অভিযুক্ত দুই শিক্ষক অপরাধী কি না, তাহা তদন্তসাপেক্ষ। কিন্তু জি ডি বিড়লা সেন্টার ফর এডুকেশন-এর প্রিন্সিপাল তাঁহার পদের উপযুক্ত কি না, তাহা জানিবার জন্য বোধ করি তদন্ত নিষ্প্রয়োজন। তাঁহার স্কুলপ্রাঙ্গণে কোনও ছাত্রী যৌন নির্যাতনের শিকার হইয়াছে কি না, তাহাতে স্কুলের কোনও শিক্ষক বা শিক্ষাকর্মী যুক্ত কি না, এই প্রশ্নগুলিতে ঢুকিবারই প্রয়োজন ছিল না। স্কুলের একটি ছাত্রী আহত হইয়াছে, সেই সংবাদ পাইয়া তাঁহার প্রথম কর্তব্য ছিল মেয়েটির শুশ্রূষার ব্যবস্থা করা। পরিবর্তে তিনি নানান যুক্তি সাজাইয়াছেন, মেডিক্যাল রিপোর্ট দেখিতে চাহিয়াছেন। কেন, তাহার আপাত কারণটি অনুমান করা চলে, তিনি স্কুলের ‘সুনাম’ অক্ষুণ্ণ রাখিতে চেষ্টা করিতেছিলেন। অভিযোগ, তিন বৎসর পূর্বেও এই স্কুলে এমন ভাবেই ‘সুনাম’ বজায় রাখা হইয়াছিল— তখনও একটি যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠিয়াছিল, এবং স্কুল নিষ্ক্রিয় ছিল। কিন্তু, ইহা নিতান্তই আপাত কারণ। প্রকৃত কারণটি সম্ভবত গভীরতর।
এ কালে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষক বা স্কুল-পরিচালকরা অনেক সময়েই ‘সংখ্যা’ হিসাবে চেনেন, এবং তাহাকেই স্বাভাবিক জ্ঞান করেন। নার্সারি ক্লাসের অমুক রোল নম্বরের পিছনে থাকা চার বৎসরের মানুষটিকে ‘মানুষ’ হিসাবে চিনিবার কোনও দায় তাঁহার নাই। একটি শিশুর রেচনাঙ্গ হইতে— চার বৎসরের শিশুর শরীরের কোনও অঙ্গকে আদৌ ‘যৌন অঙ্গ’ বলা যায় কি না, এই মুহূর্তে সেই কথাটিও ভাবা জরুরি— রক্তক্ষরণ হইলে যে স্কুলের সম্মান অপেক্ষা তাহার শুশ্রূষা অনেক বেশি জরুরি, এই কথাটি সেই সব শিক্ষাব্রতীর মনে আসে না। কারণ, স্কুল নামক সামগ্রিক অস্তিত্বটির তুলনায় একটি রোল নম্বর নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর। যাঁহাদের মন এই গতিপথে চলে, শিক্ষক হইবার অধিকার তাঁহাদের নাই। শিক্ষক হইবার পূর্বে তাঁহাদের মানুষ হওয়া প্রয়োজন।

প্রিন্সিপাল স্কুলের সুনাম বাঁচাইতে চেষ্টা করিয়াছেন। পুলিশও নিয়ম রক্ষা করিয়াছে। আহত মেয়েটিকে লইয়া তাহার অভিভাবকরা এক থানা হইতে অন্য থানা, এক হাসপাতাল হইতে অন্য হাসপাতাল ছুটিয়াছেন। সত্য, আর বহু ক্ষেত্রে পুলিশ যতখানি উদাসীন থাকে, বর্তমান ক্ষেত্রে তাহার ব্যতিক্রম হইয়াছিল। কিন্তু, একটি আহত, ভীত শিশুর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করিবার প্রক্রিয়াটি আরও খানিক মানবিক হইতে পারে কি না, সেই প্রশ্নটিও উঠিবে। শুধু পুলিশ লইয়া নহে, প্রশ্ন গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থা লইয়াই। একান্ত অসহায় অবস্থায় মানুষ যখন প্রশাসনিক ব্যবস্থার দ্বারস্থ হয়, তখন তাহার হয়রানি না বাড়াইয়া অভীষ্ট প্রক্রিয়াটি কী ভাবে শুরু করা যায়, কর্তারা সে কথা ভাবিয়া দেখিতে পারেন। অবশ্য, তাহার পূর্বে সাহায্যপ্রার্থীদের সমমানুষ হিসাবে দেখিবার অভ্যাসটি তৈরি করিতে হইবে।

কোনও একটি বিশেষ স্কুলে ঘটনাটি ঘটিয়াছে বলিয়া সব আঙুল সেই দিকেই তোলা ভুল হইবে। আশঙ্কা হয়, ঘটনাটি অন্য অনেক স্কুলেই ঘটিতে পারিত। তাহার মূল কারণ, অনেক স্কুলই এক মানসিকতায় পরিচালিত— স্কুলের সমগ্রতার বিপরীতে একক ছাত্রছাত্রীর গুরুত্ব শুধু রোল নম্বরের। ইহা ক্ষমতার আখ্যানও বটে। অভিভাবকদের সহিত স্কুলের সম্পর্ক সর্বদাই ক্ষমতার উচ্চাবচতাকে কেন্দ্র করিয়া ঘোরে। অভিভাবকদের অত্যন্ত জরুরি উদ্বেগকেও স্কুল কর্তৃপক্ষ বিন্দুমাত্র পাত্তা দিবেন না, ইহাই দস্তুর। সেই কারণেই আজ অবধি আলোচ্য স্কুলটিতে সিসিটিভি ক্যামেরা বসে নাই। স্কুল কর্তৃপক্ষ যাহা করিতেছে, তাহাই মানিয়া লইতে হইবে, নচেৎ দরজা খোলা আছে— এই মানসিকতার ফাঁক গলিয়াই বর্তমান ঘটনাটি ঘটিয়া গেল। শিক্ষা না লইলে, আশঙ্কা হয়, ইহাই শেষ দুর্ঘটনা নহে।