প্রশ্নটা অন্য রকম

অমিতাভ গুপ্তর ‘শহর আর ফালতু মানুষ’ (২৮-১২) নিবন্ধটি পড়ে মনে হল, ‘ছায়ার সঙ্গে যু্দ্ধ করে গাত্রে হল ব্যথা’। বিষয়বস্তু যদি ‘ফুটপাতের হকারমুক্তি’ হয়, তা হলে তথাকথিত ভূমিপু্ত্র আর বহিরাগতের প্রশ্ন উঠছে কেন? পথচারী মাত্রেরই ন্যূনতম চাহিদা, তাঁর পথ চলা যেন মসৃণ হয়। হকাররূপী বাধা সরে গেলে তবেই ফুটপাতে মসৃণ ভাবে পথ চলা সম্ভব। ফুটপাত দিয়ে কেবলমাত্র ভূমিপুত্ররাই হাঁটবেন আর বহিরাগতরা হাঁটবেন না, সে রকম চাহিদার কথা কিন্তু আদৌ শোনা যায়নি।

অন্য দিকে, সব হকারই বহিরাগত, এই ধারণাও একেবারেই ঠিক নয়। যে দেশে গ্রুপ ডি-র পদে চাকরির জন্য কয়েক লক্ষ আবেদন জমা পড়ে এবং উচ্চ শিক্ষিতরা সাফাইকর্মীর পদে চাকরি করতে প্রস্তুত থাকেন, সে দেশে স্থানীয় ভূমিপুত্ররাও ফুটপাতে হকারি করতে বাধ্য হন।

তাই বালিগঞ্জের রাহুল মুখোপাধ্যায় চাকরি না পেয়ে ফুটপাতে হকারি করতেই পারেন, আবার বাসন্তী থেকে রাখাল মণ্ডল চাকরিসূত্রে কলকাতায় এসে ফুটপাত দিয়ে সাধারণ পথচারীর মতো হাঁটতেই পারেন। এবং তিনিও, ফুটপাত দিয়ে তাঁর হাঁটাটা মসৃণ হোক, তা চাইতেই পারেন।

তাই প্রশ্নটা ‘বালিগঞ্জ বনাম বাসন্তী’ বা ‘মুখোপাধ্যায় বনাম মণ্ডল’ নয়। অহেতুক বিষয়টাকে জটিল করার দরকারই নেই।
বেঁচে থাকার অধিকার হাঁটার অধিকারের থেকে বেশি জরুরি বলেই ফুটপাত হকারমুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে হকারদের পুনর্বাসনের কথাও স্বাভাবিক ভাবেই উঠছে। কিন্তু এটাকে ‘ভূমিপুত্র বনাম বহিরাগত’র বিষয় বলা যায় না।

চন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়  সোনারপুর

মিছিল

 জয়ন্ত বসু ‘ঠিক করেছেন অভিভাবকরা’ (১৫-১২) নিবন্ধে লিখছেন, ‘‘তাই, সাম্প্রতিক অভিভাবক আন্দোলনের দিকে ‘তুমিও ব্রুটাস’ বলে আঙুল দেখানোর আগে রাজনীতিবিদদের এক বার ভাল করে আয়নায় মুখ দেখা উচিত। বোঝা উচিত, কেন রাজ্যে সামাজিক আন্দোলন মিছিল-অবরোধের এঁদো গলিতে এসে আটকে গেল।” গণতন্ত্রের নামে প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্র প্রসঙ্গে লিখছেন, ‘বামপন্থীরা ক্ষমতা হারিয়ে হাড়ে হাড়ে শিখেছেন, তৃণমূল কংগ্রেসিরাও যত তাড়াতাড়ি শেখেন, তত মঙ্গল।’

প্রথমত, ‘বামপন্থী’ না বলে বামফ্রন্ট সরকার বলাটাই এ ক্ষেত্রে সমীচীন হত। কারণ, সিপিএম এবং বামফ্রন্টের শরিক দলগুলোর সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে, এবং এই দলগুলোর বাইরে, বামপন্থী মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বহু মানুষ ছিলেন, আছেন, থাকবেন— যাঁরা বামপন্থার প্রতি বিশ্বাসের জায়গা থেকেই সিপিএম সরকারের স্বৈরতন্ত্র, দাদাগিরির বিরোধিতা করেছেন, সেই সরকারের অপসারণ চেয়েছেন।

দ্বিতীয়ত, মিছিল বা অবরোধ ‘এঁদো গলি’ নয়, সামাজিক আন্দোলনের এগুলিও মাধ্যম, বিপন্ন মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। স্বাধীনতার সময় থেকে শুরু করে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের পর্বে কলকাতার বুকে বিশাল প্রতিবাদ মিছিলসহ বহু জানা-অজানা ইতিহাস তার সাক্ষী। শুধু বিশৃঙ্খলা বা গিমিক তৈরির জন্য রাস্তা আটকানো আর ন্যায়সংগত কারণে মিছিল বা অবরোধের মাধ্যমে দাবি পেশ করা— এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য বিচারের ক্ষমতা ক্রমশই হারিয়ে ফেলছি আমরা। ঠিকই, মিছিল-অবরোধে মানুষের অসুবিধা হয়, কাজের ক্ষতি হয়। কিন্তু ভুললে চলবে না, আরও কোনও মারাত্মক ক্ষতি, অসহায়তা, জীবন-জীবিকার ওপর আক্রমণই মানুষকে পথে নামায়, মিছিল-অবরোধে যেতে বাধ্য করে।

ঠিক যে ভাবে জি ডি বিড়লা, এম পি বিড়লা স্কুলের মা বাবারা— যাঁদের অনেকেই হয়তো এই সে দিনও মিটিং-মিছিল-অবরোধ দেখলে আর পাঁচ জনের মতোই বিরক্তি প্রকাশ করতেন— ছোট মেয়েটির নিগ্রহের সামনে দাঁড়িয়ে পথে নামতে বাধ্য হয়েছেন।

কেউ কোনও অসুবিধা স্বীকার করব না, কোনও দাম দেব না, আরাম আয়েশের নিশ্চিন্ত-নিরুপদ্রব ঘেরাটোপে শান্তিতে থাকব, আর চোখ মেললেই চার পাশের সুস্থ-সুন্দর-কাঙ্ক্ষিত চেহারাটা দেখতে পাব— এমন ইউটোপিয়া থেকে বেরিয়ে আসাই শ্রেয়।

সঙ্ঘমিত্রা চট্টোপাধ্যায়  কলকাতা-৭৭

 

মিশনারি

 ‘খ্রিস্টানরা নিশানায় কেন, ক্ষুব্ধ যাজকরা’ (২১-১২) সংবাদটিতে ‘হিন্দুদের জোর করে খ্রিস্টান বানানোর’ যে অভিযোগটি উঠে এসেছে, তা ভারতে চিরকালই কম। এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক ধর্মনীতি। ইতিহাসে দেখা যায়, পরাজিত কোনও দেশে প্রথমে আসে জয়ীরা, তার পিছনেই আসে জয়ীদের ধর্মের প্রচারকারীরা। প্রায়ই তাদের এক হাতে থাকে ধর্মগ্রন্থ অন্য হাতে তরবারি। ফলে পরাজিত প্রায় সম্পূর্ণ দেশটিই ধর্মান্তরিত হয় জয়ীর ধর্মে। স্পেনীয় এবং পর্তুগিজরা এই ভাবে তাদের জয় করা দেশগুলিকে পুরোপুরি খ্রিস্ট ধর্মে অন্তরিত করে। আক্রমণকারী তুরকিরাও এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিল না। উপরন্তু সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপ্রধানরাই হতেন ধর্মেরও প্রধান। ব্রিটিশরা ছিল ব্যতিক্রমী।

তাদের উৎসাহ ছিল শুধুমাত্র বাণিজ্যে এবং উপনিবেশে। তারা সব সময়ই মিশনারিদের ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়িতে বাধা দিত। এমনকী ভারতে মিশনারিদের আনুষ্ঠানিক প্রবেশাধিকারও ১৮১৩-র চার্টার অ্যাক্ট-এর আগে মঞ্জুর করা হয়নি।

তার আগে মিশনারিরা যে ভারতে আসেননি তা নয়, তবে তাঁরা বেশির ভাগই ধর্মপ্রচারের চেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকতেন তাঁদের বিদ্যালয়, বই, সংবাদ প্রকাশনা নিয়ে। তাঁদের ছাপাখানাগুলিতে তাঁরা দেশীয় ভাষায় বাইবেল ছাপতেন এবং সেটাই ছিল তাঁদের ধর্মপ্রচার বিষয়ক একমাত্র প্রচেষ্টা।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, স্বাধীনতা এবং দেশ ভাগের পূর্বমুহূর্তের অবিভক্ত ভারতে, খ্রিস্টান জনসংখ্যা ছিল কমবেশি শতকরা দুই ভাগ, মুসলমানরা ছিল তিরিশ ভাগ এবং বাকিটা অন্যান্যরা। যা মিশনারিদের খুব বেশি জোর না করার তত্ত্বকেই সমর্থন করে।

প্রধানমন্ত্রী মোদীর প্রেরণা স্বামী বিবেকানন্দ মিশনারিদের বহু কার্যকলাপ অপছন্দ করলেও, তিনি ছিলেন অপার জিশুপ্রেমী। রামকৃষ্ণ মিশন বড়দিন উৎসবে আজও বিতরণ করে থাকে কেকপ্রসাদ। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মোদী সরকারের অধিকাংশ বন্ধু-দেশ রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে খ্রিস্টধর্মানুসারী। তাদের আস্থা অর্জনের জন্যও ভারতীয় খ্রিস্টানদের আস্থাভাজন হওয়া দরকার। তাই এই অতি অল্পসংখ্যক ক্ষুব্ধ মানুষদের আস্থা ফিরিয়ে আনা ভারত সরকারের আশু কর্তব্য।

সনাতন পাঠক  কলকাতা-১

 

বাতিল রূপকথা

 ‘সান্তার রূপকথা’ (২৪-১২) চিঠিটিকে সমর্থন করি। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আর বহুজাতিক সংস্থাগুলির সুকৌশলী মগজধোলাইয়ে আমরা ভুলতে বসেছি সেই ছোটবেলায় বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে শোনা ‘ঠাকুরমার ঝুলি’, ‘ঠাকুরদার ঝুলি’র মিষ্টি গল্পগুলো। আধুনিক সমাজব্যবস্থা আমাদের শিখিয়েছে, অতীত নয়, শুধু বর্তমান নিয়ে ভাবো। রূপকথার গল্প বলার মানুষগুলোই তাই সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঠাঁই পাচ্ছেন বৃদ্ধাশ্রমে।

এই প্রজন্মের বাবা-মায়েরা কি জানেন, ‘ঘেঁটু পুজো’ কবে হয়? কিন্তু তাঁরা ঠিক জানেন, ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’, ‘ফ্রেন্ডশিপ ডে’ (আরও কত রকম ‘ডে’) কবে হয়।

তবে পত্রলেখক যে গাঁজাখুরির কথা বলেছেন, তা মানা যায় না। নারায়ণ দেবনাথের বাঁটুল দি গ্রেট-এর কীর্তিকলাপও তো গাঁজাখুরি। আজ পর্যন্ত শুনিনি, কোনও বাচ্চা সেগুলোকে সত্যি বলে ভেবেছে। টেনিদা-ঘনাদার কথাও কোনও পাঠক বিশ্বাস করে না। ওদের গুলবাজ বলেই সবাই জানে।

রমেন্দ্রনাথ নস্কর  জগদীশপুর হাট, হাওড়া

 

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১।

ই-মেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়