এ ই যে নোট বাতিল হল, তাতে গ্রামের গরিবের তো খুব ক্ষতি হল। মেয়েদের অবস্থা নিশ্চয়ই আরও খারাপ? প্রায় ঝাঁঝিয়ে উঠলেন সীমা পড়িয়া, শীলা মণ্ডল, বসুমতী বারিকেরা। ‘কে বলেছে গরিবের ক্ষতি হয়েছে? অসুবিধে একটু হয়েছে, ক্ষতি কিছু হয়নি,’ এক সুরে বললেন ওরা। গোসাবায় নবচেতনা সংঘের ঘরে বসে প্রায় জনা কুড়ি মেয়ে। খেতমজুরি, মুরগি পালন, সব্জি বিক্রি, এমন সব পেশা। এ বারেও ওঁরা ধানকাটার মজুরি হাতে-হাতে পেয়েছেন। একই কথা শোনা গেল বীরভূমের মহম্মদ বাজারে, সওড়াকুড়ি গ্রামে মেয়েদের মুখে। দিশি মুরগির ডিমের দাম বেড়ে সাড়ে ছয়-সাত টাকা, মাংস ১৮০-২০০ টাকা। ‘শীতে যেমন দাম থাকে, তেমনই,’ বললেন ওঁরা। প্রথম এক সপ্তাহ টাকা বিক্রি কম ছিল, মুরগি ফেরত আনতে হয়েছে ঘরে। এখন সব যেমন কে তেমন। মুলো, কপি, বেগুন হয়েছে ভাল, দামও গত বারের মতো। মুর্শিদাবাদের নওদা পানুর মহামিলন সংঘের সদস্যরা পাট, সর্ষে কলাইয়ের বীজ তৈরি করেন। সভানেত্রী নাসরিন বেগম বললেন, ‘আমাদের কাজে প্রভাব পড়েনি।’ 

‘একটু সুবিধেই হয়েছে, শনি-রবিবারও খোলা থাকছে ব্যাঙ্ক,’ বললেন মিলি রাউত। গোসাবা থেকে ফের নৌকো করে চণ্ডীপুর, সেখান থেকে তিন কিলোমিটার ভ্যানে করে বিপ্রদাসপুর। মিলি সম্পাদিকা, ব্যাঙ্কে লাইন কমাতে রোজ গুনে-গুনে মেয়েদের পাঠিয়েছেন। নওদার নাসরিন সংঘের দফতরে ব্যাঙ্কের ক্যাম্প করিয়েছে ঋণ শোধ নিতে। ব্যাঙ্কের সঙ্গে মেয়েরা এই সংকটকে ‘ম্যানেজ’ করছে সাধ্যমতো।

পশ্চিমবঙ্গে চুয়াল্লিশ লক্ষ মেয়ে যুক্ত স্বনির্ভর দলের সঙ্গে। অধিকাংশই দরিদ্র। গোসাবা থেকে ডোমকল, মেয়েদের বক্তব্য: চাষ, প্রাণী পালনে হয়রানি হয়েছে, বিলম্বও হয়েছে, তবে মস্ত ক্ষতি কিছু হয়নি।

এ থেকে কোনও সিদ্ধান্তে আসা চলে না। তবে ইঙ্গিত মেলে, নোট বাতিলে বিধ্বস্ত গরিবের যে ছবি আঁকছেন নেতারা, তা হয়তো ঠিক নয়। বীজ-সারের অভাবে জমি ফাঁকা পড়ে নেই। হুগলি, বর্ধমান, পশ্চিম মেদিনীপুর, কোচবিহারে আলু চাষ হয়েছে গত বছরের মতোই। বরং বীজের দাম কমায়, দামোদর-ময়ূরাক্ষীর জল বেশি মেলার ঘোষণায় বেশি জমিতে চাষ হতে পারে, বললেন কৃষিকর্তারা। ধানচাষও হচ্ছে প্রত্যাশা মতোই।

অথচ নোট বাতিলের জেরে কৃষি ঋণ বণ্টন হয়েছে কম। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি মূলত সমবায়ের কৃষি ঋণের উপর নির্ভর করে। কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাঙ্কের হিসেব, শীতের ফসলের জন্য ডিসেম্বর পর্যন্ত গত বছর মোট ঋণ দেওয়া গিয়েছিল ৬৫৫ কোটি টাকা। এ বছর চারশো কোটি টাকায় পৌঁছনো যাবে। সব ব্যাঙ্ক মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত সাত হাজার কোটি টাকা কৃষি ঋণে ঘাটতি। চাষ তা হলে হচ্ছে কী করে? হতে পারে চাষি সমবায়-ঋণ নিয়ে অন্যের ধার শোধ করবে। অথবা হয়তো ছোট চাষিদের একটা বড় অংশই ব্যাঙ্কের ঋণে চাষ করে না কোনও দিন। তেমনই গিঁট-পাকানো ছবি ধানের দামে।

শোরগোল উঠেছে, নোট বাতিলের জন্য কেউ ধান কিনছে না। ঘটনা হল, ভাল বর্ষা হওয়ায় ধান হয়েছে প্রচুর। রেশনের চালের একটা বড় অংশ ঘুরপথে আসছে বাজারে। চাহিদা এমনিতেই কম। আর ধান কিনতে ব্যবসায়ী যে নামছে না, তার কারণ শুধু অক্ষমতা নয়, অনাগ্রহ। ‌বীরভূমের এক আড়তদার বললেন, ‘মিল মালিকরা বলছে, ধান দিয়ে চেক নিয়ে যাও। কিন্তু কত কেনাবেচা হচ্ছে দেখাব কেন?’

বারবার বোঝা গেল সে কথাটা। গোসাবার বাজার সমিতির সম্পাদক পঙ্কজ মণ্ডল ক্ষতির মস্ত ফিরিস্তি দিলেন। কিন্তু বাজারে সাড়ে চারশো স্থায়ী দোকানে কারও কার্ড মেশিন নেই। কেন? ‘গরিব  কখনও ও সব পারে? আমারই কার্ড নেই।’ মিলি রাউত কিন্তু বললেন, তাঁর তিন হাজার সদস্যের আশি শতাংশ এটিএম ব্যবহার করে। 

সার ব্যবসায়ী, বীজ বিক্রেতা, ধানের আড়তদার, বছরে কয়েক কোটি টাকার বিক্রি-বাটা করেন নগদে। নোট বাতিলে আর্তনাদ কতটা গরিবের, তা নিয়ে তাই ধন্দ থেকে যায়। একশো দিনের কাজের জন্য ৯০ লক্ষ গ্রামীণ মানুষে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পেয়েছেন। গ্রামে জনধন অ্যাকাউন্ট খুলেছে ১ কোটি

৭৩ লক্ষ। রাজ্যে দেড় কোটি গ্রামীণ পরিবার,  নিশ্চয়ই সকলে ব্যাঙ্কের কাজে স্বচ্ছন্দ নন। কিন্তু একেবারে ব্যাঙ্ক-বিচ্ছিন্ন, এমনও খুব বেশি আর নেই।

ব্যাঙ্ক আর গরিবের মাঝখানে যে শ্রেণি, যারা চার শতাংশে কৃষি ঋণ নিয়ে ষোলো শতাংশে ঠিকা চাষিকে দেন, কিংবা সার-বীজ ধারে দিয়ে জলের দরে ধান কিনে নেন, নোট বাতিলের প্রথম পঞ্চাশ দিনে  তাঁদের ঘা লেগেছে বেশি। ধান কাটার মজুরি দিতে ঘাম ছুটেছে তাঁদেরই। ছোট চাষি এ-ওর খেতে ধান কেটে কাজ তুলে দিয়েছে। ছোট চাষির আলু শেষ বহু দিন। বড় চাষির আলু পচছে হিমঘরে। ভিনরাজ্যে ট্রাক পাঠানো কঠিন, চাহিদাও পড়েছে।

হাতে নগদ কি ছোট চাষি চায় না? চায় বইকী, কিন্তু নগদের কারবারই যে তাকে ফসলের ন্যূনতম দাম পেতে দেয় না, সেটাও জানে সে। যেমন শ্রমিক ন্যূনতম মজুরি পায় না হাতে-নগদের ব্যবস্থায়। মহম্মদবাজারের পটেলনগরে খড়িমাটির খাদানে কাজ করছিলেন সারথি বায়েন, যমুনা বাদ্যকর, টুকু বায়েনরা। চার সপ্তাহ মজুরি মেলেনি। বলতে বলতেই ফটফট করে স্কুটার— ম্যানেজার বলে গেলেন পরের সপ্তাহেই চেক মিলবে। কিন্তু কী করে? ওই মেয়েদের অ্যাকাউন্ট আছে, কিন্তু তাদের দৈনিক ১২৫ টাকা মজুরি যে ন্যূনতম মজুরির চাইতে ৫৪ টাকা কম। সেটা যদি বা ‘অ্যাডজাস্ট’ হয়, কয়েকশো শ্রমিকের ইএসআই-পিএফ যাবে কোথায়? মুর্শিদাবাদে প্রতি সপ্তাহে বিড়ি শ্রমিকদের মজুরি ৩৫ কোটি টাকা, সবটাই নগদে। ‘ক’জনের আর অ্যাকাউন্ট আছে,’ বললেন বিড়ি মালিক সংগঠনের নেতা রাজকুমার জৈন। জেলার ‘লিড ব্যাঙ্ক’-এর কর্তা অমিত সিংহরায়ের উল্টো কথা— ‘সব বিড়ি কোম্পানির মালিকদের ডেকে বলেছিলাম, সব শ্রমিকেরই অ্যাকাউন্ট থাকার কথা কারণ তাদের জব কার্ড আছে। না থাকলে নামের তালিকা দিন, ক্যাম্প করে খুলে দিচ্ছি। কেউ দেয়নি।’

কয়লা খাদান, পাথর খাদান, ইট ভাটায় নোট বাতিলের পর সিকি মজুরি, বিনা মজুরিতে কাজ করছেন যে শ্রমিকেরা, তাঁদের অ্যাকাউন্টে টাকা দিতে চাইলেই ফাঁসবে মালিক। ‘কেবল মজুরকে মোবাইল ব্যাঙ্কিং শেখালে হবে না। এ সব শিল্পের খোলনলচে বদলাতে হবে,’ বললেন ‘নাগরিক মঞ্চ’-এর নব দত্ত। রাজ্যের দু’কোটি অসংগঠিত শ্রমিকের ভাল হবে না মন্দ, তা এখন ঝুলছে সম্ভাবনার সুতোয়। যদি সরকারের চাপে অসংগঠিত শিল্প আধ-কালো থেকে সাদাটে হয়, তবে লাভ। আর যদি ঝামেলায় না গিয়ে অন্য শিল্পে সরে যায় বিনিয়োগ, বন্ধ হবে বহু ভাটা, খাদান, কারখানা। নোট বাতিলের ধাক্কা হয়তো গরিব খাবে বছর দুয়েক পরে।

আপাতত সে আমোদে আছে। বস্তা-ভরা টাকা কারা ফেলে গিয়েছে বাগানে, কোন পুকুরে নোট ভাসছে, কোন নেতা স্কুল-চাকরির ঘুষ ফিরিয়ে নিতে সাধছে, সে গল্পে মশগুল টিউবকলের চত্বর, ধান ঝাড়ার উঠোন। ওদের প্রতি বিদ্রুপ ঠিকরে পড়ছে সোশ্যাল মিডিয়াতে— ‘ওরা বুঝছে না নোট বাতিল করে সুইস ব্যাঙ্কের টাকা ফিরবে না, আম্বানি-আদানি জব্দ হবে না। কতটুকু কালো টাকা ফিরবে?’

ডোমকলের যুগিন্দা-রায়পাড়া গ্রাম। বিকেলের রোদ মুখে মেখে মেয়েরা অনেক নালিশ করল। ইট ভাটায় মজুরি মিলছে না, কাজ হারিয়ে ফিরছে পুরুষরা, লোন দিচ্ছে না ব্যাঙ্ক। ফেরার সময় অন্ধকারে মিশে এসে দাঁড়ালেন রুনা বিবি। ‘আমাদের কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু ভাল হচ্ছে এটা। ঠিক হচ্ছে।’

এ কি শুধু ঈর্ষার জ্বালা? গাঁধী অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন, চাষি জমিদারকে কর দিতে অস্বীকার করেছিল। বিদেশি সরকার আর দিশি জমিদারের তফাত বোঝাতে হয়েছিল তাদের। সত্তরের দশকে দেখা গেল, খুব ভুল তারা বোঝেনি। জমির লড়াই কম ভয়ানক ছিল না। সে দিনের জমিদার-জোতদারের মতো‌ই আজকের আড়তদার-খাদান মালিক-ঠিকাদার আর তাদের ‘ক্লায়েন্ট’ নেতা-পুলিশ খেটে-খাওয়া মানুষকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে রেখেছে। আড়তদার আদানি নয়, কিন্তু গ্রামের অর্থনীতিতে তার দখল কি কম? প্যান্টের পকেটে যারা দু’চার লাখের বান্ডিল নিয়ে বাইক চড়ে বেড়ায়, সুইস ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট নেই বলে সেই খাদান-মাফিয়া তুচ্ছ? জমি-চাকরি চলে যাচ্ছে চাষি-মজুরের নাগালের বাইরে, সোজা পথে বিচার-প্রতিকার পাওয়া অসম্ভব, দ্বিতীয় সরকার যেন দ্বিতীয় প্রশাসন চালাচ্ছে, কালো টাকার প্রাচুর্যে। শহুরে মধ্যবিত্তের কাছে জেলার শহরে-গ্রামে উড়তে থাকা কালো টাকা নগণ্য হতে পারে। গ্রামের গরিবের কাছে নয়। মানুষের নিরাপত্তার মাপ, সম্মানের হিসেব শতাংশে হয় না।

নোট বাতিলে গ্রামের গরিবের কত কষ্ট, তা হয়তো আর একটু ভাল বোঝা যেত যদি হিসেব-বাগীশদের জানা থাকত গরিবের কষ্টটা কোথায়।