যা ঘটল মহারাষ্ট্রে, তা আর যা-ই হোক, ভারতীয় গণতন্ত্রের বা ভারতীয় সমাজের সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ নয়। কোরেগাঁওয়ের যুদ্ধে এক ভারতীয় শাসকের বাহিনী পরাজিত হয়েছিল ব্রিটিশ সেনার হাতে। ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জন্য এ ঘটনা গৌরবের নয়, অগৌরবেরই বরং, এ কথা বোঝেন না, এমন ভারতীয়ের সংখ্যা কমই। ব্রিটিশের বাহিনীতে যে সেনানীরা লড়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই দলিত সম্প্রদায়ের ছিলেন বলে ভারতীয় বাহিনীর পরাজয় দলিতের গৌরবগাথায় রূপান্তরিত হয়, এমনটা ভাবার যে কোনও কারণ নেই, তা কারও বোধের অতীত নয়। তা সত্ত্বেও প্রতি বছর হাজার হাজার ভারতীয় কেন সমবেত হন কোরেগাঁওয়র যুদ্ধ স্মারকে এবং যুদ্ধের তারিখটাকে কেন উদযাপন করেন দলিত গৌরবের প্রতীক হিসেবে, তা তলিয়ে ভেবে দেখা দরকার।

তলিয়ে ভাবতে গেলে সামাজিক সমস্যাটার শিকড়ে পৌঁছতে হয়। কয়েক হাজার বছরের সামাজিক বিশৃঙ্খলা, কয়েক হাজার বছর ধরে দলিত নির্যাতন, কয়েক হাজার বছর ধরে এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে ‘নিম্নবর্ণীয়’ আখ্যা দিয়ে দূরে সরিয়ে রাখা এবং ভারতীয়ত্বের যাবতীয় গৌরবের অংশীদারিত্ব থেকে বঞ্চিত রাখা— সমস্যার শিকড়টা এই বিভাজনের গভীরেই।

প্রায় গোটা মহারাষ্ট্র দলিত বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠল। কোরেগাঁও যুদ্ধের দ্বিশতবার্ষিকী মহাসমারোহে উদযাপন করতে অনড় দলিত সমাজ। আর সে উদযাপন যে কোনও উপায়ে রুখতে খডড়্গহস্ত মরাঠি অস্মিতার ধ্বজাধারীরা। সঙ্ঘাত অনিবার্যই ছিল। চূড়ান্ত সমাজিক বিশৃঙ্খলা প্রকট হল, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। একজনের মৃত্যু হল। মৃতের পরিবারের জন্য মহারাষ্ট্রের সরকার তড়িঘড়ি আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করল, বিচারবিভাগীয় তদন্তের আশ্বাস দিল। কিন্তু এতে কি সমস্যার নিরসন হল? একেবারেই হল না। যে সমস্যা বা যে সঙ্কট থেকে এত বড় দলিত বিক্ষোভের সাক্ষী হত হল মহারাষ্ট্রকে, সেই সঙ্কটের শিকড় আমাদের সামাজিক বৈষম্যের গভীরে নিহিত। সামাজিক ভেদরেখাটা এতই চওড়া যে তাকে অতিক্রম করে দলিত আর মরাঠা আজও পরস্পরের কাছাকাছি আসতে পারল না, মহার আর ব্রাহ্মণ আজও ভারতীয় হিসেবে এক পঙ্‌ক্তিতে দাঁড়াতে পারল না। দলিতের আজও মনে হয়, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশরা তাঁর প্রতিপক্ষ ছিলেন না, প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান বাধা তথাকথিত উচ্চবর্ণই বরং।

সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আপনার ইনবক্সে পেতে চান? সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

ব্রিটিশ জমানার আগের ভারত ছিল সামন্ততান্ত্রিক ভারত। ব্রিটিশ জমানায় ছিল উপনিবেশ ভারত। কিন্তু ব্রিটিশ জমানার অবসান তো গণতান্ত্রিক ভারতের জন্ম দিয়ে গিয়েছে। সত্তর বছর ধরে ভারত গণতন্ত্র অভ্যাসও করছে। তাতেও যে আমরা মুছে ফেলতে পারিনি সামাজিক ভেদরেখাগুলো, সে লজ্জাজনক এবং দুর্ভাগ্যজনক। মহারাষ্ট্র যে সঙ্ঘাত দেখল, সে সঙ্ঘাত তাই অনিবার্য এ দেশের নানা প্রান্তেই।

হিমলায় থেকে ভারত মহাসাগর— মধ্যবর্তী ভূখণ্ডে সকলেই ভারতীয়, ভারতের যাবতীয় গৌরবে সকলেরই সমান অংশীদারিত্ব। কিন্তু কয়েক হাজার বছর ধরে আমরা কখনও নিজেদের ভাঙছি আর্য-অনার্যে, কখনও ভাঙছি দৈব-আসুরিকে, কখনও ভৌগোলিক অবস্থান দেখে নির্ণয় করে নিচ্ছি কে মানব, কে বানর, কে দানব। এই ভাগাভাগিই কাল হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারত— সদর্প উচ্চারণে বলি আমরা। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে বেরিয়ে সমাজেও যে গণতন্ত্রটাকে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি, সে কথা এখনও পুরোপুরি উপলব্ধি করতে আমরা পারিনি।

আরও পড়ুন: মহারাষ্ট্র উত্তাল দলিত বিক্ষোভে, হিংসায় বিপর্যস্ত মুম্বই-পুণে-ঠাণে

আরও পড়ুন: কোরেগাঁও যুদ্ধ দলিতের কাছে গর্বের বিষয় হয়ে উঠল কী ভাবে

উপলব্ধি নেই বলেই আজও দেশের নানা প্রান্ত থেকে দলিত নির্যাতনের খবর আসে। উপলব্ধি নেই বলেই জাতীয় গৌরবের সংজ্ঞাটা তথাকথিত উচ্চবর্ণ আর তথাকথিত নিম্নবর্ণের জন্য ভিন্ন অনেকাংশেই এখনও। উপলব্ধি নেই বলেই আজও রাজনীতি চলে জাতপাতের সমীকরণে। উপলব্ধি নেই বলেই সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভটা প্রতিফলিত হয় এই রকম চরম বিশৃঙ্খলার রূপ নিয়ে।

মহারাষ্ট্রই প্রথম দেখাল আমাদের সমাজে বিশৃঙ্খলা এখনও কতখানি, তা কিন্তু নয়। আমাদের সামাজিক বিশৃঙ্খলার প্রতিফলন আমাদের জাতীয় জীবনে প্রায় রোজ ঘটছে। ক্ষোভের প্রতিফলন প্রায় রোজ প্রকট হচ্ছে নানা রূপে। কখনও রোহিত ভেমুলা সেই ক্ষোভের মূর্ত প্রতীক হয়ে ওঠেন, কখনও জিগ্নেশ মেবাণী মূর্তিমান প্রতিবাদ হিসেবে উঠে আসেন, কখনও মহারাষ্ট্রে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, কখনও উত্তরপ্রদেশে দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়, কখনও গুজরাত দলিত বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে।

অনেক সময় নিয়ে ফেলেছি আমরা। একবিংশ শতাব্দীতে পৌঁছেও সামাজিক ভেদরেখাগুলো মুছে ফেলতে পারিনি। কম লজ্জার নয় এ ছবি। কম বিপজ্জনক নয় বারুদের স্তূপটাও। সামান্য স্ফূলিঙ্গই ভেদরেখার দু’প্রান্তে থাকা লোকগুলোকে কেমন লড়িয়ে দিতে পারে, তা আরও একবার দেখলাম। এর পরেও যদি শুধরে নিতে না পারি নিজেদের, সঙ্কট গভীরতর হবে।