২০০৫-এ ছিল একটা করে। নাগাল্যান্ড এবং মণিপুরে প্রসূতি মায়ের মৃত্যুসংখ্যাও কম। মণিপুরে এই সংখ্যা দেশে সর্বনিম্ন। প্রতি এক লাখ সফল জন্মে প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৬০, নাগাল্যান্ডে ২৪০। এই তথ্য ২০০৫-০৬-এর। অবশ্য ত্রিপুরার ক্ষেত্রে অনুপাত ভাল নয়। প্রসঙ্গত, ত্রিপুরায় ১৫-৪৯ বছর বয়সের নারীর ৬৫ শতাংশ রক্তাল্পতায় ভোগে, যেখানে জাতীয় গড় ৫৫.৩। অসমে ওই বয়সের অন্তঃসত্ত্বা নারীর ৭২ শতাংশকে রক্তাল্পতায় ভুগতে দেখা গেছে। শিশুমৃত্যুর হারও অসমে সঙ্গিন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যত্রও জাতীয় হারের নীচে।

শিক্ষার ক্ষেত্রেও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মেয়েরা মোটের উপর এগিয়ে আছে। ২০১১’র জনগণনা অনুযায়ী ভারতে সাক্ষরতার হার ৭৪.০৪ শতাংশ। অরুণাচল প্রদেশ এবং অসম ব্যতিরেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে সাক্ষরতার হার জাতীয় গড়ের উপরে, মিজোরামে ৯১.৫৮ শতাংশ। কিন্তু তাত্‌পর্যপূর্ণ হল, সংঘর্ষের তীব্রতার দশকে, অর্থাত্‌ ২০১০-১১’য় উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সাক্ষরতা বৃদ্ধির হার কমেছে। প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়াদের মধ্যে স্কুল-ছুটের অনুপাত ২০০৬-০৭-এ সারা দেশে ছিল ৪৫.৯০ শতাংশ। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছ’টি রাজ্যে এই অনুপাত আরও বেশি।

কী কারণে? এক অনুসন্ধান অনুযায়ী উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বহু স্থানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পুলিশ এবং সেনাবাহিনী ছাউনি গেড়ে বসে আছে। এর একটা ফল হল, ছাত্রীদের স্কুল-ছুটের হার ছাত্রদের চেয়ে বেশি। এ ছাড়া, ঘরের কাজকর্ম এবং লেখাপড়ার খরচও শিক্ষার প্রসারে দুটি বড় বাধা। ত্রিপুরায় জনজাতির পড়ুয়াদের স্কুল-ছুটের পিছনে ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় শিক্ষাকে একটা কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে স্কুলে পড়ার মাত্রায় এক লক্ষণীয় গতি এসেছে। ছাত্র ও ছাত্রীর মাঝে বিদ্যালয় যোগদানের হারের তারতম্য কমেছে। মণিপুর ও ত্রিপুরা বাদে অন্য রাজ্যগুলিতে ছাত্রীদের বিদ্যালয় যোগদানের হার ছাত্রদের তুলনায় বেশি।

২০০৯ সালে গোটা দেশে ২৫.৬ শতাংশ মহিলা কাজের সুযোগ পেয়েছিলেন। অরুণাচল প্রদেশে এই হার ছিল ৩৬.৫ শতাংশ, মণিপুরে ৩৯ শতাংশ, মিজোরামে ৪৭.৫ শতাংশ, মেঘালয়ে ৩৫.১ শতাংশ এবং নাগাল্যান্ডে ৩৮.১ শতাংশ। নানা জায়গায় পুরনো স্বনির্ভর ক্ষুদ্র উত্‌পাদন ভিত্তিক অর্থনীতি ভেঙে গিয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, অফিস ইত্যাদির ব্যাপক প্রসার এবং শিক্ষা প্রসারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, স্বজনপোষণ ভিত্তিক পুঁজিবাদের প্রসার।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঝুম চাষের অবসান এবং তার পরিবর্তে অরণ্যাঞ্চল এবং শস্যক্ষেত্রের বাণিজ্যিক রূপান্তর। ত্রিপুরায় এই প্রক্রিয়াকে বলা হয়েছে ঝুম থেকে ট্যাপিং অথবা রবার চাষ। এই অর্থনৈতিক রূপান্তরের এক বড় রূপ হল রাস্তাঘাট, সরকারি ও বেসরকারি বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক বাড়ি তৈরি, বিমানবন্দরের প্রসার, বিদ্যুত্‌ উত্‌পাদন, জল-বিদ্যুত্‌ প্রকল্প, ব্যাংকের প্রসার, আমলাতন্ত্র বৃদ্ধি ইত্যাদি। এর ফলে নানা ধরনের অসংগঠিত ক্ষেত্রে শ্রমিক বিশেষত মহিলা শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে। শিক্ষিতা, কর্মরতা মহিলার সংখ্যা বেড়েছে। নার্সিং-এর মতো সেবামূলক বৃত্তিতে অনেক মেয়েই যোগ দিয়েছেন। একই ভাবে স্বচালিত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি সংস্থানে মহিলা পরিচালিকার হার তাত্‌পর্যপূর্ণ। তৃতীয় ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্প গণনা প্রতিবেদন তৈরি হয়েছিল ২০০১-০২ সালে। তৃতীয় প্রতিবেদনে দেখা যায় যে অসমে এই ধরনের ক্ষেত্রে কর্মরতা মেয়েদের মধ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মহিলাদের ৪৯ শতাংশ বিবাহিতা এবং প্রশিক্ষণহীন নারীর ৩১.২ শতাংশ বিবাহিতা। আর এই প্রশিক্ষণহীন মেয়েদের মধ্যে বিধবা ছিলেন ৩২.৫ শতাংশ।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিতে মেয়েদের অংশগ্রহণ খুবই কম। নির্বাচনে খুব কমই মেয়েই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। মানবাধিকার এবং নারী কমিশন—দুটোই বেশির ভাগ উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যে নেই। থাকলেও তাদের অর্থ এবং লোকবল নেই। তার চেয়েও বড় কথা, বহু জায়গাতেই পঞ্চায়েত ব্যবস্থা নেই। অন্য দিকে, প্রথাগত আইন ব্যবস্থায় বহু নারীবৈষম্যসূচক দিক বলবত্‌ আছে। যার বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকারের সম্ভাবনা খুবই কম। নাগাল্যান্ডে সরকারি সমর্থন সত্ত্বেও মেয়েদের জন্য সংরক্ষিত ভোটব্যবস্থা চালু করতে প্রচুর বেগ পেতে হয়েছে।

সরকার প্রবর্তিত এই সব ব্যবস্থা, যেমন বিশেষ কমিশন, সংরক্ষণ, মেয়েদের জন্য বিশেষ বাজেট ব্যবস্থা, সরকারি কাজকর্মে মেয়েদের অংশগ্রহণের জন্য বিশেষ নীতি ইত্যাদিকে এই অঞ্চলের বিদ্রোহী আন্দোলনগুলি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভাল চোখে দেখেনি। তাদের মনে হয়েছে, এই পদক্ষেপগুলো নারী সমাজের শিক্ষিত স্তরকে রাষ্ট্রের কুক্ষিগত করবার জন্য তৈরি করা হয়েছে। অন্তত শিক্ষিত নারী এবং সরকারি সংস্কারসূচির মাঝে একটা আঁতাঁত সৃষ্টি হয়েছে, যা এই অঞ্চলে জাতীয়তাবোধের পক্ষে ক্ষতিকর।

রাষ্ট্রবিরোধী রাজনীতিতেও এই সমস্যার ছাপ পড়েছে। রাষ্ট্রবিরোধী চৈতন্যের একাংশ আজ সংস্কারমুখী সরকারি নীতির জোয়ারে স্বরূপ পরিবর্তন করেছে। শান্তি আন্দোলনে এর ছাপ পড়েছে। মায়েরা, বোনেরা, বউয়েরা আজ শান্তির জন্য রাস্তায় নামছে। কিন্তু সে সংগ্রাম আজ হ্রাসমান। শিক্ষিতা, কর্মরতা, নির্বাচনপ্রার্থী নারী রাস্তায় নেমে শান্তি আন্দোলনে আজ সম্ভবত অতটা উত্‌সাহী নয়।

তিনটে বিষয় এই সব তথ্য থেকে উঠে আসে।

প্রথমত, উত্তর পূর্বাঞ্চলের সব রাজ্যের অবস্থা এক নয়। নারীসমাজের পরিস্থিতিতে কিছু তারতম্য আছে। ত্রিপুরায় তথাকথিত সুশাসনের ফল এ ক্ষেত্রে সব সময় দেখা যায়নি। জনজাতীয় বিদ্রোহ ও অশান্তি কমলেও, সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে তার সুফল এখনও স্পষ্ট নয়।

দ্বিতীয়ত, সামগ্রিক ভাবে জনস্বাস্থ্য এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য স্থানের চেয়ে উত্তর-পূর্বে মেয়েদের অবস্থা ভাল। শিক্ষা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রসারে নারী সমাজে যে প্রভাব পড়েছে, তা শান্তি আন্দোলনে কোনও তারতম্য ঘটাবে কি না, তা আরও দেখতে হবে।

তৃতীয়, শান্তি আন্দোলনে মেয়েদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো ছিল, কিন্তু ততটাই লক্ষণীয় প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিতে তাদের অনুপস্থিতি।

প্রশ্ন হল, নয়া উদারনৈতিক আর্থিক সংস্কার, সরকারি প্রসার, অরণ্যের বাণিজ্যিকীকরণ এবং খনি, জল ও অরণ্য সম্পদ শোষণের ওপর ভিত্তি করে যে নতুন অর্থনীতির প্রসার, সরকারি ব্যবস্থার প্রসার ও শিক্ষার সীমিত উন্নতি, তাতে নারীসমাজের উপর কী প্রভাব পড়বে? উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংঘাত ও শান্তির ভবিষ্যত্‌ এর উত্তরের ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে।

 

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, ক্যালকাটা রিসার্চ গ্রুপ-এর অধিকর্তা। মতামত ব্যক্তিগত