ঘর থেকে বাইরে, মুখ থেকে মুখোশের গল্প ‘প্যাডম্যান’। আজকের ভোগবাদী ‘আধুনিক’দুনিয়ার মজ্জায় মজ্জায় যে অকারণ সংস্কার দানা বেঁধে আছে, তার বাস্তব চেহারাটা খুলে দিল প্যাডম্যান।

ছবির শুরু গানে। দাম্পত্যের অনাবিল ছন্দে।

বালকি পরিচালিত অরুণাচলম মুরুগানান্থমের জীবনী নিয়ে তৈরি প্যাডম্যানের সুপারম্যানের নাম অক্ষয় কুমার, ছবিতে ‘লক্ষ্মী’। নামের মধ্যেই প্রচ্ছন্ন আছে বিপ্লব। লক্ষ্মী কেবল মেয়েদের মধ্যে খুঁজলেই হয় না। লক্ষ্মী কেবল অর্থের জোগান দেওয়ার জন্য নয়। পুরুষের মধ্যেও লক্ষ্মী বিরাজ করে। 

পুরুষলক্ষ্মী অক্ষয় তাই, মেয়েদের সবচেয়ে গহীন বিষয় নিয়ে ভাবলেন। মেয়েদের স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করা কতটা জরুরি? কারখানার লোহার কারবারি অক্ষয় ওরফে লক্ষ্মী কেন হঠাৎ মেয়েদের স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সোজাসুজি মেয়েদেরকেই বলতে শুরু করলেন? কারণ একটাই। স্ত্রী গায়ত্রীর প্রতি তাঁর অদম্য প্রেম! বড্ড বেশি কেয়ারিং স্বামী তিনি। মনে করেন স্ত্রীর সব দায়িত্ব, এমনকী, কাপড়ের বদলে বউ স্যানিটারি ন্যাপকিন যেনেবেন সে সিদ্ধান্তও তাঁর। সমস্যার শুরুও সেখান থেকে। মধ্যপ্রদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল মহেশ্বর (যেখানে মহিলারা পিরিয়ডের সময় বাড়ির বাইরে আলাদা থাকেন), সেখানে একজন পুরুষ মেয়েদের স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারের কথা বলবে! এটা শুধু লজ্জাজনক নয়, পাপ। পাগলামি। আর পাগলদের সঙ্গে কেউ থাকে না। তাই অক্ষয় ঘরছাড়া। একা। সঙ্গে কেবল জেদ আর খ্যাপামি। কী করবে সে? স্যানিটারি ন্যাপকিন সস্তায় তৈরি করে সবমহিলার হাইজিনকে আশ্বস্ত করতে পারবে কি? সেটা দেখার জন্য ছবি দেখাই ভাল।

‘প্যাডম্যান’ ছবির একটি দৃশ্যে অক্ষয় ও রাধিকা। ছবি: ইউটিউবের সৌজন্যে।

এ ছবি সত্যিকে গল্প করার ছবি। কোয়ম্বত্তূর সম্পূর্ণ নিজেরউদ্যোগে কম দামে মহিলাদের জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি করেন অরুণাচলম। সামাজিক ট্যাবু, অপমান, বিরোধিতা গ্রহণ আর উপেক্ষার পথ ধরে এ ছবি এগিয়েছে। পাগলামি আর ব্যর্থতা না থাকলে সৃষ্টির তাগিদ জন্ম নেয় না— এ ছবি বলেছে।

আরও পড়ুন, মুভি রিভিউ: প্রত্যাশার পাহাড়, শবর জীবন্তই

বিনোদনে ইদানীং সামাজিক সচেতনতার ঢল নেমেছে। প্যাডমান-ও এক ছবিতে অনেক কিছু বলতে গিয়ে দর্শকদের গুলিয়ে দিয়েছে তত্ত্ব আর তথ্য। যে ছবিতে ‘বড় হওয়া মানে নিজের দায়িত্ব নিজে নেওয়া’র মতোদামি কথা বলা হয়, সেই ছবি আবার এক পুরুষের হিরোয়িজমকে আলোকিত করতে গিয়ে মেয়েবেলার শুদ্ধিকরণের ভার সেই পুরুষের হাতেই তুলে দেয়। কেন?

সব কিছু এক ছবিতেই কেন দেখাতে হবে? গার্হস্থ্য হিংসার মতো বিষয় এক ঝটকায় এনে তার চটজলদি সমাধান দেওয়া হয়েছে। ছবিতে মাতাল বরের অত্যাচার থেকে এক গ্রামের মহিলা নিজেকে উদ্ধার করে গ্রামে গ্রামে প্যাড বিক্রি করে, নিজে রোজগার করে। আর্থিক স্থিতি দিয়েই যদি মাতাল স্বামীর অত্যাচার থেকে মেয়েরা মুক্তি পেতে পারত তাহলে সমাজে কোনও সমস্যাই থাকত না।

ছবির একটি দৃশ্যে সোমনের সঙ্গে অক্ষয়। ছবি: ইউটিউবের সৌজন্যে।

লক্ষ্মীকান্তের সব বাধা পেরিয়ে আকাশ ছোঁয়ার বিস্ময় এই ধারার বাস্তব ছবিতে অবাস্তব ঠেকে।

তবুও প্যাডম্যান দেখে ফেলা যায়। অক্ষয় কুমারকে দেখার জন্য।এখনকার কোনও হিরো মহিলাদের গোলাপি রঙের অন্তর্বাস এবং স্যানিটারি প্যাড পরে অভিনয় করবেন কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এমন ভাবে চরিত্রের সঙ্গে মিশেছেন তিনি, মনে হয় এ চরিত্রে তাঁর মতো অভিনয় বলিউডে কেউ পারবে না। তবে অক্ষয়ের কাছে প্রশ্ন আছে, একের পর এক সামাজিক সমস্যা নিয়েই ছবি কেন? আরোপিত হয়ে যাচ্ছে যে কোনও কোনও বিষয়।

আরও পড়ুন, মুভি রিভিউ: আরও একটা ‘বিগ বাজেট’, আরও একটা ‘ম্যাগনাম ওপাস’

অক্ষয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন রাধিকা আপ্তে। মহেশ্বরের সংস্কারে ঘেরা গায়ত্রী হল থেকে বেরিয়েও মনে থেকে যায়। ভাল লাগে সোনম কপূরকেও। মেয়েদের সমস্যা মেয়েরাই ভাল করে বুঝতে পারে। তাই সোনম কপূর ছিলেন অক্ষয়ের পাশে।
অভিনয় দিয়েই চরিত্র আর তার চারপাশের ঘটনাকে বাস্তব করে তুলেছে ‘প্যাডম্যান’। যে প্রসঙ্গ সংলাপের মাধ্যমে ছবির শরীর জুড়ে আছে তা দর্শককে ভাবাবে। কিন্তু সত্যি গল্পের আড়ালে কি আরও কিছু আছে?

‘স্বচ্ছ ভারত’, ‘স্বচ্ছ শৌচালয়’, ‘বেটি বাঁচাও’...স্লোগানগুলো ঘুরছে ছবির ইমেজে।