রাত তখন সাড়ে দশটা। ডিসেম্বরের হাড় কাঁপানো শীত। ১০ জনপথ থেকে সনিয়া গাঁধীর ব্যক্তিগত সচিব ভিনসেন্ট জর্জের ফোন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ‘ম্যাডাম এক্ষুনি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন।’

দিনটা ছিল ১৯৯৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর। ততক্ষণে অস্কার ফার্নান্ডেজও পৌঁছে গিয়েছেন সনিয়ার কাছে। প্রয়াত অজিত পাঁজাকে সঙ্গে নিয়ে সেই শীতের রাতে মমতা পৌঁছলেন জনপথে। আইএনএস বিল্ডিং-এ অফিসে গালে হাত দিয়ে বসে আছি, বার বার ফোন করছি অজিতদা আর মমতার বাড়িতে। সোমেন মিত্রকে সরিয়ে রাজ্য কংগ্রেসের দায়িত্ব মমতাকেই দেওয়া হবে, না কি মমতা নতুন দল করবেন?

সীতারাম কেশরী তখন সর্বভারতীয় কংগ্রেস সভাপতি। ওই ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহেই কলকাতায় নেতাজি ইন্ডোরে কংগ্রেসের অধিবেশন হয়েছে। ৯ ডিসেম্বর কেশরী, প্রণব মুখোপাধ্যায় এবং রাজ্য সভাপতি সোমেন মিত্র মঞ্চে, হলের বাইরে মমতার কর্মিসভায় জনপ্লাবন। সে জনসমুদ্র দেখে তত দিনে আমি নিশ্চিত, কেশরী যদি সোমেন মিত্রের কথায় মমতার সম্পর্কে কঠোর মনোভাব নেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি কংগ্রেসেরই হবে, মমতাই হয়ে যাবেন আসল কংগ্রেস। কিন্তু আজ মুলায়ম যেমন শিবপালের কথায় অখিলেশকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেন, সে দিন কেশরী সেটাই করেছিলেন সোমেনের কথায়।

মমতা একা সনিয়ার সঙ্গে দেখা করেন। ১৯ ডিসেম্বর। সে দিন মমতা তাঁর ফ্ল্যাটে যখন ফেরেন তখন রাত বারোটা বেজে গিয়েছে। রাজীব-জায়া সনিয়া মমতার পিঠে হাত রেখে বলেন, আমি চাই তুমি কংগ্রেসেই থাক। খুব ভাল করে কাজ করো। মমতার চোখে জল এসে গিয়েছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সনিয়ার অসহায়তা!

২২ ডিসেম্বর বিকেলে মমতা ঘোষণা করলেন তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকেই নির্বাচন লড়বেন। সেই সাংবাদিক বৈঠকের মধ্যেই খবর এল, তাঁকে ছ’বছরের জন্য কংগ্রেস থেকে বহিষ্কার করা হল। অস্কার ফার্নান্ডেজ দুঃখ করে আমাকে পরে বলেছিলেন, ম্যাডাম চেয়েছিলেন এটা আটকাতে, আমিও চেষ্টা করেছিলাম। পারলাম না।

প্রায় দু’দশক অতিক্রান্ত। আবার সেই শীতের দিল্লি। ২০১৬ ডিসেম্বর দিল্লির ঐতিহাসিক কনস্টিটিউশন ক্লাবে মমতা-রাহুল পাশাপাশি সাংবাদিক বৈঠক। দেখছি আর ভাবছি, রাজনীতিতে কোনও পূর্ণচ্ছেদ হয় না। কংগ্রেস-সিপিএম বোঝাপড়া হয়েছিল। আরজি (এই নামেই দিল্লিতে সবাই রাহুলকে ডাকেন)-কে অনেকে বুঝিয়েছিলেন রাজ্যে এই ‘জোট’ মমতাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সক্ষম হবে। সে ভাবনা যে ভুল ছিল তা আজ তিনি বুঝতে পারছেন। এই তো সে দিন শীর্ষ কংগ্রেস নেতাদের ২৪ আকবর রোডের অফিসেই তিনি নেতাদের বোঝাচ্ছিলেন দেশ জুড়ে মোদী-বিরোধিতার রাজনীতি সুসংহত হচ্ছে। সর্বভারতীয় মঞ্চ গঠনে সমস্ত আঞ্চলিক দলকেই সঙ্গে নিতে হবে। সে মঞ্চ গঠনে ‘দিদি’কে আমাদের খুবই প্রয়োজন। রাহুল ঠিক বলছেন।

আর সিপিএম? রাজীব গাঁধীকে সরানোর জন্য একদা বিশ্বনাথপ্রতাপকে সমর্থন করতে গিয়ে সিপিএম যদি জনসংঘ-বিজেপির সঙ্গে পরোক্ষে সমঝোতা করতে পারে, তবে আজ মমতার জন্য রাহুলকে বর্জনের সিদ্ধান্ত কেন? বিশ্বনাথপ্রতাপ সিংহ প্রত্যেক মঙ্গলবার নৈশভোজের আয়োজন করতেন। সেখানে এক দিকে থাকতেন নিরামিষাশী আডবাণী, অন্য দিকে আমিষ লাইনে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। প্রয়াত ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা চিত্ত বসু গুরুদ্বার রকাবগঞ্জে ওঁর বাসভবনে চিঁড়ে দই খেতে খেতে সে দিনের বাম-বিজেপি সম্পর্কটা আমাকে বোঝাতে গিয়ে বলেছিলেন, এটা অনেকটাই ভাসুর-ভাদ্রবউয়ের সম্পর্কের মতো হয়ে গিয়েছে। মুখ দেখা যাবে না কিন্তু প্রণাম

করবে। তা সে দিন কংগ্রেস বিরোধিতার জন্য সেটা সম্ভব ছিল, কিন্তু আজ সাম্প্রদায়িক শাসনের প্রতিবাদে মমতার সঙ্গে জাতীয় মঞ্চে দাঁড়ানোটাই কি নীতিধর্ম নয়?

রাহুল মমতার নৈকট্য তো চোখের সামনে দেখলাম। দিল্লি বিমানবন্দর থেকে রতন মুখোপাধ্যায় তাঁর ছোট মারুতি গাড়িতে মমতাকে নিয়ে যখন সাউথ অ্যাভিনিউয়ের ভাইপো অভিষেকের বাড়িতে এলেন তখন সন্ধ্যা নেমেছে। ধূসর কুয়াশাচ্ছন্ন রাজধানী।

আহমেদ পটেলের ফোন। দিদি, বিকেল তিনটের সময় রাহুলের সাংবাদিক বৈঠক। মমতা বললেন, শুধু সাংবাদিক বৈঠক? বৈঠকের আগে কথাবার্তা হোক। রাহুল সঙ্গে সঙ্গে মমতার প্রস্তাব মেনে নিলেন। পর দিন সাংবাদিক বৈঠকের আগে রাহুল গাঁধী ও অন্যান্যদের সঙ্গে আলোচনা হল মমতার। সাউথ অ্যাভিনিউ থেকে কনস্টিটিউশন ক্লাবে আসতে দশ মিনিট লাগবে। যতই বলি, তবু মমতা তাড়াহুড়ো করে আগে বেরোবেনই। গাড়িতে উঠে কারণটা নিজেই বোঝালেন, ‘কিছু মনে করবেন না। খুব তাড়া দিলাম। আসলে রাহুল আমার জন্য ওয়েট করুন এটা আমি চাই না। আসলে কেউই আমার জন্য ওয়েট করছে আর আমি দেরি করছি এটা ভাল লাগে না। আমিই চা-চক্রের প্রস্তাব দিলাম আর আমিই লেট করব?’

কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা দিবসেও মমতা কংগ্রেসকর্মীদের শুভেচ্ছা জানালে প্রবীণ এক কংগ্রেস নেতা বললেন, মনে হচ্ছে কংগ্রেস যেন মমতার বাপের বাড়ি। কথাটা তাৎপর্যপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, কংগ্রেসের সঙ্গে মমতার কখনওই মতাদর্শগত সংঘাত হয়নি। তিনি তো দল ছাড়তে চাননি। ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন কিছু নেতার জন্য।

প্রদেশ কংগ্রেস তথা তার সভাপতি অধীর চৌধুরীর চিন্তা বুঝি। প্রথমত, মমতা-কংগ্রেস বন্ধনে কংগ্রেসের নিজস্ব ভোট যদি সবটাই তৃণমূলে চলে যায়? দ্বিতীয়ত, কংগ্রেস-তৃণমূল সমঝোতা হলে মমতা লোকসভায় কংগ্রেসকে ক’টা আসন দেবেন? কিন্তু লোকসভা ভোট রাহুলের কাছে বড় চ্যলেঞ্জ। এবং তিনি মনে করছেন লোকসভায় মমতার আসন বাড়লে সে তো মোদী বিরোধী জোটের ঝুলিতেই আসবে। বিহারে কংগ্রেস যত দিন জলসাঘরের ছবি বিশ্বাসদের মতো জমিদারি মনোভাব দেখিয়েছে তত দিন ব্যর্থ হয়েছে। রাজ্য কংগ্রেসের আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে লালুর সঙ্গে হাত মিলিয়েই রাহুল আসন বাড়াতে পারলেন। পাঁচমাড়ি কংগ্রেস, তার পর শিমলা সম্মেলনে জোট-যুগের বাস্তবতা স্বীকার করেছে কংগ্রেস। রাহুলেরও জোট নিয়ে আগে অস্বস্তি ছিল। এখন কিন্তু তিনিই একলা চলো রে নীতি ঝেড়ে ফেলে মমতার মতো নেতাকে মর্যাদা দিচ্ছেন।

বিজেপির শীর্ষ নেতারা ক’দিন আগে পর্যন্ত ভাবতেন হয়তো মমতাকে চেষ্টা করে এনডিএতে ফিরিয়ে আনা যাবে। এখন তাঁরা আর তা ভাবছেন না। অরুণ জেটলি-রাজনাথ সিংহ দু’জনকেই বলেছি, শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ সংখ্যালঘু ভোট পশ্চিমবঙ্গে। মমতা বিজেপির বেলতলায় আর যাবেন না। মনে পড়ে, তখন রাজ্যের বিরোধী দল নেতা আবদুল মান্নান সোমেন মিত্রের ঘনিষ্ঠতম, সেবা দলের রাজ্য চেয়ারম্যান। কিড স্ট্রিটের এমএলএ হস্টেলের ছ’তলার কোনার ঘরটাতে থাকতেন। কত দিন ওই ঘরে বসে মান্নানদার সঙ্গে আড্ডা মেরেছি। তখন প্রিয়-বিরোধী রাজনীতি সফল করতে মান্নানদা মমতার পক্ষে। আজ সেই মান্নানদাই কিন্তু মমতার রাজনীতির ঘোরতর বিরোধী। কিন্তু আজ আবার নতুন রণকৌশল তৈরির সময় এসেছে। 

রাজ্য কংগ্রেস নেতাদের বলছি, মোদী বিরোধী রাজনীতির সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপট থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করবেন না। শুধু কৌশল নয়, এটা রাজনৈতিক নৈতিকতারও প্রশ্ন। রাজ্যে মমতা বিরোধী রাজনীতির পরিসর তৈরির অবকাশ হাইকম্যান্ড আপনাদের কম দেননি। এখনও কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু দিল্লির ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকাটাও কাজের কথা নয়। কেশরী-সোমেন মিত্র যে ভাবে মমতাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিলেন আজ তার প্রায়শ্চিত্ত করার সময় এসেছে। বৃহত্তর রাজনীতির স্বার্থে। রাজনীতিতে পূর্ণচ্ছেদ নেই।