প্রকাশ্য লুকোচুরি বা বুড়ি ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা বা পহলে আপ-পহলে আপ। যে কোনও নামেই ডাকা যেতে পারে এই নাট্যরঙ্গকে। কিন্তু যে নামেই ডাকা হোক না কেন, তাত্পর্যটা একই— শুধুই বেড়ে চলেছে ধোঁয়াশা।

যত কাছে আসবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, ততই স্পষ্ট হবে ছবিটা, ফিকে হতে থাকবে জল্পনার কুয়াশা। প্রত্যাশিত ছিল এমনই। কিন্তু, ঠিক উল্টোটাই ঘটছে। দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদাধিকারী নির্বাচনের তারিখ যত কাছে আসছে, ততই বাড়ছে বিভ্রান্তি। কে হবেন রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী— নামের ফুলঝুরি। রোজ ভেসে উঠছে নতুন নতুন নাম। শাসকের তরফ থেকে কখনও শোনা যাচ্ছে সুমিত্রা মহাজনের নাম, কখনও সুষমা স্বরাজের। কখনও আবার ভেসে উঠছেন লালকৃষ্ণ আডবাণী। উঠে আসছে সক্রিয় রাজনীতিতে না-থাকা বেশ কয়েক জনের নামও। বিরোধী শিবিরেও কোনও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেই। গোপালকৃ়ষ্ণ গাঁধীর নাম মৃদু স্বরে ভেসে উঠল কোনও এক কোণা থেকে এক বার। শরদ পওয়ার এবং শরদ যাদবের নাম নিয়েও কেমন যেন নিয়ম রক্ষা বা জোটধর্মীয় সৌজন্যের ঢঙে সামান্য কথাবার্তা শোনা গেল। তার পর আবার সব চুপচাপ। কোনও সিদ্ধান্ত নেই। সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাড়াও যেন নেই কারও ঘরে। রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীর নাম ঘোষণা নিয়ে এত অনীহা বা টালবাহানা স্মরণাতীত কালে দেখা যায়নি সম্ভবত।

শাসকদল তথা সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে রাজনাথ সিংহ আর বেঙ্কাইয়া নায়ডু দেখা করলেন বিরোধী দল কংগ্রেসের সভানেত্রী সনিয়া গাঁধীর সঙ্গে। আলোচ্য ছিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য প্রার্থী বাছাই। আপাত দৃষ্টিতে সনিয়ার সঙ্গে রাজনাথ-বেঙ্কাইয়ার এই বৈঠক সুস্থ গণতন্ত্রের এক অসামান্য নিদর্শন। কিন্তু, বৈঠক কোনও ফল প্রসব করল না। ফল প্রসব করা সম্ভবও ছিল না। সনিয়া গাঁধীর সঙ্গে রাজনাথ সিংহ, বেঙ্কাইয়া নায়ডুরা আলোচনায় বসলেন বটে। কিন্তু বৈঠকের পর মনে হল, বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করাটা শাসকের মূল লক্ষ্য ছিল না। সর্বসম্মত রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী খুঁজে বার করতে বিজেপি কতটা আন্তরিক, গ্যালারিতে বসে এই নাট্যরঙ্গের সাক্ষী হওয়া কোটি কোটি নাগরিককে তা দেখানোটাই আসল উদ্দেশ্য ছিল। না হলে, কোনও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব বা কোনও নাম সঙ্গে না নিয়েই কংগ্রেস সভানেত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন কেন শাসকের দুই প্রতিনিধি? কোনও প্রস্তাবই যখন নেই, তখন আলোচনাটা হবে কী নিয়ে?

এ কথা ঠিক যে বিরোধী পক্ষও রাষ্ট্রপতি পদপ্র্রাথী হিসাবে কারও নাম চূড়ান্ত করতে পারেনি এখনও পর্যন্ত। কিন্তু বিরোধী পক্ষ নিজেদের মধ্যে একাধিক বৈঠক করেছে। সে বৈঠকে পরিস্থিতি নিয়ে বিশদে আলোচনা হয়েছে। সর্বসম্মত প্রার্থী খুঁজে বার করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। শাসক জোটপ্রার্থী ঘোষণা করার পরই বিরোধীরা মতামত জানাবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। শাসকের বেছে নেওয়া প্রার্থীকে পছন্দ হলে বিরোধী পক্ষ তাঁকেই সমর্থন করতে পারে বলেও বেশ স্পষ্ট করেই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। শাসক দল কি আদৌ তেমন কোনও সিদ্ধান্ত এখনও পর্যন্ত গ্রহণ করতে পেরেছে? দলে সিদ্ধান্ত হয়নি। শাসক জোট এনডিএ-তে সিদ্ধান্ত হয়নি। কংগ্রেসের সঙ্গে বৈঠকে বসার আগে যে নিদেন পক্ষে আরএসএস-এর সঙ্গে আলোচনাটুকু সেরে নেবে বিজেপি, তা-ও হয়নি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী কে হচ্ছেন, সে বিষয়ে কিছুই স্থির না করে হঠাত্ সনিয়া গাঁধীর সঙ্গে দেখা করতে চলে যাওয়ার তাত্পর্য তাই দুর্বোধ্য ঠেকেছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সর্বসম্মত প্রার্থী চাই— শাসক-বিরোধী দু’পক্ষই সহমত। কিন্তু, শাসকও কোনও নাম প্রস্তাব করছে না। বিরোধীরও কোনও উচ্চবাচ্য নেই। তা-ও আচমকা সনিয়া সকাশে রাজনাথ-বেঙ্কাইয়া। আলোচনার এমন প্রয়াসকে বায়বীয় ছাড়া আর কী-ই বা বলা যেতে পারে? আর এমন প্রয়াস নিষ্ফলা ছাড়া আর কী-ই বা হতে পারে?