অবশ্যই সেখানে তুমি পড়তে পারো আমার কবিতা। আর বোলো, এই ঘটনার প্রতিবাদে আমি বাংলা আকাদেমি থেকে পদত্যাগ করছি।’ রাত প্রায় সাড়ে দশটা, কলেজ স্ট্রিটের একটা সরু গলিতে উত্তেজিত আমরা কয়েক জন, আর আমার কানে-ধরা ফোনের অপর প্রান্তে এই বক্তব্য শঙ্খ ঘোষের। তার আগের দিন গুলি চলেছে নন্দীগ্রামে, পরদিন ধর্মতলায় সাধারণের প্রতিবাদ-সভা। সেখানে তাঁর কবিতা পড়বার অনুমতি চাইতেই করেছিলাম ফোনটা। তিনি তখন কলকাতার বাইরে। তাঁর কণ্ঠস্বরে উদ্বেগ আর আক্ষেপ, দুই-ই বেজে উঠছে। সেই রাতে তাঁর এই দুটো বাক্য যে কতখানি জোর জুগিয়েছিল আমাদের! তার পর অনেকগুলো ভারী রাত বয়ে গিয়েছে, আরও অনেক বার জোর পেতেই ছুটে গিয়েছি আমরা, তাঁর কাছে।

আজ, কবিতার পাঠক হিসেবে বেশ কিছু বছর পার করার পর যদি প্রশ্ন করি, আমরা কী পেয়েছি শঙ্খ ঘোষের কবিতা থেকে? সবার আগে আমি বলব, জোর। কিছু-না-থাকা, দেয়ালে-পিঠ-ঠেকে-যাওয়া মানুষের কব্জি টানটান করে দেওয়ার মতো জোর। মাথা বিকিয়ে দেওয়ার এই যুগে প্রলোভনের বিশাল হাঁ-এর সামনে দাঁড়িয়ে আরও এক বার ‘না’ বলতে পারার জোর। যে-জোর, আমার মতে, এই মুহূর্তে সবচাইতে বেশি প্রয়োজন আমাদের।

এক জন কবির কাজ কী? আমরা ছোট থাকতে শুনে এসেছি, কবি তিনিই, যিনি সুদূরদ্রষ্টা। যিনি একই সঙ্গে শিল্পী এবং দার্শনিক। এবং এই সমস্ত কিছুর আগে, যিনি তাঁর নিজের সময়ে নিজের পারিপার্শ্বিকে সত্যের মানদণ্ডস্বরূপ। অর্থাৎ, যিনি কখনও কোনও কারণে আপস করবেন না এবং যাঁর কবিতা বরাবর সত্যের, ন্যায়ের পক্ষ নেবে। যাঁর কবিতা পড়ে একটা সময়কে চেনা যাবে, বোঝা যাবে। তার জন্য তাঁকে মাসুল দিতে হতে পারে, কিন্তু তিনি বা তাঁর কবিতা বিক্রয়যোগ্য কখনওই নয়। এ আমাদের পরম সৌভাগ্যের বিষয় যে, শঙ্খ ঘোষ নামের এক জন কবি এই যুগে আছেন। না হলে কবির এই প্রাচীন সংজ্ঞাকে আমাদের সময়ে অন্তত মৃতপ্রায় বলেই ধরে নেওয়া যেতে পারে। কারণ, স্বাভাবিক ভাবেই এ প্রায় অসম্ভব একটা কাজ, এত রকম মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হওয়ার মতো সময় এটা নয়, আর সে-জোরও সকলের থাকে না।

আমরা যদি গোড়া থেকে আজ পর্যন্ত তাকাই, তা হলে দেখব যে, শঙ্খবাবুর কবিতা ঠিক এই সংজ্ঞায়িত প্রায়-অসম্ভব কাজটিই করে এসেছে এত এত বছর ধরে। সময়ের স্পন্দনকে যেমন তিনি হাতছাড়া করেননি, তেমনই প্রত্যেক বার সত্যের পক্ষ নিতে তাঁর হাত কাঁপেনি। বরং আরও বেশি শক্ত হয়ে উঠেছে। সব হিসেবের বাইরে গিয়ে কেবল সত্যিটাকে বলে দেওয়াই বার বার হয়ে উঠেছে তাঁর কাজ। একেবারে একলা হয়েও নিজের বিশ্বাসে অটল থেকে, ন্যায়ের পাশে দাঁড়িয়ে সমর্থন জানানোই তাঁর একমাত্র ভূমিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই আজ শঙ্খ ঘোষের কবিতাসংগ্রহ মানে কয়েক দশকের একটি সমষ্টি, সময়ের স্পষ্ট ও নির্মম সংকলন।

এখানে প্রশ্ন করতেই পারেন কেউ, শঙ্খবাবুর এই বিরলতাই কি পৃথিবীর ইতিহাসে স্বাভাবিক নয়? সকলের কি তাঁর মতো আশ্চর্য প্রতিভা নিয়ে জন্মান? কিংবা তাঁর মতো পাণ্ডিত্য অর্জন করতে পারেন? অবশ্যই পারেন না। কিন্তু প্রতিভার পাশাপাশি যে-সততা, সেটার চর্চা তো সকলেরই আওতায়। পাণ্ডিত্যের পাশাপাশি যে-বিনয়, সে তো প্রত্যেকেরই শিক্ষণীয়। আমরা অন্তত সেই বৈশিষ্ট্যগুলি অনুসরণের চেষ্টা করেছি কি? যা ভাবি, সেইটাই বলবার চেষ্টা? অন্যায় দেখলে থমকে দাঁড়িয়ে বিরোধিতার চেষ্টা? অথবা ক্ষুদ্র অথচ সৎ প্রয়াস দেখলে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা? ঔদ্ধত্য না-দেখানোর চেষ্টা? এবং সর্বোপরি, ক্রীতদাস না হয়ে গিয়ে স্বাধীন থাকার চেষ্টা? এ সবের জন্য কিন্তু কবিতা লিখতে হয় না। শিরদাঁড়ার আন্তরিক অনুভূতিটুকু থাকলেই চলে।

ঠিক এখানেই শঙ্খ ঘোষের যাপন আর কবিতা মিলে গিয়েছে বার বার। কবির সঙ্গে মানুষ শঙ্খ ঘোষের ভঙ্গি কোথাও আলাদা হয়ে যায়নি। যে-পঙ্ক্তিতে তাঁর হাত চলেছে, সেই পথেই তিনি পা মিলিয়েছেন সব সময়। এই একটিমাত্র কারণেই তাঁর কবিতা বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়নি কোনও দিন। বরং আরও বেশি করে বিশ্বাসের উৎস হয়ে উঠেছে। তিনি হয়ে উঠেছেন মানুষের কবি, সময়ের স্বর। এই সব বিশেষণ বা উপমা হয়তো প্রয়োজনই হত না, যদি না আজ এই রকম অবস্থান নিতে পারাটা ভারী বিরল এক ব্যাপার হয়ে পড়ত। কিন্তু যখন প্রায় কারওই কথায় আর কাজে কোনও মিল নেই, যখন শিল্পীদের কোনও-না-কোনও দলের ছাতার নীচে গিয়ে না দাঁড়ালে চলছে না, যখন মতাদর্শকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে সময়ের ফায়দা তুলতে ব্যস্ত সকলে আর যখন বিশেষত ‘কবি’ শুনলেই লোকে আড়চোখে বোঝার চেষ্টা করছে শিরদাঁড়াটা আদৌ আছে কি না, এমন এক দুঃসময়ে শঙ্খ ঘোষ কেবলমাত্র এক জন কবির নাম নয়। একটা অবস্থানের নাম। উপস্থিত থেকেও অন্তর্ভুক্ত না হওয়া, সহজ হয়েও সহজলভ্য না হওয়া, আড়ালে থেকেও অবস্থানকে প্রকাশ্যে রাখা এবং বিনয় রেখেও নমনীয় না হওয়া, এর জন্য অন্য চর্যা, অন্য যাপন দরকার হয়।

আজ মনে হয়, কবিতা বোধহয় শেষমেশ কিছু পাল্টে দিতে পারে না। কিন্তু চাইলে, পাল্টে যেতে থাকা সময়ের মুখের ওপর স্থিত থাকতে পারে। নিজের আদল বদলালেও সে কিছুতেই তার আদত চরিত্র বদলায় না। সেই অবিচলই থাকাই তার প্রতিবাদ, দ্বিধাহীনতাই তার নীতি। শঙ্খ ঘোষের কবিতা আপসহীন পাল্টে না-যাওয়ার ইতিহাস, শিকড় থেকে অনড় থাকার ধারাবাহিকতা, দলের বাইরে মতের পক্ষে দাঁড়ানো বৃহত্তর রাজনীতির বিরল ঐতিহ্য। তিনি সেই আদিবৃক্ষেরই মতো, যুগের পর যুগ ধরে বুকে কুঠার সইতে পারাই যার ধর্ম।