আমি মানসিক ভাবে কিছুটা অসুস্থ। একটা বন্ধুর কাছে গিয়েছিলাম, নতুন বছর উদ্‌যাপন করতে। সে আমায় দু’দিন ধরে একটা গাড়িতে ঘুরিয়ে, একটা বাড়িতে নিয়ে গেল। সেখানে সে আর তার তিন স্যাঙাত মিলে আমায় প্রচণ্ড পেটাল। প্রথমে বুঝতে পারছিলাম না, কেন। তার পর তারা নাগাড়ে যে গালাগাল দিতে লাগল, বুঝলাম, আমি শ্বেতাঙ্গ বলে আমার ওপর রাগ। বা, শ্বেতাঙ্গদের ওপরেই রাগ, আমাকে হাতের কাছে পেয়েছে বলে প্রতীকী শ্বেতাঙ্গ হিসেবে পেটাচ্ছে। সব দেশের মতোই আমাদের আমেরিকাতেও, জাতিঘেন্নার মতো মোটিভেশন আর কিচ্ছুই নেই। তাই চার কৃষ্ণাঙ্গ আমার ওপর তুমুল ঝাল ঝাড়ল। চড় মারল, ঘুষি মারল, লাথি মারল। কমোডের জল খেতে বাধ্য করল। ছুরি দিয়ে খুলিটা সামান্য খুবলেও নিল। জামাকাপড় ফালাফালা করল। আরও অনেক ক্ষণ চলত, হয়তো শেষে খুনও করত, কিন্তু প্রতিবেশীরা এসে দরজা ধাক্কাল। তারা এত চেঁচামিচিতে অতিষ্ঠ। আমি অবশ্য খুব একটা চেঁচাতে পারছিলাম না, মুখে ওরা স্টিকিং প্লাস্টার আটকে দিয়েছিল। পুলিশ যখন আমাকে উদ্ধার করল, তখন আমি সামান্য পোশাক পরা অবস্থায়, চটি-পায়ে রাস্তায় ঘুরছি। পুলিশকে বিশেষ কিছু বলতে পারিনি, কিন্তু তার দরকারও ছিল না। তত ক্ষণে পৃথিবী জুড়ে সব্বাই ব্যাপারটা জেনে গেছে। কারণ যারা মারছিল, তারা নিজেরাই এই প্রহার-এপিসোডের প্রায় আধ ঘণ্টা ফেসবুকে লাইভ স্ট্রিম করেছে।

মানে, নিজ কীর্তির সরাসরি সম্প্রচার। যে মেয়েটি এটা রেকর্ড করছিল, সে নিজের দিকেও বার বার ক্যামেরাটা, মানে ফোনটা ঘুরিয়েছে। নিজেকে দেখাতে তার লজ্জা তো হয়ইনি, বরং সে চাইছিল ভিডিয়োটা ভাইরাল হোক, সে নিজেও ভাইরাল হোক। এবং এটা চলার সময় যথেষ্ট কমেন্ট আসছে না বলে সে খুব বিরক্তিও দেখিয়েছে। সত্যিই তো, একটা হাত-পা বাঁধা লোককে নৃশংস পেটানো হচ্ছে, এ কি সুপার-রমরমে দৃশ্য নয়? লাইভ দেখছি টেররিস্ট পুলিশকে খুন করছে, বা পুলিশ খুন করছে গাড়ির আরোহীকে: টেররিস্ট সন্দেহে— এগুলো তো হিট করেছে ফেসবুকে, আর এগুলোই কি ভাবী ঘনচক্কর রিয়েলিটি শো নয়? যাহা টিআরপি তোলে, তাহাই কাম্য, এই ফর্মুলাতেই কি বিশ্ব চলছে না? মেজরিটি যদি গণধোলাই ভালবাসে, অবশ্যই টিভিতে গণধোলাইয়ের স্লট করতে হবে। ফেসবুকেও।

কেনই বা নয়? অট্টালিকায় হু-হু আগুন লাগলে লোকে ভিড় করে দাঁড়িয়ে দেখে না? ওভারব্রিজ চাপা পড়ে মানুষ রক্তাক্ত হাত বাড়িয়ে জল চাইছে, দেখতে টিভির সামনে চিপকে যায় না? মুখে ওবাবাগো ইইইস বলবে কিন্তু হাঁ করে গিলবে এবং বাথরুম চেপে থাকবে পাছে ফুটেজ ফসকে যায়, এ-ই কি মানুষের ধর্ম নয়? তবু ফেসবুক ভিডিয়োটা সরিয়ে নিয়েছে। কারণটা বোধহয় এ-ই, এখানে একটা নিরীহ লোককে বিনা কারণে মারা হচ্ছে। তার ওপর আমি মানসিক

প্রতিবন্ধী। তাই অসহায়তার মাত্রাটা বেশি। কিন্তু এটা তো মাথায় রাখতে হবে, এ যে-সে মার নয়, গোল-শোধের মার। এখানে ব্যক্তিরা ব্যক্তিকে পেটাচ্ছে না, হাজার বছর ধরে মার খাওয়া জাতি নাগালে পেয়ে তার নিপীড়ক জাতিকে পেটাচ্ছে। কী মহান প্রোজেক্ট! যতই বড় বড় কথা বলা হোক, আমেরিকায় তো আর কালোদের সত্যিই সাদাদের সমান ভাবা হয় না। তাই এই কালোরা— তিন জনের বয়স আঠেরো আর এক জনের চব্বিশ, এক আঠেরোর হাবাগোবা সাদা-চামড়াকে পিটিয়ে ইতিহাসের শোধ নিয়ে নিল।

আসলে, নিজেকে এক বার অত্যাচারিত ভেবে নিলে, বিরাট সুবিধে: নিজের কাজকম্মগুলো ন্যায়ের কোঠায় থাকছে কি না— তা নিয়ে আর মাথা ঘামাতে হয় না। আমায় তো অত্যাচার করা হয়েছে, তাই আমি যত খুশি অত্যাচার করতে পারি, কোনও কৈফিয়ত দেওয়ার দায় নেই। আমি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ছিলাম, তা হলে কেন জার্মানদের ঘরে ঢুকিয়ে গ্যাস চালিয়ে মারব না? আমি গরিব, তা হলে কেন বড়লোকদের কিডন্যাপ করে না-খাইয়ে খুন করব না? আমি ভুল চিকিৎসায় প্যারালাইজ্ড, তবে কেন ডাক্তারদের এনে কুয়োয় ফেলব না? আমি যে কান্নাটা কাঁদছি তা যদি খাঁটি হয়, যে রাগটা রাগছি তা যদি নির্ভেজাল হয়, তা হলে আমি যে মারটা মারছি, তা শুদ্ধ ও নীতি-প্রুফ হতেই হবে। তাই তোতলা লোক ভিড়বাসে ঠেলেঠুলে প্রতিবন্ধীর সিটে বসে যায়, আর যে দেশে মুসলিমরা সংখ্যালঘু ও নিপীড়িত, সেখানে প্রথমেই ‘আমি মুসলিম’ কার্ড খেলে সুবিধে তুলে নেয় বহু ওস্তাদ।

যেমন সেই বাঘটা ভেড়াটাকে বলেছিল, তুই জলঘোলা করিসনি, তোর বাপ করেছিল, তেমনই এদের বক্তব্য: তুই আমার প্রতি অন্যায় করিসনি তো কী, তোর ঠাকুদ্দার ঠাকুদ্দা করেছিল। চার যুবক-যুবতী আমায় মারার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ও শ্বেতাঙ্গ জাতকে উদ্দাম গাল দিচ্ছিল। তাদের কি প্রখর ইতিহাসবোধ? জানি না। কিন্তু তারা নিশ্চিত ভাবছিল, বিপ্লব করছে। বিপ্লব করতে অনেকেই খুব ভালবাসে। বিশেষত সহজ বিপ্লব। যেমন, ফেসবুকে বিখ্যাত লোককে অপমান করা। বা, খেলা দেখার ভিড়ে মাউন্টেড পুলিশের ঘোড়ার ল্যাজ তুলে সিগারেট-ছ্যাঁকা। বন্ধুরাও সে দিন আমাকে টার্গেট করেছিল, যাতে চট করে সহজ বিপ্লব মচানো যায়। যাতে কৃষ্ণাঙ্গরা ভিডিয়োটা দেখে তাদের ‘বিদ্রোহী অভ্রান্ত’ বলে পুজো করতে শুরু করে। আর তারা বুক বাজিয়ে বলতে পারে, একটা মানসিক প্রতিবন্ধী, মানে সেফ টার্গেটকে তছনছ করে, তারা সিস্টেমের সচেতন সাবোতাজ ঘটাল। তারা যে অত্যাচারী শ্বেতাঙ্গের সমানই সাম্প্রদায়িক ও বর্ণবিদ্বেষী কাজ করল, সেটা ওভারলুক করে দাও। যদিও শিকাগোর এক পুলিশ অফিসার বলেছেন, ঘৃণার কোনও রং হয় না, আমার মনে হয়, ঘৃণার ‘সুবিধেজনক রং’ থাকলে ব্যাপারটা আরও গুলিয়ে যায়, তাই বহ গুণ মনোযোগে ঝুঁকে জরিপ দরকার।

লেখাটির সঙ্গে বাস্তব চরিত্র বা ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্ত অনিচ্ছাকৃত, কাকতালীয়