মেডিক্যাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়াকে বাতিল করিয়া জাতীয় মেডিক্যাল কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়াছে সরকার। তাহা চিকিৎসকদের পছন্দ হয় নাই। বেশ কথা। বিপক্ষে সওয়ালের অধিকার তাঁহাদের আছে। কিন্তু ধর্মঘট কেন? মঙ্গলবার দেশ জুড়িয়া হয়রান হইলেন রোগীরা। এবং সেই দিনই সরকার প্রস্তাবিত আইনটিকে সংসদের স্থায়ী কমিটির নিকট পাঠাইল। চিকিৎসকেরা হয়তো সফল হইলেন, আহত হইল গণতন্ত্র। ‘আমাদের কথা শুনিতে হইবে, নহিলে রোগী বিনা চিকিৎসায় মরিবে,’ এই অবস্থান কী করিয়া কোনও সভ্য দেশের চিকিৎসকরা লইতে পারেন, তাহা এক পরম বিস্ময় বলিয়াই মানিতে হইবে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক স্বার্থান্ধ, সংস্কার-বিরোধী চিকিৎসকদের ‘মেডিক্যাল মাফিয়া’ বলিয়াছেন। কথাটি শুনিতে কটু হইতে পারে, কিন্তু তাহা যে উড়াইয়া দেওয়া চলে না, মঙ্গলবার ফের তাহার ইঙ্গিত মিলিল। দূষিত রাজনীতির অপরিণামদর্শী নেতাদের সহিত এই ধর্মঘট এক অবস্থানে দাঁড় করাইল চিকিৎসক সংগঠনের নেতাদের।

চিকিৎসকরা বলিতে পারেন, জনস্বার্থের কথা ভাবিয়াই তাঁহারা প্রতিবাদ করিতেছেন। তাঁহাদের যুক্তি, প্রস্তাবিত আইনটি কার্যকর হইলে মেডিক্যাল শিক্ষার খরচ দ্রুত বাড়িবে, দরিদ্র ছাত্ররা বঞ্চিত হইবে, আরও একটি পরীক্ষা আরোপিত হইবার জন্য চিকিৎসা করিবার অনুমোদন পাইতে অকারণ বিলম্ব হইবে, ইত্যাদি। যুক্তি অসার নহে। বাস্তবিকই খসড়া আইনটি বহু স্থানে অস্পষ্ট ও শিথিল। বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কেবলমাত্র কমিশনের সদস্যদের উপর ছাড়িয়া রাখা হইয়াছে। প্রধানত দুর্নীতি রোধ করিবার জন্য সংস্কারের প্রয়োজনে আইন, অথচ তাহা কী করিয়া দুর্নীতি রুখিবে, তাহার কোনও সুষ্ঠু পদ্ধতি খুঁজিয়া পাওয়া দুষ্কর। ফলে খসড়া আইন রচনায় যথেষ্ট মনোনিবেশ করা হইয়াছিল কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ জাগিতে বাধ্য। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মস্তিষ্কপ্রসূত ‘নীতি আয়োগ’ যে কয়টি সংস্কারের উদ্যোগ আজ অবধি লইয়াছে, তাহার অনেকগুলির মতোই ‘জাতীয় মেডিক্যাল কমিশন বিল ২০১৭’ একটি অপরিণত, অর্ধসিদ্ধ প্রস্তাব। খসড়ার অনেকগুলি বিষয়ে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন, অ-চিকিৎসক বিশেষজ্ঞরাও তাহা বলিতেছেন।

অতএব প্রস্তাবটি লইয়া আরও আলোচনা প্রয়োজন, সে বক্তব্যে আপত্তি নাই। রাজ্যসভায় সেই সুযোগ আসিবে বলিয়া দেশ প্রতীক্ষা করিতেছিল। তাহার পূর্বেই, সম্ভবত চিকিৎসকদের প্রতিবাদের প্রাবল্যে, তাহা গেল সংসদীয় কমিটিতে। এখন প্রশ্ন এই যে, সংসদীয় কমিটি পরিবর্তিত প্রস্তাব আনিলে কি চিকিৎসকদের নিকট তাহা অধিক গ্রহণযোগ্য হইবে? মেডিক্যাল কাউন্সিল যে দুর্নীতিগ্রস্ত, কর্তব্যপালনে ব্যর্থ এক সংস্থা, সেই অভিযোগ এক কথায় নাকচ করিবার উপায় নাই। সুপ্রিম কোর্ট, সংসদীয় কমিটি, এমনকী এক কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী অবধি খোলাখুলি তাহার দুর্নীতির নিন্দা করিয়াছেন। কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট দুর্নীতির দায়ে দুই বার গ্রেপ্তার হইয়াছেন। দুই দশক ধরিয়া মেডিক্যাল কাউন্সিলের সংস্কার করিবার চেষ্টা চলিতেছে। চিকিৎসকদের প্রভাবশালী এক অংশের বিরোধিতায় সব উদ্যোগ ব্যর্থ হইয়াছে। কাউন্সিলের বিকল্পের প্রস্তাব করিয়া আইনের খসড়া হয় ২০০৯ সালে। ২০১২ সালে এক সাংসদীয় কমিটি তাহা খারিজ করে। সুপ্রিম কোর্ট তিন-সদস্যের তত্ত্বাবধায়ক কমিটি নিয়োগ করে ২০১৬ সালে। তাহাদের সংস্কার-প্রস্তাবও কাউন্সিল মানে নাই। দেশবাসীর কাছে নানা ঘটনায় স্পষ্ট হইয়াছে যে, চিকিৎসকরা স্বনিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ, অপরের নিয়ন্ত্রণও মানিবেন না। আপাতত খসড়া আইনটি স্থায়ী সংসদীয় কমিটিতে গিয়াছে। ইহাই সংস্কারের অগস্ত্যযাত্রা কি না, সেই সংশয় রহিল।