চিকিৎসা জগতে এক ফরমান সম্প্রতি খবরের আলোয়। রুশ বিজ্ঞান আকাদেমি ঘোষণা করেছে, হোমিয়োপ্যাথি অকেজো ও অবৈজ্ঞানিক। রাশিয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থা থেকে হোমিয়োপ্যাথিকে নির্বাসনে পাঠানো উচিত। আকাদেমি গড়েছিল এক কমিশন, ভুয়ো বিজ্ঞান পরীক্ষা করে দেখতে। তদন্ত শেষে কমিশনের সুপারিশ: দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রক এবং ওষুধ-নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো অবিলম্বে জারি করুক নির্দেশ। হোমিয়োপ্যাথিক ওষুধের গায়ে লেবেল সাঁটা হোক। যাতে লেখা থাকবে, ওষুধের ফলদায়ী ক্ষমতা প্রমাণিত সত্য নয়। তবে রোগীর আস্থা থাকলে তিনি তাঁর ওষুধ কিনে খেতে পারেন। সেটা তাঁর ব্যক্তিস্বাধীনতা। কিন্তু ওই শাস্ত্র যদি দাবি করে যে, সে অভ্রান্ত, তা মানা হবে না।

রুশ বিজ্ঞান আকাদেমির ওই সুপারিশ যেন প্রতিধ্বনি। মাস কয়েক আগে আমেরিকায় ফেডারেল ট্রেড কমিশন (এফটিসি) প্রকাশ করেছিল এক বিবৃতি। শিরোনাম ‘এনফোর্সমেন্ট পলিসি স্টেটমেন্ট অন মার্কেটিং ক্লেমস ফর ওভার-দ্য-কাউন্টার হোমিয়োপ্যাথিক ড্রাগস’। বক্তব্য? হোমিয়োপ্যাথিক ওষুধের কার্যকরিতা সম্পর্কে প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর দাবি নির্দ্বিধায় মানা হবে না। অন্য ওষুধের ক্ষেত্রে যে সব মানদণ্ড আছে, সেগুলিতেই বিচার হবে হোমিয়োপ্যাথিক ওষুধের দাবি। ওষুধ কোম্পানির তরফে যে কোনও দাবির সমর্থনে বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ দাখিল করতে হবে। নচেৎ সে দাবি ওষুধের গায়ে লেখা চলবে না।

তাদের সুপারিশ ঘোষণার কারণ হিসেবে রুশ বিজ্ঞান আকাদেমি বলেছে, শাস্ত্র হিসেবে হোমিয়োপ্যাথি রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান কিংবা জীববিদ্যার স্বীকৃত নীতিগুলো মানে না। অভিযোগ মিথ্যে নয়। দুশো বছরেরও বেশি পুরনো ওই চিকিৎসাশাস্ত্রের মূলনীতি: বিষে বিষক্ষয়। যে দ্রব্যের বেশি পরিমাণ প্রয়োগে নীরোগ মানুষের দেহে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়, সে দ্রব্য স্বল্প পরিমাণে প্রয়োগ করলে রোগী সুস্থ হয়। গোল বাধে ওই ‘স্বল্প পরিমাণ’-এর সংজ্ঞা নিয়ে। কতটা কম? পরিমাণ কমাতে যে বিশেষ পথে এগোতে হয়, তা এ রকম: দ্রব্যকে প্রথমে তরলে গুলে ফেলা হয়। পাওয়া গেল যে দ্রবণ, তাতে আবার তরল মেশানো। এ ভাবে ক্রমাগত তরল মিশিয়ে দ্রবণকে পাতলা, আরও পাতলা করে ফেলা। শেষে সেই ভীষণ পাতলা দ্রবণ হবে হোমিয়োপ্যাথিক ওষুধ। অথচ দ্রবণকে ভীষণ পাতলা করতে করতে বিজ্ঞানের নিয়মে তার এমন দশা হতেই পারে যে, তাতে দ্রব্য আর লেশমাত্র নেই, শুধুই তরল। অন্তত হোমিয়োপ্যাথিক ওষুধ যে ভাবে তৈরি হয়, সেখানে এটাই দস্তুর। প্রশ্ন সেখানেই। দ্রব্য না থাকলেও সেটা ওষুধ? তাতে রোগ সারবে কেন? রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান বা জীববিদ্যা ওই যুক্তিতে হোমিওপ্যাথিকে অসার এবং আজগুবি মনে করে।

ওই যুক্তিকে ভুল প্রমাণ করতে ফরাসি গবেষক জাক বুভুনিস্ত ১৯৮৮ সালে দাবি করেন, ও রকম লঘু দ্রবণ (যাতে দ্রব্য থাকার কথা নয়) কাজ করছে মানুষের রক্তে শ্বেতরক্তকণিকার ওপর। এই দাবি-সংবলিত পেপার ‘নেচার’ জার্নালে ছাপা হতে চার দিকে হইহই রব। ‘নেচার’ সম্ভ্রান্ত জার্নাল। সেখানে এমন পেপার ছাপা হল! ‘নেচার’-এর তৎকালীন সম্পাদক জন ম্যাডক্স গড়লেন কমিটি। যা ফ্রান্সে বুভুনিস্ত-এর ল্যাবরেটরিতে গিয়ে দেখবে ওঁদের পরীক্ষা। কমিটির সদস্যরা গেলেন। দেখলেন পরীক্ষা। তাঁদের রায়: বুভুনিস্ত-এর দাবি মিথ্যে।

১৯৮৮-র পর ২০১০। আবার হোমিয়োপ্যাথি নিয়ে শোরগোল। এ বার সব কিছুর কেন্দ্রে লুক মতাঁনিয়ে। এডস ভাইরাস আবিষ্কারের কৃতিত্বে যিনি নোবেল প্রাইজ পান ২০০৮ সালে। স্বদেশি বিজ্ঞানী বুভুনিস্তকে গালিলেয়ো গ্যালিলেইয়ের সঙ্গে তুলনা করে ‘সায়েন্স’ জার্নালে ইন্টারভিউ দেন মতাঁনিয়ে। তাঁর দাবি গালিলেয়োকে যেমন বোঝেনি সে কালের চার্চ, বুভুনিস্তও তেমনই অবিচারের শিকার। তাঁর দাবিও নাকি নির্ভুল ছিল। কী ভাবে? মতাঁনিয়ে দেখেছেন দ্রব্যের লেশ না থাকলেও দ্রবণ ওষুধের কাজ করে। প্রক্রিয়া? ওঁর ব্যাখ্যা: দ্রব্য নেই তো কী, তার ‘স্মৃতি’ বয়ে বেড়ায় তরল। দ্রব্যের অণু থাকার সময় দ্রবণে তরলের অণু তার চার পাশে যে ভাবে দাঁড়াত, দ্রব্য উধাও হলেও নাকি দাঁড়িয়ে থাকে সে ভাবেই। আর, ওতেই নাকি কাজ হয়।

এক নোবেলবিজেতার দাবি সাড়া ফেললেও ও ব্যাপারে গবেষণার জন্য অর্থ না পেয়ে ক্ষুব্ধ মতাঁনিয়ে প্যারিসে পাস্তুর ইনস্টিটিউট ছেড়ে চলে গেছেন চিন দেশের সাংহাই শহরে, জিয়াওতং বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওখানে গবেষণায় কী কী রোমহর্ষক ফল পাচ্ছেন মতাঁনিয়ে, সে সব জানা যাচ্ছে না। কারণ, সে সব ফল বিজ্ঞানের মূল ধারার জার্নালগুলো ছাপা হচ্ছে না। হোমিয়োপ্যাথি গবেষণার কোনও পেপারই ও সব জার্নাল ছাপে না। হ্যাঁ, মূল ধারা। যা মনে করে, পদার্থ না থাকলে তার ক্রিয়াও থাকে না।

অথচ, অনেকের অভিজ্ঞতা, হোমিয়োপ্যাথিতে কখনও-সখনও রোগ সারে। তা সারে। ঠিক যেমন জ্যোতিষচর্চায় কখনও-সখনও দারুণ অনুমান করা যায় ভবিষ্যৎ ঘটনাবলি। তাই হস্তরেখাবিদরা বলেন, তাঁরা নাকি ‘বিজ্ঞানসম্মত’ ভাবে ভবিষ্যৎ গণনা করেন। মানুষের জীবনে গ্রহনক্ষত্রের অদ্ভুতুড়ে ‘প্রভাব’ যদি বিজ্ঞান হয়, তা হলে বিজ্ঞান বলে যেটা বাজারে চালু আছে, সেটা, আর যা-ই হোক, বিজ্ঞান নয়। অন্য কিছু।

হোমিয়োপ্যাথি সম্পর্কে একই কথা বলা যায়।