এক নিঝুমপুরী। কুয়াশার আস্তরণ কখনও পুরো, কখনও হাল্কা। ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগেই বেরিয়ে পড়া। কলকাতা থেকে প্রায় ১২০ কিমি। সবচেয়ে আরামপ্রদ ট্রেন জার্নি। তাই হাওড়া থেকে হাওড়া-কাটোয়া লোকাল। ঘণ্টা সাড়ে তিনেকের ট্রেন ভ্রমণ। হুগলি পেরিয়ে ঢুকে পড়লাম বর্ধমান জেলায়। পূর্বস্থলী স্টেশনে নেমে চেপে বসলাম টোটোয়। অলিগলি , এই পাড়া, সেই মহল্লা পেরোতেই বদলে গেল প্রকৃতির চালচিত্র। ফুরফুরে মিষ্টি বাতাস ধেয়ে এলো। সরু পাকা রাস্তার শেষে বিশাল এক হ্রদ। আর তার পাড়ে, সুন্দর সাজানো পার্ক। নানা রঙিন ফুলের বাহার। সুন্দর হ্রদের বুকে আধো কুয়াশা জমাট বেঁধেছে। প্রায় ১১ কিমি দীর্ঘ এই লেকের বুকে ভেসে বেড়ায় নানা পরিযায়ীর দল।

বিশাল চরের নাম চুপি। প্রচুর পাখি লেকের আনাচে-কানাচে ভেসে বেড়ায়। তাদের দেখতে পক্ষিপ্রেমীরা ছুটে আসেন বারে বারে। ঘাটের পাড় জুড়ে ছোট ছোট ডিঙি দাঁড়িয়ে আছে। আগে থেকে বলে রাখা ছিল জয়ন্ত প্রামাণিককে। সারা বছর মাছ ধরেন আর পর্যটকদের পাখি দেখান। হাতের তালুর মতো লেকের প্রতিটি আনাচ-কানাচ তাঁর চেনা। প্রতিটি পাখির বিজ্ঞানসম্মত নাম সমেত তাদের ঠিকানা একেবারে নখদর্পণে। নরম ভোরের আলো গায়ে মেখে ভেসে পড়লাম। বিশাল জলাশয়ের বুকে ভেসে পড়তেই তিরতিরে জল কেটে এগিয়ে চলল ডিঙি। হ্রদের টলটলে জল কেটে খানিক যেতেই চোখে পড়ল লেসার হুইসলিং ডাকের দল। একটা-আধটা নয়, ঝাঁকে ঝাঁকে। তাদের ডানার কালচে, লাল আর খয়েরি রঙের বাহার দেখতে দেখতে চোখ জুড়িয়ে গেল। পাখির চোখ বলে কথা, ‘কমন স্নাইম’ তার লম্বা চঞ্চুতে মাছ পুরে ফেললো। আর ছোট ছোট বিদেশি হাঁসের দল। লিটল গ্রিব। জল কেটে  ক্ষণিকের চলন, তারপর আবার দে ডুব। ডুবসাঁতার দিয়ে উঠতেই তাদের শরীরে পিছলে পড়ে জলের কণা। এ সৌন্দর্য না দেখলে অনেক কিছুই অদেখা থেকে যায়। তারপর নজরে এলো প্রায় ৫-৬ প্রজাতির মাছরাঙাদের। তাদের স্ক্যানারে স্বচ্ছ জলে মাছেদের আনাগোনায় কড়া নজর। নাগালে আসতেই ঝুপ করে ডুব দিয়ে মাছের ঝাঁক থেকে নিজের পছন্দের মাছটি মুখে নিয়ে দে ছুট।

ছোট নীল মাছরাঙা

এ বার নিঃশব্দে আধ ডোবা বাঁশের মাথায় নজরে এল এক শিকারি পাখির। সে-ও শিকারের সন্ধানে। সাদা শরীরে লাল চোখ দেখেই বুঝে নিতে হয় তার ক্ষিপ্রতা। ভাল করে লক্ষ্য করে দেখি তার হলদেটে  ক্ষুরধার নখ বাঁশের খুঁটিতে ধার করতে ব্যস্ত। জলে ভেসে আছে লিটল গ্রীবের দল। খয়েরি রঙে মিশেছে সাদা পোচ। ছোট্ট চেহারায় ক্ষিপ্রতা অসাধারণ। রোদ্দুরের তেজ কমে এখন নরম আলোয় বালি হাঁসের দল সূর্যের নরম আলো মাখতে মাখতে ঘরে ফিরে চলেছে। একসময় প্রচুর পাখি মারত গ্রামের লোকজন। ধীরে ধীরে ফিরেছে সচেতনতা, দূর হঠেছে ব্যাধের দল। আজ চুপির চরে প্রচুর পর্যটক আসেন। বেড়েছে সচেতনতা। নৌকায় পর্যটকদের নিয়ে ঘুরে বেড়ান। ঘণ্টা পিছু ১৫০ টাকা ভাড়া নেন মাঝিরা। এরাই হদিশ জানেন পাখিদের । কোন পাখি কখন কোথায় বসে, কোথায় থাকে। এ বার আকাশের সীমানায় লালচে গোল সূর্য ঝুপ করে ডুব দিলো চুপির চরে। লালচে আভাময় কালচে-নীল আকাশের বুক জুড়ে পাখিদের ঘরে ফেরার গান শুনতে শুনতে সন্ধ্যে ঘনিয়ে এলো। এ বার আমাদেরও ঘরে ফেরার পালা।

মাঠচিল

কী ভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে চুপির চরের দূরত্ব প্রায় ১২০ কিমি। হাওড়া থেকে কাটোয়া লোকালে পূর্বস্থলী নেমে টোটোতে চলে আসা যায় চুপির চর। গাড়িতে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে নবদ্বীপ হয়ে পারলিয়া মোড় হয়ে পূর্বস্থলী চলে আসতে পারেন। নৌকার জন্য যোগাযোগ করতে পারেন জয়ন্ত হালদারের সঙ্গে। ফোন: ৯৭৩৪৪৬৫৯৭৪।

কোথায় থাকবেন: এখানে থাকার জন্য জেলা পরিষদের অতিথি নিবাস। দুটি ঘর রয়েছে, ভাড়া ৫০০ টাকা। রাতের খাবার আগে বলে রাখতে হয়।

 

ছবি: লেখক