মডেল হওয়ার জন্য ২০১৭-র ১০ জুলাই ব্রিটেন থেকে ইতালির মিলানে এসে পৌঁছন বছর কুড়ির এক তরুণী। নাম ক্লোয়ি এলিং। কিন্তু এর দিন কয়েক পর বাক্সবন্দি অবস্থায় তুরিন থেকে ওই তরুণীকে উদ্ধার করে পুলিশ। গ্রেফতার করা হয় লুকাস পাওয়েল হারবা নামে এক ফটোগ্রাফারকে।

তদন্তে উঠে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা যায়, ডার্ক ওয়েবে একটি  পর্নোগ্রাফি সাইটে চড়া দামে ক্লোয়িকে বেচে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল লুকাস।

ফটোশুটের জন্য ওই তরুণীকে মিলানে নিজের অ্যাপার্টমেন্ট-এ আসতে বলেছিলেন লুকাস। ক্লোয়ি ঘরে ঢোকা মাত্রই দরজা বন্ধ করে তাঁর উপর ঝাপিয়ে পড়ে দুই যুবক। পুলিশের কাছে ক্লোয়ি জানিয়েছেন, তাঁকে জোর করে ড্রাগ খাওয়ানো হয়। মুখ, হাত-পা বেঁধে একটি বড় স্যুটকেসের ভিতরে তাঁকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।


এ ভাবেই সুটকেসের ভিতরে বেঁধে রাখা হয়েছিল তাঁকে

ইতালির পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এই ডার্ক ওয়েবে এক জন যৌনদাসী হিসেবে তাঁর দর উঠেছিল প্রায় ৩ লক্ষ ডলার। অর্থাত্, ভারতীয় মূল্যে যা প্রায় ১ কোটি ৯৩ লক্ষ টাকার সমান।

আরও পড়ুন: ইসলাম অবমাননার অভিযোগে খুন, অভিযুক্তকে ফাঁসির সাজা পাক আদালতে

এ বার জেনে নেওয়া যাক ওয়েব দুনিয়ার বিভিন্ন স্তরের খুঁটিনাটি।

সারফেস ওয়েব: ৪ শতাংশ

• মোট ওয়েব সার্চের মাত্র ৪ শতাংশ এই সারফেস ওয়েব-এর মধ্যে পড়ে। এর মধ্যে রয়েছে আমাদের যাবতীয় সাধারণ অনলাইন সার্চ, যেমন গুগল সার্চ, উইকিপিডিয়া ইত্যাদি।

ডিপ ওয়েব: ৯০ শতাংশ

• সার্চ ইঞ্জিনের সাহায্যে খুঁজে পাওয়া যায় না এমন সমস্ত ওয়েবসাইট ডিপ ওয়েবের অন্তর্ভুক্ত। ডিপ ওয়েবের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে ডার্ক ওয়েবও। ওয়েব দুনিয়ায় প্রকাশ্যে আসার আগে যে কোনও ওয়েবসাইটের নানা ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা করা হয়। সে সময় সার্চ ইঞ্জিন যাতে ওই ওয়েবসাইটগুলিকে খুঁজে না ফেলে সে দিকে লক্ষ্য রাখা হয়। ফলে ডিপ ওয়েবে এমন কোটি কোটি সাইট রয়েছে যা সার্চ ইঞ্জিনের মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ওয়েবসাইট, গুরুত্বপূর্ণ মেডিক্যাল রেকর্ড, বিভিন্ন গবেষণামূলক নথি, গুরুত্বপূর্ণ আইনি নথি, যা পাসওয়ার্ড, ফেস ডিটেকশন-সহ একাধিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকে।

ডার্ক ওয়েব: ৬ শতাংশ

• এমন অসংখ্য ওয়েবসাইট রয়েছে যেগুলি আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। গুগ্‌ল ক্রোম বা ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারের মতো পরিচিত ব্রাউজার অথবা চেনাজানা সার্চ ইঞ্জিনের মাধ্যমে এতে ঢুকতে পারবেন না নেট ব্যবহারকারীরা। একটি এনক্রিপটেড নেটওয়ার্কের মধ্যেই রয়েছে এই ওয়েবের কালো দুনিয়া বা ডার্ক ওয়েব। অসংখ্য এমন ওয়েবসাইট রয়েছে যা ওই এনক্রিপটেড নেটওয়ার্কের ঘেরাটোপে লুকিয়ে রয়েছে। এনক্রিপটেড থাকায় তা সুরক্ষার একাধিক স্তরের আড়ালে রয়েছে।

‘টোর এনক্রিপশন টুল’-এর সাহায্যে এ ধরনের প্রায় সমস্ত ওয়েবসাইটগুলি ওয়েব দুনিয়া থেকে নিজেদের লুকিয়ে (হিডেন) রাখে।

তা হলে ওই ওয়েবসাইটগুলিতে ঢোকা কী ভাবে যায়? ওয়েব ব্যবহারকারীকে ‘টোর এনক্রিপশন টুল’-এর সাহায্য নিতে হবে। ‘টোর’ ছাড়াও ‘সিল্ক রোড রিলোডেড’এ-র মতো ‘আই২পি’ সার্ভিসের সাহায্যেও ডার্ক ওয়েবে ঢোকা যায়। তবে যে কোনও ইউজারই এই টুল ব্যবহারে দক্ষ নন। ফলে তা ব্যবহার করতে পারেন না। এবং এর মধ্যে নিজের আইডেন্টিটি প্রকাশ্যে এসে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

ডার্ক ওয়েবে ঢুকতে গেলে কোনও নির্দিষ্ট সাইট যে এনক্রিপশন টুল ব্যবহার করছে, ইউজারকেও সেই একই টুল ব্যবহার করতে হবে। তা ছাড়া, ওই নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটির অ্যাড্রেসও জানতে হবে।

যাবতীয় বেআইনি কার্যকলাপ যেমন, মাদক চোরাকারবারের ওয়েবসাইট, নিষিদ্ধ পর্ন ওয়েবসাইট, নিষিদ্ধ অনলাইন গেম অ্যাডমিন (যেমন ব্লু হোয়েল) ইত্যাদি এই ডার্ক ওয়েবের আওতায় পড়ে।

এই ডার্ক ওয়েবেই এই তরুণীকে যৌনদাসী হিসেবে বিক্রি করে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

এই তরুণীর মতো এই প্রজন্মের অনেকেই ডার্ক ওয়েব দুনিয়ার ফাঁদে পা দিয়ে হারিয়ে গিয়েছে চিরতরে। সাম্প্রতিক অতীতে গোটা বিশ্বে আতঙ্ক সৃষ্টি করা ব্লু হোয়েল গেমটিও এই ডার্ক ওয়েব দুনিয়ারই একটা অংশ। এই ডার্ক ওয়েবের সাইটগুলিকে খুঁজে পাওয়া বেশ মুশকিল। তাই ডার্ক ওয়েবের সাইটগুলির সঙ্গে যুক্ত এই অপরাধীদের নাগাল পাওয়াও খুব কঠিন। বর্তমান বিশ্বের একাধিক রাষ্ট্রের তাই মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ডার্ক ওয়েব।