সঙ্কট যে মুখ্যমন্ত্রী বাড়তে দিতে চান না, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। পরিস্থিতির মোকাবিলায় নবান্নে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকও তিনি করলেন। কিন্তু ডেঙ্গি আর অজানা জ্বরের প্রকোপ তথা আতঙ্ক যে ভাবে বাড়ছে রাজ্যে, তা নিয়ন্ত্রণে এবং নিরসনে প্রশাসনিক তৎপরতা কতখানি দেখা যাবে, সে খুব স্পষ্ট হল না।

অযথা আতঙ্ক ছড়ানো কখনওই সমর্থনযোগ্য নয়। সঙ্কটকালে আতঙ্কের বাতাবরণ তৈরি হলে সঙ্কট গভীরতর হয়। তাই ডেঙ্গি বা অজানা জ্বরের বিষয়ে অযথা আতঙ্ক বা গুজব না ছড়ানোর যে বার্তা মুখ্যমন্ত্রী দিয়েছেন, সেই বার্তায় সাড়া দেওয়া প্রত্যেকের কর্তব্য। অসুস্থতা এড়াতে প্রত্যেক নাগরিককে ব্যক্তিগত উদ্যোগেই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে বলে মুখ্যমন্ত্রী যে পরামর্শ দিয়েছেন, তাও অকাট্য। কিন্তু রোগের প্রকোপ রুখতে সরকার তথা প্রশাসন খুব জোরদার কোনও পদক্ষপ করতে চলেছে, মারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ বা পুরসভা-পঞ্চায়েত সর্বক্ষণ নাগরিকের খেয়াল রাখতে চলেছে, এমন একটা বার্তাও প্রত্যাশিত ছিল। তেমন কোনও আশ্বাস মিলল না।

আরও পড়ুন: উদ্বেগের কিছুই নেই, ডেঙ্গি নিয়ে ভুল প্রচার, মত মমতার

ব্যবসায়িক স্বার্থে কিছু রোগ নির্ণয় কেন্দ্র ডেঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ে অযথা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানালেন। এই ধরনের বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তাও তিনি দিলেন। রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসক যখন অভিযোগ করছেন যে, ডেঙ্গি বা অজানা জ্বরের প্রকোপ নিয়ে কোনও কোনও মহল বিভ্রান্তি ছড়াতে চাইছে, তখন সে বক্তব্যকে গুরুত্ব না দিয়ে পারা যাচ্ছে না। বিভ্রান্তিকর কার্যকলাপের খবর পৌঁছেছে বলেই বিষয়টি নিয়ে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীকে মুখ খুলতে হয়েছে, ধরে নিচ্ছি এমনই।

অতএব, সম্ভাব্য বা জরুরি প্রশাসনিক পদক্ষেপকে আগাম সমর্থন জানিয়ে রাখছি। সঙ্কীর্ণ ব্যবসায়িক স্বার্থে যদি কেউ রোগ বা রোগের প্রকোপ নিয়ে বিভ্রান্তি বা আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করেন, তা হলে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপই কাম্য। কিন্তু রোগ নির্ণয় কেন্দ্রের অসাধুতা বা স্বার্থান্বেষী মহলের শঠতা তো এই কাহিনীর কেন্দ্রীয় চরিত্র নয়। কেন্দ্রীয় চরিত্র তো কলকাতা, শহরতলি এবং পার্শ্ববর্তী জেলাগুলিতে ডেঙ্গি এবং অজানা জ্বরের প্রকোপ। ওইটিই তো প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত ছিল। তা তো হল না। মূল সমস্যার বদলে পার্শ্ব-সমস্যাই তো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ধরা দিল প্রশাসনের কাছে। ডেঙ্গি না হওয়া সত্ত্বেও ডেঙ্গির ভয় দেখানো হচ্ছে বলে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে খবর পৌঁছে দেওয়া হল। তাই ডেঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ে নবান্নে বৈঠকের পরে মুখ্যমন্ত্রী যে সাংবাদিক সম্মেলন করলেন, তাতেও ডেঙ্গি সংক্রান্ত অপপ্রচার রোখার বার্তাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেল।

ডেঙ্গিতে বা অজানা জ্বরে রাজ্যে এ পর্যন্ত কত জনের মৃত্যু হয়েছে, তার একটা হিসেব তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী। অন্য কয়েকটি রাজ্যের ডেঙ্গি-চিত্রও তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। সেই সব রাজ্যের চেয়ে এ রাজ্যের পরিস্থিতি যে অনেকটাই ভাল, তেমনটাও বোঝানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। এ রাজ্যের ডেঙ্গি পরিস্থিতি যদি সত্যিই অন্য রাজ্যের তুলনায় ভাল হয়, তা হলে সাধুবাদ প্রাপ্য মুখ্যমন্ত্রীর এবং প্রশাসনের। কিন্তু ডেঙ্গি পরিস্থিতির আসল ছবিটা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আদৌ পৌঁছচ্ছে কি না, তা নিয়ে সংশয় বিস্তর।

কিছু পুরসভা নিজেদের দায়িত্ব ঠিক মতো পালন করছে না, ডেঙ্গি পরিস্থিতি তাতেই আরও জটিল হয়েছে স্থানে স্থানে। ইঙ্গিত স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর। অর্থাৎ প্রশাসনের তরফে গাফিলতি যে রয়েছে কিছুটা হলেও, সে কথা মুখ্যমন্ত্রী মেনে নিয়েছেন। এই গাফিলতির বিরুদ্ধে, এই অবহেলার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপটা খুব জরুরি এখন। বিভ্রান্তি রুখুন, আপত্তি নেই। কিন্তু বিভ্রান্তি রোখার চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজনীয় রোগ ছড়ানো রোখা। সেই লক্ষ্য পূরণে প্রশাসন কতটা প্রস্তুত? প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলকেই বা কতটা জানতে দেওয়া হচ্ছে প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে? প্রশ্নগুলো থেকেই যাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীকেও বুঝে নিতে হবে সে কথা।