কনে সাজিবার সাধ কাহার না হয়? সিউড়ি-কন্যার যেমন হয়, কোরিয়া-বালারও তেমনই হইয়া থাকে। সংবাদে প্রকাশ, দক্ষিণ কোরিয়ার মেয়েরা দুধ-সাদা গাউন, দামি অলংকার, সুচারু কেশসজ্জায় অপরূপা হইয়া, হাতে ফুলের তোড়া হইয়া হাস্যমুখে ছবি তুলাইতেছেন। সেই ছবিতে সাবেকি বিবাহের সবই আছে, বাদ গিয়াছে বরটি। কোরিয়ায় মহিলারা উচ্চ শিক্ষিত, স্বয়ম্ভর। কেবল বধূ সাজিবার সাধ মিটাইতে তাঁহারা পুরুষের জন্য অপেক্ষা করিবেন কেন? একক-বিবাহ বা ‘সিঙ্গল ম্যারেজ’ বস্তুটি গত কয়েক বৎসর ধরিয়াই সে দেশে জনপ্রিয় হইতেছিল, এই বৎসর নানা পত্রপত্রিকায় বিষয়টি লইয়া আলোচনা বাড়িয়াছে। ইহা ঠিক নারীবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হইয়া বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটিকে বাতিল করিবার ইচ্ছা নহে। বরের জন্য অপেক্ষা না করিয়া নিজের কনে সাজিবার সাধ নিজেই মিটাইয়া লইবার উপায় একক-বিবাহ। দক্ষিণ কোরিয়ায় বিবাহের বয়স দ্রুত বাড়িতেছে। মাত্র দশ বৎসরে কনের বয়সের গড় চব্বিশ বৎসর হইতে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে তিরিশ বৎসরে। বরের অপেক্ষায় যৌবনের দিনগুলি চলিয়া যাইবে, বধূসজ্জা করা হইবে না? অ্যালবামে সাজানো হইবে না বধূবেশের ছবি? একবিংশের মেয়েরা সেই অপ্রাপ্তি মানিতে রাজি নহেন। কেহ একাই স্টুডিয়ো ভাড়া করিয়া ‘প্যাকেজ’ দরে ছবি তুলাইতেছেন। কেহ বন্ধুদেরও আমন্ত্রণ করিতেছেন, দাবি করিতেছেন বিবাহের উপহার। অতএব অকারণ অপেক্ষার প্রয়োজন নাই। বিবাহের সাজসজ্জা, আমোদ-আহ্লাদ সকলই হউক, মুলতুবি থাকুক চিরকালীন সম্পর্কে আবদ্ধ হইবার দায়।

ধারণাটি এই দেশে চালু হইবে কি? বিবাহের দিনটি লইয়া মেয়েরা আশৈশব স্বপ্ন দেখে, কারণ সে দিন সে সাধ মিটাইয়া সাজিতে পারে। বিবাহের দিন মুখচোরা মেয়েটিও সকল আড়ম্বরের মধ্যমণি। কেয়ুরে-কঙ্কনে, কুঙ্কুমে-চন্দনে চর্চিত-সজ্জিত হইয়া সে নায়িকা, একরাত্রের রানি। সেই কারণেই জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে, টিভির নাটকে, সাহিত্যে, বিবাহের অনুষ্ঠানটিকে দীর্ঘ করিয়া দেখাইবার ধুম। এক সন্ধ্যার সাধ মিটিবার পর প্রায়ই মেয়েরা আবিষ্কার করে, সংসার বস্তুটির মুখের কাছটিতে মধু, অভ্যন্তরে গরল। চটজলদি সম্বন্ধ করিয়া কিংবা এমনকী প্রেমের পথে প্রাপ্ত স্বামীর সহিত মনের মিল না হইলে, শ্বশুরবাড়িতে অবজ্ঞা-নির্যাতন জুটিলে, সর্বোপরি পণের জন্য চাপ শুরু হইলে শিক্ষিত, স্বনির্ভর মেয়েরাও নিতান্ত অসহায় হইয়া পড়ে।

অতএব এই দেশের কন্যারাও বলিতে পারেন, বধূ সাজিয়া সবান্ধব আনন্দ করিবার অংশটি রাখিয়া বিবাহের অপর অংশটি বাদ দিলে ক্ষতি কী? মনের মানুষ যদি মেলে, যখন মেলে, মিলিবে। না মিলিলেও ক্ষতি নাই। সকল অঙ্গীকারের বোঝা বহিয়া মানুষের শেষ উপলব্ধি ইহাই যে, চিরস্থায়ী সম্পর্ক একমাত্র নিজের সহিত। সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ প্রতিশ্রুতি নিজের প্রতি। অপরের অপেক্ষায় নিজের জীবন শূন্য রাখিবার প্রয়োজন নাই। জীবনে কী প্রার্থনীয়, তাহা সমাজ-সংস্কৃতিই আমাদের শিখাইয়াছে। বধূসজ্জা, বরসজ্জার আকর্ষণ নীরবে বা সরবে উপেক্ষা করিলে নিজের সহিত প্রতারণা করা হয়। অতএব, কেহ বলিতেই পারেন, সংকোচ ত্যাগ করিয়া একক বিবাহে একাই রানি (কিংবা রাজা) সাজিয়া উঠুক একবিংশের তরুণ প্রজন্ম।