স্মরণকালের মধ্যে যা ঘটেনি, এ বছর তা-ই ঘটল পশ্চিমবঙ্গে। ধান উঠল, কিন্তু অভাবী বিক্রি হল না। প্রতি অঘ্রানে প্রায় বিনা লাভে ধান বেচতে বাধ্য হন ছোট চাষি। এ বছর ঘরে আনলেন কুইন্টালে আড়াইশো-তিনশো টাকা লাভ। বাজারে ধানের দাম সরকারি সহায়ক মূল্যের কাছাকাছি, এমনকী তাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এমন লক্ষ্মীমন্ত অঘ্রান-পৌষ আর আসেনি বাংলার চাষির ঘরে।

এ কৃতিত্ব কার? শেখ হাসিনার, না কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের?

ব্যবসায়ীরা এগিয়ে রাখছেন হাসিনাকেই। এ বার প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন কম। হাসিনা সরকার চালে শুল্ক কার্যত তুলে দিয়ে, বেনাপোল সীমান্ত চব্বিশ ঘণ্টা চালু রেখে,  আমদানিকে উৎসাহ দিচ্ছে। কত চাল যাচ্ছে, হিসেব মেলা ভার। রাজ্য ধান্যব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক পশুপতি প্রামাণিকের আন্দাজ, রোজ অন্তত দশ হাজার টন। মন্তেশ্বরের ব্যবসায়ী রমেশ দে বলেন, বর্ধমানের চালের গদি থেকে ষাট শতাংশ ধান যাচ্ছে ও-পারে। এর ফলে পুজোর পর বাজার চড়ে গিয়েছিল সতেরোশো টাকা কুইন্টাল। নতুন ধান উঠতে সরকারি দর বরাবর চলছে বাজার। চাষি লাল স্বর্ণ ধান বেচছেন প্রতি কুইন্টাল এই দরে: মন্তেশ্বরে ১৫৩০ টাকা, হুগলির বলাগড়ে ১৪৫০, বীরভূমের দুবরাজপুরে ১৪৪০, মুর্শিদাবাদের নবগ্রামে ১৩৭০। গত বছর এই সময়ে দর ছিল ১০৮০-১১৬০ টাকা। 

সরকারি কর্তাদের দাবি, কৃতিত্ব মুখ্যমন্ত্রীর। এ বার মাঠে ধান থাকতেই কিনতে নেমেছে সরকার। অঘ্রান না-পেরোতে চার লক্ষ টন ধান কেনা হয়ে গিয়েছে। জানুয়ারি পড়ার আগে ছয় লক্ষ টন ছাড়াবে। অন্যান্য বছর মকর সংক্রান্তির আগে সরকারি শিবির চালুই হত না। ধান ওঠার পর দুই-আড়াই মাস অভাবী বিক্রির ফায়দা তুলতেন আড়তদার, চালকল মালিকরা। এক চালকল মালিক স্পষ্টই বললেন, ‘গোড়ার দিকে কম দরে ধান কিনলে একটু প্রফিট থাকে।’ এ বার সরকারি ক্রয় কেন্দ্র আগে চালু হওয়ায় ‘প্রফিট’ যাচ্ছে চাষির ঘরে।

তফাত আরও আছে। সরকারি চেক জমা দিয়ে ধানের দাম পেতে এত দিন হয়রান হত চাষি। টাকা মিলবে কি না, কবে মিলবে, সেই ভয়ে ছোট চাষি ধান বেচত আড়তদারকে। এ বার সে ক্ষোভ তেমন শোনা যায়নি। বরং হাতে-হাতে টাকা পাওয়ার জন্য ব্যবসায়ীকে ধান বিক্রি করে এখন আপশোস করছেন চন্দ্রকোনার চাষি শ্রীমন্ত বিশ্বাস। বললেন, ‘শুনছি সরকারি কেন্দ্রে বিক্রি করলে এক সপ্তাহেই অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকছে। দামও বেশি। তেরোশো টাকায় বিক্রি করে ভুল করলাম।’ খাদ্য দফতরের দাবি, সাড়ে তিন লক্ষ অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে
গিয়েছে ধান বিক্রির টাকা, টাকা না মেলার অভিযোগ দেড়শোটি।

এটা অকস্মাৎ হয়নি। দীর্ঘ দিন চাষিকে টাকা দেওয়ার দায়িত্ব ছিল বেনফেড, কনফেড প্রভৃতি সমবায়ের। ধান ভাঙিয়ে সরকারের ঘরে চাল ঢুকলে সমবায়েরা টাকা ফেরত পেত। তাতে দীর্ঘ বিলম্ব হত। গত বছর থেকে আগাম ৪১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে মমতা সরকার। যাতে খরিদের সঙ্গে সঙ্গে দাম মেটানো যায়। তার ফল এ বছর পাচ্ছেন চাষিরা, দাবি সরকারি কর্তাদের।

ধানের বাজার বরাবর যাদের দখলে, সেই ব্যবসায়ীদের অনেকে অবশ্য সরকারি খরিদকে তেমন পাত্তা দিচ্ছেন না। সরকারি শিবিরে কত ধানই বা গিয়েছে যে সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে? বাংলাদেশে রফতানি থামলেই নামবে বাজার। আবার নদিয়ার রাইস মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক মহাদেব সাহা জানালেন, তাঁর জেলা থেকে বাংলাদেশে চাল যাচ্ছে না, কিন্তু সরকার আগাম ধান কিনতে নেমেছে, আর উত্তরবঙ্গে বন্যা, এই দুইয়ের ফলে ধানের দাম চড়েছে।

সরকারি কর্তারা বলছেন, রাজ্যে দেড় কোটি কুইন্টাল লাল স্বর্ণ ধান উৎপন্ন হয়, সরকার কেনে চল্লিশ লক্ষ টন— এক-চতুর্থাংশ, বাজারের দামে প্রভাব ফেলার পক্ষে এই খরিদ যথেষ্ট। ‘প্রতি বছর সরকার কেনা শুরুর পরেই দাম চড়ে। এত বছর দেরিতে ধান কেনা শুরু করত সরকার, তাই দাম চেপে রাখত ব্যবসায়ীরা। এ বার থেকে সরকার ধান উঠলেই কিনবে। রফতানি না হলেও বাজারদর ন্যূনতম দরের নীচে নামবে না,’ দাবি কৃষির এক শীর্ষ কর্তার। খাদ্য দফতরের এক কর্তার দাবি, যে কোনও বাজার চলে আস্থার উপর। চাষি আসুক আর না আসুক, সরকারি ক্রয় কেন্দ্র খোলা আছে, সঙ্গে সঙ্গে দাম মেটাচ্ছে। ফলে আড়তদারদের তৈরি কৃত্রিম ‘প্যানিক সেল’ বন্ধ করা গিয়েছে।

অর্থনীতির দৃষ্টিতে এই দাবি ভুল নয়, বলছেন আইআইএম কলকাতার অর্থনীতির শিক্ষক রাঘবেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। সরকার পঁচিশ শতাংশ উৎপাদন কিনলে বাজারে তার প্রভাব পড়ারই কথা। তবে তাঁর প্রশ্ন, ‘এটা পঞ্চায়েত নির্বাচনের বছর। চাষির অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে দেওয়ার রিটার্ন অনেক। এর পরেও ধান কিনতে আগাম টাকা বরাদ্দ হবে তো?’

চাষি ন্যায্য দাম পাবেন কি না, সে প্রশ্ন যতটা অর্থনৈতিক, ততটাই রাজনৈতিক। ধান বিক্রির যে দাম বাংলার চাষি বরাবর পেয়েছে, তাতে তার শ্রমের মূল্য ওঠে না। সেই মূল্য গিয়েছে যাদের ঘরে, তারা আড়তদার, চালকল মালিক। চালকল মালিক, হিমঘর মালিক আর রেশন ডিলার, এরা গ্রামীণ রাজনীতির ক্ষমতাকেন্দ্র। এদের আনুকূল্যে বরাবর নির্বাচন লড়েছে বামফ্রন্ট। এদের চাঁদা ছাড়া কোনও বড় দলের রাজনৈতিক সমাবেশ কোনও দিন হয়নি।

‘খাদ্যসাথী’ প্রকল্প ঘোষণার পরে ইঙ্গিত মিলেছিল, সেই ছবিটা বদলে যাচ্ছে। আট কোটি মানুষকে দু’টাকা কিলো দরে চাল বেচে রেশন ডিলারের যে উপরি কিছু আর থাকবে না, তা অচিরে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। মাঝের স্তরকে পুষ্ট না করে সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছনোর ফল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পেয়েছেন বিধানসভা নির্বাচনের বিপুল জয়ে। তার পরে পরেই ধান কেনার জন্য আগাম টাকা বরাদ্দ করেন মমতা।

এর আগে মাঝের স্তরকে এড়িয়ে চাষির কাছে সরকারি মূল্য পৌঁছনোর চেষ্টা করেছেন মমতা, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন। বিপুল ব্যয়ে তৈরি ব্লক কিষান মান্ডি শূন্য প়ড়ে রয়েছে, চাষির নামে চেক বিলি করে ব্যবসায়ীদের দুর্নীতিচক্র আটকানো যায়নি। এ বছরেরই গোড়ায় চাষির পরিচয় খতিয়ে দেখে সরাসরি অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে চাইলে ব্যবসায়ীরা একযোগে সরকারি শিবিরে ধান বেচা বন্ধ করে দেয়। পিছু হটে সরকার, বদলি করা হয় খাদ্য সচিবকে। এ বার যদি ধানের দামে সরকারি খরিদের প্রভাব সত্যিই পড়ে থাকে, তবে সেই লাভটুকু এসেছে অনেক সময় আর অপচয়ের মূল্যে।

তবু, ধানের বাজারের রাশ যে এক দিন সরকারের হাতে আসবে, চাষি যে তার ফলে (সরকারকে বিক্রি করতে না পারলেও) ন্যায্য মূল্য বা তার কাছাকাছি পাবেন, অভাবী বিক্রি রোখা যাবে, কে ভেবেছিল? বিজেপির উত্থান, তৃণমূলের ঘর অটুট রাখা বা সরকারি টাকা ছড়িয়ে ভোট আদায়, তাগিদ যা-ই হোক, ভোট জেতার স্ট্র্যাটেজি মধ্যস্বত্বভোগীকে সরিয়ে দরিদ্র মানুষের দরজায় দাঁড় করিয়েছে মমতা সরকারকে। তাঁর ‘বেনিফিশিয়ারি’ তৈরি করে ভোট পাওয়ার নীতি ক্লাবে অনুদানের মতো অকারণ অর্থক্ষয় করছে, কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগীকে হটিয়ে দিয়ে গ্রামবাংলার ক্ষমতা-বিন্যাসেও আঘাত করছে। বিধানসভা ভোটের আগে রেশন ডিলারের প্রভাব খর্ব হয়েছে, পঞ্চায়েত ভোটের আগে চালকল মালিকের ডানা ছাঁটল সরকার। হিমঘর মালিকও নিয়ন্ত্রণে, ইঙ্গিত মিলছে। নতুন আলু উঠতে দেরি আছে, তবু এ বার শীতে বাজারে দাম বাড়েনি আলুর।

সে আর এক গল্প।