শেষ পর্যন্ত, ১৯৮২ সালে, মায়ানমার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয় এবং ন্যূনতম সুযোগসুবিধা থেকে তাদের বঞ্চিত করতে থাকে। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও যখন রোহিঙ্গাদের রাখাইন থেকে উৎখাত করা যায় না, তখন শুরু হয় রাষ্ট্রের সাহায্যে সংগঠিত সাম্প্রদায়িক আক্রমণ। রোহিঙ্গারা এর প্রতিবাদে তৈরি করে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি, যারা পাকিস্তান ও পশ্চিম এশিয়ার মুসলমান জঙ্গিগোষ্ঠীর সাহায্য নিয়ে প্রত্যাঘাত করে। খবর পাওয়া গিয়েছে যে, কিছু রোহিঙ্গা আইএস জঙ্গিদের মদত পাচ্ছে এবং তারা বাস্তবিকই ‘সন্ত্রাসবাদী’। কিন্তু সেটা পুরো ছবির একটা অংশমাত্র। রোহিঙ্গাদের ওপর রাষ্ট্রীয় মদতে অত্যাচারের প্রতিক্রিয়ায় একটা সময় এই জঙ্গিরা সরকারি ও সামরিক বাহিনীর ঘাঁটিতে আক্রমণ চালিয়েছে। কিন্তু এই আক্রমণকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে মায়ানমার সরকার রাখাইন প্রদেশে গণহত্যার মাত্রা তীব্রতর করে তোলার একটা সুযোগ পেয়ে গেল।

এই মুহূর্তে পরিস্থিতি হাতের বাইরে। আর ভারত যা করছে তাতে বোঝা যাচ্ছে, এ বিষয়ে ভারতের না আছে দক্ষতা না আছে দূরদৃষ্টি। ভারত অন্তত একটা কাজ করতে পারত। রোহিঙ্গাদের লাগাতার নির্মূল করতে মায়ানমারের তৎপরতাকে রাষ্ট্রপুঞ্জ যে ভাবে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নিন্দা করেছে, তাতে গলা মেলাতে পারত। কিন্তু মোদী সরকার তা করেনি। মায়ানমারে চিনের প্রবল ভূমিকার মোকাবিলা নিশ্চয়ই আমাদের করতে হবে, যে ভাবে চিন ভারতকে ঘিরে ফেলছে তাকে অগ্রাহ্য করাও অবশ্যই চলে না। মায়ানমারের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক রাখা জরুরি, কিন্তু তিনটি ব্যাপার পরিষ্কার। এক, চিন যে ভাবে তার দাপট দেখায় আমাদের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। দুই, চিনের আর্থিক সামর্থ্য অনেক বেশি। তিন, মায়ানমারের পক্ষেও চিনের সম্পূর্ণ বশংবদ হওয়া সম্ভব নয়, অর্থাৎ ভারতকে তাদেরও দরকার। এবং, কূটনীতির দাবি আছে নিশ্চয়ই, কিন্তু মানবতারও দাবি আছে। ভারতকে বিশ্বসভায় নিজের নৈতিকতার ভিত শক্ত রাখতে হবে, সব নীতিকে ক্ষুদ্রস্বার্থের পায়ে বিসর্জনের দেওয়াটা যথার্থ কূটনীতিরও পরিচয় নয়।

মোদী সরকার যে ভাবে রোহিঙ্গা সমস্যার মোকাবিলা করছে, তাতে কেবল বিশ্বের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষরাই হতাশ হননি, জনসংখ্যায় বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের গণতন্ত্রপ্রিয় নাগরিকরাও যারপরনাই হতাশ। প্রতিবেশী বাংলাদেশও ভারতের এই আচরণে গভীর ভাবে আহত হয়েছে। ভারতের পশ্চিম সীমান্তে দফায় দফায় অঘোষিত যুদ্ধ চলছে, উত্তরে নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক উদ্বেগজনক, আর ভারতের প্রতি শ্রীলঙ্কার বিরাগ তো খোলাখুলি প্রকাশ পাচ্ছে। এ রকম অবস্থায় একমাত্র বাংলাদেশের সঙ্গেই ভারতের সম্পর্ক ভাল ছিল। কিন্তু নদীজলের বণ্টন এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গেও ভারতের সম্পর্ক ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। এ দেশে মুসলমানদের ওপর যারা আক্রমণ চালাচ্ছে, তাদের শাস্তি দিতে যে ভাবে ব্যর্থ হচ্ছে ভারত, তাতে তার ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়েও বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক মানুষদের মনে ভারতের মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অথচ বাংলাদেশ কিন্তু জঙ্গি ইসলামের মোকাবিলায় সমানে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের উচিত বাংলাদেশকে এই কাজে সাহায্য করা।

মুসলমান-ধর্মাবলম্বী ইন্দোনেশিয়া এবং এমনকী বৌদ্ধ-ধর্মাবলম্বী তাইল্যান্ডও মায়ানমারে বৌদ্ধধর্মের নামে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারকে প্রবল আগ্রাসন হিসেবেই সমালোচনা করেছে। এই অবস্থায় ভারতের পক্ষে মায়ানমারের জেনারেল মিং অউং লাং এবং তাঁর খুনে-অনুগামীদের পাশে দাঁড়ানোটা একেবারেই মেনে নেওয়া যায় না। পুরো ঘটনা ও ইতিহাস না জেনে, তার শিকড়ে না গিয়ে কেবলমাত্র কয়েকটি বিক্ষিপ্ত ঘটনার ওপর ভিত্তি করে একটি পুরো জাতিকে জঙ্গি আখ্যা দেওয়াটা মায়ানমার দেশটির ক্ষতি তো করবেই, এমনকী ভারতের এই সমর্থন ভারতেরও ক্ষতি করবে। মায়ানমারে ক্ষতিগ্রস্তদের এখন অন্তত প্রচুর অর্থ এবং চিকিৎসার উপকরণ দিয়ে সাহায্য করলে, ভারতের তবু কিছুটা মুখ রক্ষা হয়। যে নির্বোধ, অপটু এক রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি তৈরি করেছে ভারত, যে কিনা কে শত্রু চিহ্নিত করতে না পেরে একটা গোটা জাতিগোষ্ঠীর ওপর স্টিমরোলার চালাচ্ছে— এই সহযোগিতা অন্তত সেই ভাবমূর্তির দায় থেকে তাকে মুক্তি দিতে পারে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বহু-সাংস্কৃতিক যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ভারতের এখন উচিত দুনিয়ার কাছে এটা প্রমাণ করা যে, সে ইসলামোফোবিয়া-র উপাসক নয়। বস্তুত, ভারত এখন একটু মন দিয়ে একটা কথা ভাবতে পারে— যদি রোহিঙ্গারা হিন্দু হত?                                     

    (শেষ)