শক্তিকান্ত দাস মহাশয় বলিয়াই দিয়াছেন, সেন্ট্রাল স্ট্যাটিস্টিকাল অর্গানাইজেশন— তাহার নামের সহিত সঙ্গতি রাখিয়াই— পরিসংখ্যানের উপর নির্ভর করিয়া কাজ করে। প্রতিষ্ঠানটি নিছক ধারণা বা গালগল্পের ভিত্তিতে কিছু বলিয়া দিবে, তাহা প্রত্যাশা করা যায় না। অস্যার্থ, দেশ-বিদেশের অর্থনীতিবিদরা যতই বলুন, সাধারণ মানুষের যতই নাভিশ্বাস উঠুক, সিএসও-র হিসাবে নোট বাতিলের দানব থাবা বসাইতে পারে নাই। অক্টোবর মাস অবধি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে সিএসও জানাইয়াছে, বর্তমান অর্থবর্ষে ভারতের জাতীয় আয়ের বৃদ্ধির হার ৭.১ শতাংশ হইতে চলিয়াছে। অর্থশাস্ত্রীরা পূর্বাভাসটিতে বিশ্বাস করিবার বিশেষ কোনও কারণ পাইতেছেন না। নভেম্বর মাস হইতে অর্থনীতিতে যে তাণ্ডব চলিতেছে, নাসিম তালেবের পরিভাষা ধার করিলে তাহাকে বলিতে হয় ‘ব্ল্যাক সোয়ান ইভেন্ট’। এমন কোনও ঘটনা যে ঘটিতে পারে, অর্থনীতিতে তাহার ইঙ্গিতমাত্র ছিল না। অতএব, অক্টোবর অবধি পরিসংখ্যানে নভেম্বর-পরবর্তী উথালপাথালের ছাপ পাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নাই। শেষ পাঁচ মাসের হিসাব জুড়িলে আর্থিক বৃদ্ধির হার যে ৭.১ শতাংশে পৌঁছাইবে না, অর্থনীতিবিদরা ক্রমাগতই সেই আশঙ্কা প্রকাশ করিতেছেন। যাঁহারা আশাবাদী, তাঁহারা সাত শতাংশের সামান্য কম হারের কথা বলিতেছেন। হারটি ছয় শতাংশের নীচে নামিয়া যাইতে পারে বলিয়াও অনেকের আশঙ্কা। কিন্তু, শক্তিকান্ত দাস বলিবেন, সব আশঙ্কাই ‘নিছক ধারণা ও গালগল্পের ভিত্তিতে’— সরকার এখন সেই আশঙ্কার দিকে তাকাইবে না। তবে, অর্থবিষয়ক সচিব নিশ্চয় জানিবেন, তাঁহারা নজর ফিরাইয়া রাখিলেও ঝড় থামে নাই।

কিন্তু, সেই প্রসঙ্গ ভবিষ্যতের জন্য থাকুক। খাঁটি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে প্রাক্‌-ডিমনিটাইজেশন পর্বের যে ছবিটি পাওয়া গিয়াছে, তাহাই কি নরেন্দ্র মোদীর সরকারের পক্ষে গৌরবের? প্রতিশ্রুতি ছিল, আর্থিক বৃদ্ধির হার আট শতাংশের কক্ষপথে পৌঁছাইবে। অক্টোবর অবধি পরিসংখ্যানই বলিতেছে, নোট বাতিল না হইলেও সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। কারণ খুঁজিতে পরিশ্রম নাই। সামগ্রিক ভাবে শিল্পক্ষেত্রের বৃদ্ধির হার গত অর্থবর্ষের ৭.৪ শতাংশ হইতে কমিয়া ৫.২ শতাংশে দাঁড়াইবে বলিয়া পূর্বাভাস। তাহার মধ্যে নির্মাণশিল্পে এই হার ৯.৩ শতাংশ হইতে কমিয়া ৭.৪ শতাংশ হইতেছে। মোট স্থায়ী মূলধন নির্মাণের হার গত বৎসর ৩.৯ শতাংশ বাড়িয়াছিল, এই অর্থবর্ষে তাহা সরাসরি হ্রাস পাইতেছে। অর্থাৎ, নোট বাতিলের পূর্বেই ভারতের শিল্পক্ষেত্র ধুঁকিতেছিল, বিনিয়োগের পরিমাণ কমিতেছিল। ব্যক্তিগত ভোগব্যয়ের বৃদ্ধির হারও নিম্নগামী। অর্থনীতি মূলত দাঁড়াইয়া আছে সরকারি ব্যয়বৃদ্ধির উপর। গত বৎসর সরকারি ব্যয় বাড়িয়াছিল ২.২ শতাংশ। এই বৎসর সেই বৃদ্ধির পরিমাণ ২৩.৮ শতাংশে দাঁড়াইবে।

অর্থাৎ, নোট বাতিলের খাঁড়ার ঘা যাহার উপর পড়িয়াছে, সেই ভারতীয় অর্থনীতি তাহার পূর্বেই বিস্তর রক্তাল্পতায় ভুগিতেছিল। মেক ইন ইন্ডিয়া, স্টার্ট-আপ ইন্ডিয়া সহ হাজার গালভরা নামে যে অর্থনীতির স্বাস্থ্য ফিরে না, তাহার জন্য প্রকৃত সংস্কার প্রয়োজন, এই কথাটি নরেন্দ্র মোদীরা কোনও দিন বুঝিবেন কি? বিনিয়োগের সুবিধার নিরিখে ভারত যথাপূর্বম্ রহিয়াছে, আন্তর্জাতিক পুঁজি ভারতের প্রতি কোনও বিশেষ আকর্ষণ বোধ করে না। অবশ্য, অর্থনীতি পরিচালনায় ব্যর্থতাই হউক বা নোট বাতিলের সম্পূর্ণ উদ্ভ্রান্ততা, সব কিছুকেই চাপা দেওয়ার অজুহাত নরেন্দ্র মোদীদের হাতে মজুদ। সম্ভবত তাঁহারা নিজেরাও সেই অজুহাতগুলিকে বিশ্বাস করিতে আরম্ভ করিয়াছেন। তাহাই ভারতীয় অর্থনীতির গ্রগাঢ়তম বিপদ।