শিমলা থেকে ভোর ভোর যখন বেরোলাম, তখনও ঝাঁ-চকচকে জনপ্রিয় হিল স্টেশনের ঘুম ভাঙেনি। হু হু করে গাড়ি ছুটছে ২২ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে। রাস্তাও এ সময় অনেকটাই ফাঁকা। ঢালি পেরোনোর কিছুটা পর জাতীয় সড়ক ছেড়ে গাড়ি ঢুকে পড়ল এ বার নালদেরা-র রাস্তায়।

শিমলাতে দুটো রাত কাটিয়ে‌ ঠিক করেছি মানালি যাব। কিন্তু তা শিমলা-মানালির চেনা পথে নয়। তার আগে হিমাচলের এক অচেনা জায়গার রূপ-রস-গন্ধ নিয়ে তবেই যাব মানালির পথে। নতুন জায়গাটির নাম কারসোগ ভ্যালি। হিমাচলের সাধারণ পর্যটন-সূচিতে এই অচেনা উপত্যকার কোনও স্থান না থাকলেও মহাভারত-পুরাণের রোমাঞ্চকর গল্পে মোড়া অপরূপ কারসোগ ভ্যালিতে যাওয়ার ইচ্ছেটা ছিল বহু দিন ধরেই। আর সেটাকেই এই সফরে কাজে লাগালাম।

দেবদারু গাছে মোড়া নয়নাভিরাম নালদেরা, উত্তাল শতদ্রু নদের ধারে অবস্থিত উষ্ণ প্রস্রবণ তত্তাপানি পেরিয়ে পাহাড়ি চড়াই পথে গা়ড়ির যাত্রায় পেরিয়ে যাচ্ছি একের পর এক ছবির মতো গ্রাম— অলসিন্ডি, পারগা গলি (এখান থেকে শুভ্র তুষারাবৃত পিরপাঞ্জাল রেঞ্জকে ভারী চমৎকার দেখায়) পেরিয়ে পৌঁছলাম ধারমোর। মূল রাস্তা ছেড়ে ডানহাতি ছোট রাস্তায় ৭ কিলোমিটার যেতেই পৌঁছে গেলাম মহুনাগ মন্দিরে। এখানেই রয়েছে মহাভারতের মহাবীর কর্ণের মন্দির। স্থানীয় মানুষের কাছে কর্ণ এখানে ‘মহুনাগ’ নামে পুজো পান। জনশ্রুতি এই যে, যখনই কেউ সমস্যায় পড়ে ভক্তিভরে কর্ণকে ডাকেন, ‘মহু’ বা মৌমাছি-রূপে এসে কর্ণ স্বয়ং তাঁর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন। মন্দিরে কর্ণের মূর্তিটি রুপোর তৈরি। মন্দির-চত্বরে জলদেবতার ভয়ঙ্কর-দর্শন একটি কাঠের মূর্তিও আছে, যা দেখে বাচ্চারা ভয় পেতেই পারে। মন্দির-চত্বর থেকে বরফে মোড়া হিমালয়ের একটা দারুণ দৃশ্য চোখে পড়ল।

মহুনাগ মন্দির দেখে চলে এলাম চিন্ডি। ধারমোর থেকে ১৪ কিমি দূরে, অর্থাৎ আধ ঘণ্টার রাস্তা। ৬০৭০ ফুট উচ্চতায় পাইনশোভিত চিন্ডি আমার আজকের মতো রাত্রিবাসের ঠিকানা। চণ্ডিকা মাতার নাম থেকেই ‘চিন্ডি’ নামকরণ হয়েছে। চণ্ডিকার মন্দিরটিও দেখলাম। পথে আসতে আসতে প্রচুর আপেলবাগান দেখেছি। আমার এই হোটেলটিও বস্তুত এক আপেলবাগান লাগোয়া। শুনলাম, স্বাদের জন্যই এই অঞ্চলের আপেলের খুব নামডাক। চিন্ডির উচ্চতাটা কারসোগের থেকে খানিকটা বেশি, পাইনের ঠাসবুনোটে আবহাওয়াও বেশ মনোরম। ঠিক করেছি, এখানে রাত্রিবাস করেই কাল দেখে নেব কারসোগ ভ্যালি, চিন্ডি থেকে যার দূরত্ব মাত্র ১৫ কিমি।

পরদিন সকাল সকাল প্রাতরাশ সেরেই বেরিয়ে পড়েছি কারসোগের উদ্দেশে। যেতে যেতে অনেকটা উপর থেকে চোখে পড়ছে দারুণ সুন্দর এক বিস্তীর্ণ উপত্যকার চোখ জুড়নো ছবি। পাহাড়ের একটা ঢালে চোখে পড়ল বিশাল আকৃতির এক দণ্ডায়মান পাথর। এটাই ‘ভীম রক’! জনশ্রুতি, ভীম এক নরমাংসভুক অত্যাচারী রাক্ষসীকে বধ করেছিলেন এখানে। সেই রাক্ষসীর মৃতদেহই পরবর্তী কালে এই পাথরে পরিণত হয়। বহু হাজার বছরের পুরনো ইতিহাসের এই গল্প কারসোগের আকাশে-বাতাসে প্রতিনিয়ত অনুরণিত হচ্ছে। পাণ্ডবেরা কোন মহাভারতের কালে এসেছিলেন এখানে। অথচ আজও তাঁদের নানা কীর্তিকাহিনি যেন দৃষ্টান্তস্বরূপ ছড়িয়ে রয়েছে গোটা উপত্যকা জুড়ে। এই কিংবদন্তির সময়কাল যে রামায়ণ বা পুরাণের যুগ, ভাবলে অবাক লাগে!

স্থানীয় অধিবাসীরা দেখলাম ভারী মিশুকে ও অতিথিবৎসল। পর্যটকের ভিড় তো খুব একটা হয় না এ দিকে, তাই পর্যটক-দর্শনের ক্লান্তি এখনও গ্রাস করেনি এঁদের। খুব আনন্দ ও উৎসাহ নিয়েই উপত্যকা-সম্পর্কিত রোমাঞ্চকর গল্পগাথা শোনান তাঁরা। যেগুলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলেমিশে, সফরের আকর্ষণই যেন বাড়িয়ে তোলে বহুগুণ!

কারসোগের উচ্চতা ৪,৬০০ ফুট। বাজারে বেশ কিছু দোকান, হোটেল ইত্যাদি দেখলাম। এখান থেকে রাস্তা আলাদা হয়ে চলে গেছে নানা দর্শনীয় স্থানের দিকে। তারই একটা ধরে চলে গেলাম ‘কুনহু ধার’ বা হেলিপ্যাড গ্রাউন্ডে। কারসোগ বাজার থেকে যার দূরত্ব ১০ কিলোমিটার। ছোট্ট একটা পুকুরে আকাশের নীলাম্বরী রং ছায়া ফেলেছে। পুকুরপাড়ে রয়েছে এক মন্দির। তাতে অধিষ্ঠিত কামাখ্যা মাতা ও ধামুনি নাগের মূর্তি। এখানকার নাগদেবতা নাকি খুবই জাগ্রত। কুনহু ধারের উচ্চতা থেকে দেখা গেল ৩৬০ ডিগ্রি বিস্তৃত এক চমৎকার অবারিত দৃশ্য। তুষারাবৃত পিরপাঞ্চাল পর্বতের শ্রেণি, হনুমানটিব্বা, জালোরি পাস, নারকান্ডার হাটু পিক, সালি টিব্বা প্রভৃতির সঙ্গে নীচে সবুজ উপত্যকাকে নিয়ে এমন এক অপূর্ব সুন্দর কোলাজ তৈরি হয়েছে যে—স্টিল ও মন-ক্যামেরা, দু’টিতেই ছবি তুলে নিলাম প্রাণভরে।

কুনহু-ধার থেকে ফিরে এলাম কারসোগ বাজারেই। ভারী মনোরম এক উপত্যকা এই কারসোগ। প্রচুর পরিমাণে চাষবাস হয় এখানে। চাল, গম, ভুট্টা, ডাল, বেদানা, মটর প্রভৃতি নানা ধরনের চাষ হয় গোটা উপত্যকা জুড়ে। পাহাড়ের ধাপে ধাপে করা ধাপচাষ তো বটেই, বিস্তীর্ণ সমতল ভূমিতেও চাষাবাদের কাজ হয়। আর তাই গোটা উপত্যকা জুড়েই সবুজ ও হলুদের বহু রকম রঙের বৈচিত্র নজরে আসে। নাশপাতি, খশুবানি, পপলার গাছের উপস্থিতিও কম নয়। রিউনি নদী এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে উপত্যকার মধ্য দিয়ে। সব মিলিয়ে আদর্শ সুন্দর উপত্যকার এক অনবদ্য ছবি।

কারসোগ বাজারের বেশ কাছেই মামলেশ্বর শিবমন্দির। এর প্রাচীনত্ব তো চোখে দেখেই ঠাহর হচ্ছে, তবে মন্দিরকে জড়িয়ে গল্পের প্রাচীনত্ব আরও অনেক বেশি। রাবণ হত্যার পর রাবণের আত্মার মুক্তির জন্য রামচন্দ্র এই শিবমন্দির স্থাপন করেন। দ্বাপরে পাণ্ডবরাও অজ্ঞাতবাসকালে এসেছিলেন এই মন্দিরে। মন্দির-প্রাঙ্গণে রাখা বিরাটকায় ঢাকটা নাকি মধ্যম পাণ্ডব ভীমই বাজাতেন পুজোর সময়! মন্দিরের গর্ভগৃহে অষ্টধাতুর শিব-পার্বতীর মূর্তিটি বেশ অভিনব। আর একটি অত্যন্ত অভিনব জিনিসও দেখার সৌভাগ্য হল পূজারিকে বহু অনুরোধ-উপরোধ করে। সত্যযুগের সময়কার গমের দানা। বেশ বড় সাইজ আর বাদামি রঙা, দৈর্ঘ্যে প্রায় ৫ ইঞ্চি তো হবেই! রুপোর একটা ছোট বাক্সের মধ্যে রাখা। সত্যযুগে গমের দানাও তা হলে এত বড় ছিল? এ সব ভাবতে ভাবতেই পৌঁছে গেলাম তিন কিলোমিটার দূরে কাও গ্রামের কামাখ্যা মন্দিরে।

কাঠের তৈরি প্যাগোডাধর্মী এই মন্দিরের নির্মাণশৈলী খুব নজরকাড়া। মন্দিরের গায়ের কারুকার্যও দারুণ সুন্দর। জনশ্রুতি, মাতৃহত্যার পাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য দেবী কামাখ্যার সাধনায় পরশুরাম এখানে দীর্ঘ তপস্যা করেন। পরবর্তী কালে পাণ্ডবদের হাতে মন্দিরের সংস্কার ঘটে। গর্ভগৃহের ভিতর অষ্টধাতুর তৈরি মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গাই এখানে পূজিতা হচ্ছেন দেবী কামাখ্যারূপে। কামাখ্যা ছাড়া বিষ্ণু, ভৈরব ও অন্যান্য দেবতার বহু প্রাচীন মূর্তিও রয়েছে মন্দির প্রাঙ্গণে।

কামাখ্যা মন্দির দেখে চলে এলাম অর্ধন গ্রামের অর্ধনারীশ্বর মন্দিরে। কারসোগ বাজার থেকে দূরত্ব ৬ কিলোমিটার। সবুজ খেতের মধ্য দিয়ে হেঁটে যেতে হল শেষ পথটুকু। মন্দিরের অর্ধনারীশ্বর মূর্তিটি দেখবার মতো। প্রাঙ্গনে দণ্ডায়মান রাবণ-শাপে শাপগ্রস্তা শূর্পনখার প্রস্তরীভূত এক মূর্তি।

দিনের শেষ গন্তব্য জোহর গ্রামের পঞ্চমুখী মহাদেবের মন্দিরে পৌঁছে গেলাম এর পরেই। অর্ধন গ্রাম থেকে দূরত্ব ৫ কিলোমিটার। গর্ভগৃহে ৫টি শিবলিঙ্গ পূজিত হচ্ছেন পঞ্চমুখী মহাদেব রূপে। মন্দিরের পাশেই শ্মশান। পূজারি জানান, এই জায়গাই মহাভারতের সময় একচক্রা নগরী হিসেবে পরিচিত ছিল। অত্যাচারী বকাসুরকে ভীম বধ করেন এখানেই। সেই বকাসুরের ছিন্ন কলিজা পাথরে পরিণত হয়ে এখনও অবস্থান করছে মন্দির চত্বরে। পূজারি দেখালেন সিঁদুর মাখানো সেই পাথরের শিলা। ভীমের হাতে নিহত হওয়ার আগে বকাসুর প্রতি দিন এক জন করে গ্রামবাসীকে ভক্ষণ করত। যা নিয়ে গ্রামে রোজ চলত শোকপর্ব। সেই দুঃখের স্মৃতিই এখনও বহন করে চলেছে ‘কারসোগ’ নামের উপত্যকাটি— কেননা, ‘কার’ মানে রোজ এবং ‘সোগ’ মানে শোক। অর্থাৎ রোজকার শোক থেকেই এই উপত্যকার নাম হয়েছে কারসোগ।

কারসোগ ভ্যালি দেখে সন্ধ্যার আগেই ফিরে এলাম চিন্ডিতে। আজ রাতটাও এখানে কাটিয়ে কাল চলে যাব মানালির পথে। চিন্ডির ফুরফুরে আবহাওয়ায় ব্যালকনিতে কফি খেতে খেতে ভাবছি, পর্যটকহীন, দূষণহীন কারসোগ ভ্যালির এই যে মিষ্টত্ব— এ তো শিমলায় পাইনি, নিশ্চিত ভাবেই মানালিতেও পাব না। সত্যি বলতে কী, কোনও জনপ্রিয় হিল স্টেশনেই তা পাওয়া যাবে না। কেননা, সে মিষ্টত্বের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে অকৃত্রিম নানা রসালো উপাদান, অনাবিল নানা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, রোমাঞ্চকর পুরাণ মহাভারতের গল্প, স্থানীয়দের সহজ-সরল আপ্যায়ন এবং আরও কত কী!

 

কীভাবে যাবেন

শিমলা থেকে গাড়ি ভাড়া করে ১১৫ কিলোমিটার দূরত্বের কারসোগ ভ্যালি পৌঁছনোই সুবিধাজনক। ২-৩ দিনে কারসোগ ভ্যালি দেখে ইচ্ছামতো যান যে-কোনও জায়গায়। লুরি, রামপুর হয়ে কিন্নরের পথে। কিংবা রোহনগালু পানডো হয়ে মানালির পথে। হাতে অত সময় না থাকলে ফিরেও আসতে পারেন শিমলাতে। টানা গাড়ি রিজার্ভ করলে প্রতি দিনের গাড়িভাড়া পড়বে: ছোট গাড়ির (ইন্ডিকা, ইন্ডিগো, অল্টো) জন্য ১৮০০-২০০০ টাকা। আর বড় গাড়ির (সুমো, ইনোভা, স্করপিও) জন্য ২৬০০-২৮০০ টাকা।

গাড়ি বুকিংয়ের জন্য: ০৯৪৫৯৩১১৩৬৮, ০৯৮১৬৪০৪৭৯৩।

কোথায় থাকবেন: অধিক উচ্চতার চিন্ডিতে রাত্রিবাস করে, কারসোগ ঘুরে নেওয়াটাই উচিত হবে। চিন্ডিতে থাকার জন্য: গোপাল অ্যাপল ভ্যালি রিসর্ট: দ্বিশয্যা ঘরভাড়া ৮০০-১২০০ টাকা, সুইটের ভাড়া ১৫০০-২০০০ টাকা। ফোন: ০৯৪১৮৩৪২৯৯৯। কারসোগে থাকার জন্য: হোটেল সিটি হার্ট: দ্বিশয্যার ঘরভাড়া ৭০০-১০০০ টাকা।

ফোন: ০৯১২৯১-২২৪২৬

 

 

ছবি: লেখক।