তারা কেউ একশো পেরোচ্ছে, কেউ বা নবতিপর। কেউ আবার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে প্রৌঢ়ত্বের দিকে এগোচ্ছে। এমনই নানা ক্লাব মিলিয়েই এ বার জমজমাট পুজো ময়দানের শ্যামবাজার সার্কিট!

গত কয়েক বছরের ভিড়ের হিসেব বলছে, এক-একটি দিন এক-একটি অঞ্চল বেছে নিয়ে চরকিপাক খান লোকজন। সেই এলাকার পুজোগুলি ঘিরেই তৈরি হয় ‘সার্কিট’। তেমনই এক সার্কিট শ্যামবাজার-টালা-বেলগাছিয়া চত্বর।

বিটি রোড দিয়ে আসা ভিড়টা প্রথমেই সটান ঢুকে পড়ে টালা বারোয়ারির মণ্ডপে। গত কয়েক বছরের মতো এ বারও তারা বেছে নিয়েছে পরিবেশকে। জল না বাঁচালে ৫০ বছর পর ধরিত্রীর চেহারা কী হবে সেটাই এ বার টালা বারোয়ারির মণ্ডপে ফুটিয়ে তুলছেন শিল্পী সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।

টালা বারোয়ারির প্রতিবেশী সরকারবাগান সম্মিলিত যুবকবৃন্দের এ বার শতবর্ষ। ‘শুদ্ধং দেহি’ থিম বেছে সেখানে ঝাড়ু, ব্রাশ দিয়ে মণ্ডপ সাজাচ্ছেন নবীন শিল্পী জুটি অমিত-অরিন্দম। পুরনো পুজোয় সনাতন পাল প্রতিমাকে সাবেক রূপেই রাখছেন। পুজো কমিটির এক সদস্যের কথায়, ‘‘আমাদের সাধ্য হয়তো কম। কিন্তু নজর কাড়তে কোনও ত্রুটি রাখছি না।’’ টালা সরকারবাগান অধিবাসীবৃন্দের পুজোয় এ বার থিম ‘সাবেকিয়ানাই’। কার্যত সনাতনী রূপকে ধরেই থিমের বাজারে নজর কাড়তে চাইছে তারা। মিন্টু পালের প্রতিমা সাবেক রূপেই।

আরও পড়ুন: সমানে টক্কর দেবে উত্তর কলকাতা

৯২ বছরের পুরনো টালা পার্ক প্রত্যয়ের পুজো। তবে থিমের বাজারে তারা নেহাতই নতুন। দেবীর আবাস স্বর্গ ফুটে উঠছে প্রত্যয়ের মণ্ডপে। সাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কাপড়, রেক্সিন, প্লাস্টিকের পাইপ। আবহ তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে ত্রিমাত্রিক আলো। টালা পল্লির পুজো এ বার নোট বাতিলকে তুলে আনছে থিমে। নজর কাড়তে থাকছে শিশু কাকতাড়ুয়া।

সার্কাস ময়দানের পুজো হিসেবে পরিচিত বেলগাছিয়া সাধারণ দুর্গোৎসবও কিন্তু গত কয়েক বছরে থিমে নজর কেড়েছে। এ বার সেখানে মণ্ডপ সাজছে রঙিন কাপড়, সুচ, সুতোয়। সুতো দিয়ে বুনে তৈরি হচ্ছে ১০০ দেবদেবীর মূর্তি। আর জি কর হাসপাতালের উল্টো দিকে বেলগাছিয়া যুব সম্মিলনীর মণ্ডপে এ বার ফিরে আসছে হারিয়ে যাওয়া বর্ধমানের কাঠের পুতুল। পুজোর দিনে থাকবেন বর্ধমানের শিল্পীরাও।

টালা ছাড়িয়ে শ্যামবাজারের দিকে এগোলেই পড়বে শ্যামবাজার পল্লি সঙ্ঘ। সাবেক প্রতিমা হলেও থিম কিন্তু এ বার অনেকেরই নজর কাড়তে পারে। দর্শকেরা এ বার সেখানে পাবেন বাংলার পটচিত্র। ফুটে উঠবে নবান্ন উৎসব।

আরও পড়ুন: তাল ঠুকছে দক্ষিণ কলকাতাও

উত্তর কলকাতার প্রাচীনতম পুজো বলতে অনেকেই শ্যামপুকুর আদি সর্বজনীনের নাম বলেন। প্রবাদপ্রতিম বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের পাড়ার এই পুজোয় বাহুল্য হয়তো নেই।
কিন্তু রয়েছে নজরকাড়া থিম। শ্যামপুকুরের এই পুজোয় মণ্ডপ সাজাতে হাতপাখা, কুলো, মাদুর, শালপাতার থালা, বাটির মতো দৈনন্দিন পরিবেশবান্ধব জিনিসপত্র থাকছে। এই পুজো থেকে যতীন্দ্রমোহন অ্যাভিনিউয়ের দিকে এগোলেই পড়বে জগৎ মুখার্জি পার্ক। গত বার বনগাঁ লোকালের ভিড় উপচেছিল সেখানে। এ বার তাদের সাবমেরিন কতটা নজর কাড়ে সেটাই দেখার।

শ্যামবাজারের ভি়ড়ের বড় অংশই হাঁটা দেয় বাগবাজার সর্বজনীনের মণ্ডপের দিকে। কলকাতার সেই পুজো, সাবেকিয়ানাই যার ‘ইউএসপি’। কিন্তু বাগবাজারে যাওয়ার আগে ঢুঁ মারতে পারেন মোহনবাগান বারোয়ারির মণ্ডপেও। থিমের যুগেও শতবর্ষ পেরোনো এই ক্লাব কিন্তু ভরসা রাখছে সাবেকিয়ানাতেই। থিমের দৌরাত্ম্যেও বাঙালির চেনা পুজো যে হারায়নি বাগবাজার কিংবা মোহনবাগান বারোয়ারি তার প্রমাণ।

উৎসব কাপে এ বার শহরের বাকি এলাকাগুলিকে শ্যামবাজার সার্কিট কতটা টক্কর দেয় সেটাই দেখার।