ব্যঙ্গচিত্রের বিরোধিতায় উড়ে এসেছিল বুলেট। সেই বুলেটের জবাবে ফের ব্যঙ্গচিত্র! তাতে এক মৌলবাদী নেতার ছবি দিয়ে লেখা, “শুভেচ্ছা রইল।”

গতকাল হামলার কিছুক্ষণ পরেই নিজেদের সাইটে এমন ছবি দিয়েছিল ফরাসি সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘শার্লি এবদো।’ দুনিয়া তখন সবেমাত্র জেনেছে, এ হামলার নেপথ্যে থাকতে পারে আইএস নেতা আবু বকর আল বাগদাদির শিষ্যরা। শার্লি এবদো-র অবশ্য তাতেও হেলদোল নেই। পুরনো ছন্দেই নিজেদের সাইটে ফের বাগদাদির ব্যঙ্গচিত্র দেয় তারা। সঙ্গে ছিল ওই আইএস নেতার জন্য শুভেচ্ছাবার্তা।

এবং এ ধারা যে জারি থাকবে তা আজ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন পত্রিকার কর্মীরা। তাঁদের প্রতিজ্ঞা, যে কোনও মূল্যে আগামী বুধবার পত্রিকার সংস্করণ প্রকাশ করবেন তাঁরা। এ নিয়ে আগামিকালের বৈঠকে হাজির থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পত্রিকার প্রাক্তন কর্মীরাও। সকলের একই যুক্তি, জঙ্গি-বুলেটের কাছে কোনও ভাবে মাথা নোয়াবে না ব্যঙ্গচিত্রশিল্প। কাগজ-কলম-পেন্সিলের প্রতিবাদ চালিয়ে যেতেই আগামী বুধবারের সংস্করণ প্রকাশের কাজ শুরু করছেন তাঁরা। শার্লি এবদো-র প্রাক্তন সাংবাদিক ক্যারোলিন ফ্যুরে বললেন, “আমাদের আরও দশ জনকেও যদি ওরা মেরে ফেলে, তার পরও আগামী সপ্তাহে কাগজ বেরনো আটকাতে পারবে না।”

বাস্তবিক। ওই পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক স্তেফান শার্বনেয়ারই তো বলতেন, “হাঁটু মুড়ে বাঁচার চেয়ে সোজা দাঁড়িয়ে মরা ভাল।” সে দর্শন মেনে শত হামলার মুখেও যে মাথা ঝোঁকানো হবে না, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন ব্যঙ্গচিত্রশিল্পীরা। না-ই বা থাকলেন শার্বনেয়ার, কলম-পেন্সিল-কাগজ তো রয়েছে।

সেই কাগজেই আজ একের পর এক প্রতিবাদের ছবি ভেসে উঠেছে। কোথাও দেখা যাচ্ছে, কালাশনিকভ-হাতে দাঁড়িয়ে থাকা জঙ্গির দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে ধেয়ে আসছে অগুনতি পেন। কোথাও আবার মিনারের মতো উঁচু পেন্সিলকে গুঁড়িয়ে দিতে ধেয়ে আসছে জঙ্গি-বিমান। অনেকটা ঠিক ৯/১১ হামলার ধাঁচে। গত কালের হামলার সঙ্গে অনেকেই ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে জঙ্গি হামলার তুলনা টেনেছিলেন। এ দিন সেই তুলনাই ফুটে উঠেছে ব্যঙ্গচিত্রে। কোথাও আবার গুলির আঘাতে দু’টুকরো হয়ে যাওয়া পেন্সিলের ছবি। শিল্পী অবশ্য তার পরেই এঁকে দিয়েছেন আরও একটা ছবি। সেখানে দেখা যাচ্ছে, পেন্সিলের ভাঙা টুকরো থেকেই নতুন শিষ বেরিয়ে এসেছে। অর্থাৎ প্রতিবাদের পেন্সিল আঁকিবুঁকি কাটবেই। কোথাও আবার কালাশনিকভের ধাঁচে তৈরি হয়েছে পেন্সিল। শুধু গুলির বদলে তা থেকে বেরোবে ছবি ও শব্দ। কোনওটাতে দেখা যাচ্ছে, জঙ্গিদের গুলি যতই শার্লি এবদো-কে লক্ষ্য করে ধেয়ে আসুক না কেন, তা লাগছে গিয়ে এক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের গায়েই।

দিনভর এমনই সব ব্যঙ্গচিত্রে ভেসে গিয়েছে টুইটার, ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম। হাজারো, লাখো ‘লাইক’ আর সঙ্গে ‘কমেন্ট’-এর বন্যায় উপচে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। ব্যঙ্গচিত্রশিল্পী থেক শুরু থেকে সাধারণ মানুষ ‘নেট-সাম্রাজ্যে’ আজ প্রতিবাদের ছড়াছড়ি। প্রত্যেকেই লিখছেন, ‘#জো সুই শার্লি এবদো।’ ইংরিজি করলে দাঁড়ায় ‘আই অ্যাম শার্লি এবদো’। কেউ কেউ আবার এই বার্তাকেই নিজেদের প্রোফাইলের ছবি করেছেন। উদ্দেশ্য একটাই। জঙ্গিদের বার্তা দেওয়া ‘একটি পত্রিকার দফতর শেষ করার চেষ্টায় বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শার্লি এবদোর জন্ম দিয়েছো তোমরা।’

এঁদেরই অনেকে আজ রাস্তায় নেমেছিলেন। শুধু ফ্রান্সেই এ দিন এক লক্ষেরও বেশি মানুষ মিছিল করেন। গত কাল প্যারিসের যেখানে জঙ্গি-হানা ঘটেছিল, সেখানে পেন-পেন্সিল-কাগজ রেখে আসেন তাঁরা। নতর-দাম গির্জায় টানা দশ মিনিট ধরে ঘণ্টা বাজে আজ। শুধু প্যারিস কেন, রাস্তায় নেমেছিলেন লন্ডন, বার্লিন, মাদ্রিদ, ব্রাসেলসের বহু বাসিন্দাও। ছোট ছোট ফরাসি পতাকা হাতে সান ফ্রান্সিসকোয় ফ্রান্সের কনস্যুলেটের সামনেও ভিড় জমান অনেকে। তাঁদের কারও হাতে মোমবাতি, কারও পেন, কারও পেন্সিল, কারও আবার কাগজ। কেউ কেউ আবার প্ল্যাকার্ড ধরে রেখেছেন। তাতে লেখা, “আমরা ভয় পাইনি।”

সকলেই শার্বনেয়ারের কথা রেখেছেন। সন্ত্রাসের মুখেও প্রতিবাদ থামাচ্ছেন না। গুলির সামনেও লাগাম পরাচ্ছেন না কলম-পেন্সিলে।