কালীর বর্ণনা একান্তই পৌরাণিক

অচিন্ত্য বিশ্বাস (‘অন্য ধারার উৎসব’, ১৩-১২) জানিয়েছেন, কালী ঋগ্বেদের রাত্রিসূক্তে উপস্থিত। এই প্রসঙ্গে যৎকিঞ্চিৎ নিবেদন।

প্রথানুসারে দুর্গাসপ্তশতী বা চণ্ডীপাঠের পূর্বে রাত্রিসূক্ত (ঋগ্বেদ, দশম মণ্ডল, ১২৭ সূক্ত) পঠনীয়। আর পাঠ সমাপনান্তে দেবীসূক্ত (ওই, ১২৫ সূক্ত) অবশ্যপাঠ্য। ওই দুটি সূক্তের পাঠ চণ্ডী আবৃত্তির উদ্বোধনে ও সমাপনে নিশ্চয় কোনও বিশেষ তাৎপর্যবাহী রীতি। রাত্রিসূক্তের ঋষি কুশিক, আর দেবতা রাত্রি। কিন্তু রাত্রি কি কালী? চণ্ডীতে কালীর আবির্ভাব উত্তমচরিতে। দেবীর ক্রোধদীপ্ত আননে ভ্রূকুটিকুটিল আজ্ঞাচক্রের স্থান থেকে তাঁর প্রকাশ (সপ্তম দোবীমাহাত্ম্য, ৫-৮) চণ্ডমুণ্ড বধের প্রাক্কালে। তাঁর রূপের যে বর্ণনা আমরা পাই তার সঙ্গে রাত্রিসূক্তের রাত্রিদেবীর সাযু্জ্য কি সহজবোধ্য?

রাত্রিসূক্তে রাত্রি আলোকের দ্বারা অন্ধকার বিমোচন করেন। জ্যেতিষা বাধতে তমঃ (ঋক ২)। তিনি উষার ভগিনী। রাত্রিসূক্তে উষার কাছে ঋণমুক্তির জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে। প্রাণিকুল বৃক্ষাশ্রিত পক্ষিদলের মতো রাত্রির কাছে আশ্রয়প্রার্থী (ঋক ৫) রাত্রিসূক্তের আটটি ঋকে চণ্ডীর কালী-রূপের আভাসমাত্র দেখা যায় না। বরং জীবনানন্দ কথিত ‘আলোর রহস্যময়ী সহোদরার মতো এই অন্ধকার’ (নগ্ন নির্জন হাত, বনলতা সেন) যেন রাত্রিসূক্তের দূরান্বিত প্রতিধ্বনি।

চণ্ডীতে তামসীদেবীর উল্লেখ রয়েছে প্রথম চরিতে মধূকৈটভ বধের প্রসঙ্গে। এই চরিতের দেবতা মহাকালী। ধ্যানমন্ত্রে এই দেবী ‘নীলাশ্মদদ্যুতিময়ী’ ও তমোগুণের অধিষ্ঠাত্রী মহামায়া (৫৩)। কল্পান্তে বিষ্ণু তাঁর মায়ায় যোগনিদ্রায় আবিষ্ট। তাঁর নয়ন মুদিত (৭০)। বোধহয় ঋগ্বেদের নাসদীয় সূক্তের ছায়াতে এই কল্পনাপুষ্ট। চণ্ডীর মধ্যমচরিতে মহিষাসুর বধের আখ্যান, সেখানে দেবতা মহালক্ষ্মী। তিনি রজোগুণের অধিষ্ঠাত্রী। তাঁর নানাবিধ আয়ুধ, যেমন, ধনুঃশ্বর, বজ্র, তরবারি, বর্ম, পানপাত্র, ত্রিশূল ইত্যাদি। দুর্গার আয়ুধগুলিই মহালক্ষ্মীর ধ্যানে উল্লেখিত। চণ্ডমুণ্ড ও শুম্ভনিশুম্ভ বধের বিবরণের যে উত্তমচরিত, তার দেবতা মহাসরস্বতী। তাঁর হাতে ধনুঃশর ও ঘণ্টা-ত্রিশূলের সঙ্গে লাঙল আছে। তিনি গৌরীর দেহসমুদ্ভবা।

চণ্ডীর কবচ অংশে নবদুর্গার অন্যতমা কালরাত্রি। কালরাত্রি জ্যোতির আসন্ন উদ্ভাসকে গর্ভে ধারণ করেন। এ কথা রাত্রিসূক্তে শোনা গেছে। চণ্ডীর একটি বিখ্যাত পংক্তি হল: ‘কালরাত্রির্মহারাত্রি মোহরাত্রিশ্চ দারুণা’ (প্রথম চরিত, ৭৮)। সাংখ্যদর্শনের প্রকৃতিতত্ত্ব অনুসারে দেবীকে গুণত্রয়বিভাবিনী বলা হয়েছে। তিনি তমঃ, রজঃ ও সত্ত্বগুণের সমাহারে  স্থিতা হলেও উষার সহোদরারূপে কল্পিতা নন।

এখন প্রশ্ন, রাত্রি বলতে কি বোঝায়? কোনও কোনও সাধনপরম্পরায় ঋগ্বেদের রাত্রিসূক্ত এবং চণ্ডীকে সাধনশাস্ত্র গণ্য করা হয়। শ্রীকপালি শাস্ত্রীয়ার তাঁর বেদগুপ্তার্থ গ্রন্থে বলেছেন যে, রাত্রিশব্দে সাধারণ মানুষী প্রজ্ঞা বোঝায়। মানুষী সাধারণ প্রজ্ঞার গর্ভেই দেবীপ্রজ্ঞার সম্ভাবনা নিহিত থাকে।

ভগিনী নিবেদিতা ঋগ্বেদের নাসদীয় সূক্তের পঞ্চম ঋকে কালীপ্রতিমার বী়জ রয়েছে বলে মনে করেছেন। ওই ঋকটির ইংরেজি অনুবাদ করেছেন তিনি: The Self sustained as Cause below,/Projected as Effect above. এবং তাঁর মন্তব্য: ‘...the image of Goddess Kali is held to be foreshadowed in the sublime Anthem to Creation of the Rig-Veda.’ (দ্য ওয়েব অব ইন্ডিয়ান লাইফ, ১৯৯৬, পৃ ২১৮) ভগিনী নিবেদিতা স্পষ্টত সাংখ্যদর্শনের সৎকার্যবাদ অনুসরণ করেই এমনতর মন্তব্য করেছেন।

প্রসঙ্গত আমরা স্মরণ করতে পারি যে, ওই সূক্তটি বিবেকানন্দের প্রিয় ছিল। কাব্য হিসেবে তিনি ওই সূক্তের তৃতীয় ঋকের এই অংশটির কথা বলেছেন, তম আসীত্তমসা গূঢ়মগ্রে। অন্ধকারের পূর্বে অন্ধকার ছিল। আমাদের মনে পড়ে, রবীন্দ্রনাথের বাক্ভঙ্গি: ‘অন্ধকার হতে অন্ধকারে চলে গেল দিন’।

আমরা চণ্ডীতে কালীর যে বর্ণনা পাই তা একান্তই পৌরাণিক যুগের দান। আর সেই কল্পনা ঋগ্বেদের রাত্রিসূক্ত অথবা নাসদীয় সূক্তের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন পরম্পরায় সম্পৃক্ত, এমনতর ভাবনা আমাদের আধুনিক ইতিহাসবোধকে পীড়িত করে।

বরং মনে হয়, বৈদিক ও তান্ত্রিক সাধনা সমান্তরাল এবং স্বতন্ত্র দুটি ধারা ছিল। পরবর্তী কোনও কালে ব্রাহ্মণ্য অধিকারের সময় তান্ত্রিক ধারাটি বৈদিক আধিপত্যের অন্তর্গত হয়ে যায়। যেমন, মাতৃতন্ত্র এককালে পিতৃতন্ত্রের মধ্যে বিলুপ্ত হয়েছিল। কিংবা, শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ যেমন এককালে দুটি বিশিষ্ট ধারা ছিল, পরে তা লোপ পায়। আর তখনই চণ্ডীপাঠের আগে ও পরে রাত্রিসূক্ত ও দেবীসূক্ত পাঠের রীতি বা বিধি প্রবর্তিত হয়। চণ্ডী অনুষ্টুপ ছন্দে গ্রথিত। ঋগ্বেদীয় সূক্ত দুটির ছন্দ অনুষ্টুপ নয়। পাঠের সময় ওই ছন্দান্তর স্বীকৃত হয় কি? চণ্ডীতে দেবীকে ‘নিঃশেষ দেবগণশক্তি সমূহমূর্তা’ বলার মধ্যে কি কোনও সমাজ প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের ইঙ্গিত লুকিয়ে নেই? আবার এ কথাও বলা হয়েছে, যে দেবী একাধারে পিতৃযানের স্বধা ও দেবযানের স্বাহা।

রত্নাবলী ভট্টাচার্যরায়। শিলিগুড়ি

পার্ক স্ট্রিটে এত মজা?

পঁচিশে ডিসেম্বর পার্ক স্ট্রিটের আলোকোজ্জ্বল ও আনন্দময় ছবি দেখলাম, খবরেও পড়লাম যে আনন্দ করার সুবিধের জন্য গাড়ি-চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সেখানে। কিন্তু পার্ক স্ট্রিট তো প্রথমত একটা স্ট্রিট, একটা রাস্তা। সেটাকে একটা মেলার জায়গা বানিয়ে দিলাম আর লোকে দেদার মজা করবে ও সেলফি তুলবে বলে অমন গুরুত্বপূর্ণ একটা রাস্তা গাড়ির ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ হয়ে গেল, এটা কি ঠিক সিদ্ধান্ত?

পার্ক স্ট্রিট শহরের অনেকগুলো অন্য রাস্তায় যাওয়ার পথও বটে। কোনও আনন্দই কি শহরের প্রধান সুবিধেগুলোর বিরুদ্ধে গিয়ে করা যেতে পারে?

অনেকে বলবেন, দুর্গাপুজোয় কি রাস্তা বন্ধ হয় না? বা, অন্য কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময়? হয়, এবং তা-ও ঠিক মনে করি না। কোনও উৎসবের অজুহাতেই যদি নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলোর ওপর খাঁড়া নেমে আসে, তা ভুল। তখন মনে হয় এই শহরের পরিচালকরা অনাধুনিক ও অপরিণত, একটু বেশিই তোষণ করতে উৎসাহী।

পুষ্পল সাহা। টালিগঞ্জ