আমার প্রিয় আমেরিকাবাসী, মিশেল আর আমি গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আপনাদের শুভেচ্ছায় আপ্লুত। আজ আমার ধন্যবাদ বলার পালা।...

এই শিকাগো শহরই আমাকে শিখিয়েছিল, সাধারণ মানুষ যখন এগিয়ে আসেন, দাবি তোলেন, একমাত্র তখনই কোনও পরিবর্তন আসে। আট বছর প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করার পর আমি এখনও সেই কথাটাই বিশ্বাস করি।...

হ্যাঁ, আমাদের অগ্রগতি সব সময় সমান নয়। গণতন্ত্রের কাজটা যথেষ্ট কঠিন।...যদি আট বছর আগে আমি বলে থাকি, আমেরিকা মন্দা কাটিয়ে উঠবে, গাড়ি শিল্প বেঁচে উঠবে, কর্মসংস্থান হবে— যদি বলে থাকি কিউবার সঙ্গে নতুন পর্ব শুরু করব, একটাও গুলি না ছুড়ে ইরানে পরমাণু অস্ত্র তৈরি বন্ধ করব, ৯/১১-র পাণ্ডাকে ধরব— যদি বলে থাকি বৈবাহিক আইনে সমতা আসবে, দু’কোটি নাগরিক স্বাস্থ্যবিমার আওতায় ঢুকবেন— আপনারা বলতেই পারতেন বড্ড বেশি ভাবছি।

কিন্তু এটাই আমরা করতে পেরেছি। আপনারা করতে পেরেছেন। আপনারাই পরিবর্তন।

আমাদের যুবসমাজ, আমাদের উদ্দীপনা, আমাদের বৈচিত্র আর খোলা মন, নিত্যনতুন ঝুঁকি নেওয়া আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার অসীম ক্ষমতা বলছে ভবিষ্যৎটা আমাদেরই। কিন্তু সেটা সম্ভব হবে যদি গণতন্ত্র অক্ষুণ্ণ থাকে। যদি রাজনীতিতে নাগরিক পরিশীলনের ছাপ থাকে। যদি দলীয় আনুগত্য এবং স্বার্থগোষ্ঠীর বাইরে বেরিয়ে অভিন্ন লক্ষ্য স্থির করতে পারি। এটা এখন বড্ড দরকার।...

সকলের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগসুবিধার ব্যবস্থা ছাড়া কিন্তু গণতন্ত্র টেঁকে না।...বাস্তবে অর্থনীতি যতটা এগিয়েছে, সেটা যথেষ্ট নয় জানি। দেশের মধ্যবিত্ত সমাজ এবং মধ্যবিত্ত হয়ে ওঠার সিঁড়িতে যাঁরা দাঁড়িয়ে, তাঁদের বাদ দিয়ে মুষ্টিমেয়র উন্নতি হলে অর্থনীতির সার্বিক বিকাশ তো হবেই না। গণতন্ত্রের পক্ষেও  ক্ষতি হবে। এখানে জনসংখ্যার এক শতাংশের হাতে প্রচুর সম্পদ অথচ প্রত্যন্ত গ্রাম ও শহরগুলোয় বহু মানুষ পিছনে পড়ে আছেন।

এ সব সমস্যার সমাধান চটজলদি হয় না। বাণিজ্য শুধু মুক্ত নয়, ন্যায়নিষ্ঠ হওয়া দরকার। আগামী দিনে আমাদের অর্থনৈতিক বিপদ বাইরে থেকে নয়, আসবে ভিতর থেকে। অটোমেশনের দুরন্ত গতিতে মধ্যবিত্ত সমাজের বড় অংশ কাজ হারাবেন। সেই কারণে আমাদের কর্তব্য শিশুদের উপযুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করা, ভাল মাইনের দাবিতে ইউনিয়ন গড়ার জন্য শ্রমিকদের ক্ষমতা দেওয়া, সামাজিক নিরাপত্তা উন্নত করা। সেই সঙ্গে কর ব্যবস্থার সংস্কার যাতে যে ব্যক্তি বা সংস্থা অর্থনীতির সুফল ভোগ করছেন, তাঁরা যেন দায় এড়াতে না পারেন।...

আমাদের গণতন্ত্রের জন্য দ্বিতীয় যে সমস্যাটা আছে, সেটা এই দেশের জন্মকাল থেকেই আছে। আমি নির্বাচিত হওয়ার পরে অনেকে মনে করেছিলেন, এ দেশে জাতিবিদ্বেষের অবসান হল। সেই ভাবনার মধ্যে সদিচ্ছা যতই থাক, বাস্তবতা ছিল না। জাতি ও বর্ণ বিদ্বেষ এখনও এ দেশকে বিভক্ত করে রেখেছে।

নিশ্চয়ই গত দশ, কুড়ি বা তিরিশ বছরের তুলনায় অবস্থা অনেক পাল্টেছে। কিন্তু আরও অনেক কিছু করার আছে। অর্থনীতির প্রতিটি প্রশ্নকে যদি পরিশ্রমী শ্বেতাঙ্গ মধ্যবিত্ত বনাম অযোগ্য সংখ্যালঘু ভিন্ জাতের লড়াই বলে দেখানোর চেষ্টা হয়, তা হলে শেষ অবধি ধনীরা আরও ধনী হবেন। খুদকুঁড়োর জন্য বাকিরা ঝগড়া করে মরবেন।...

চাকরিবাকরি, থাকার জায়গা, স্কুল-কলেজ, ফৌজদারি আইন—সর্বত্র বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে আমাদের মনোযোগী হতে হবে। শুধু আইন নয়, হৃদয়ের পরিবর্তন দরকার। সেটা এক দিনে হয় না।... শ্বেতাঙ্গদের বুঝতে হবে সংখ্যালঘুদের প্রতিবাদ মানেই পাল্টা বিদ্বেষ নয়, শৌখিন ‘পলিটিকাল কারেক্টনেস’ নয়। তাঁরা কোনও বিশেষ সুবিধা চাইছেন না। শুধু প্রতিশ্রুত সমানাধিকার দাবি করছেন।... দেশীয় মার্কিনদের মনে রাখতে হবে ভিন্‌দেশি নবাগতরা এসে দেশের ক্ষতি হয়নি। লাভ হয়েছে।...

কাজটা সহজ নয়। কারণ আমরা বেশির ভাগই আজকাল আমাদের নিরাপদ বুদ্বুদ-বলয়ে ঢুকে থাকতে অভ্যস্ত। সেটা পাড়া হোক, কলেজ ক্যাম্পাস হোক, ধর্মস্থান হোক বা সোশ্যাল মিডিয়া। আমাদের ঘিরে থাকে আমাদেরই মতো দেখতে মানুষেরা, যারা আমাদের মতো একই ধরনের রাজনীতির শরিক। ফলে আমাদের ধ্যানধারণা কখনও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে না। আমরা আমাদের বুদ্বুদের মধ্যে নিজেদের এত সুরক্ষিত ভাবতে শুরু করি যে শুধু সেই সব কথাতেই কান দিই, যেগুলো আমাদের সঙ্গে মেলে।...যুক্তি আর উদ্যোগের প্রতি বিশ্বাস, বাহুবলের উপরে মানবাধিকারকে জায়গা দিয়েই আমাদের দেশ ফ্যাসিবাদ এবং স্বৈরতন্ত্রকে প্রতিরোধ করেছিল। কিন্তু আজ সেই ভিতটায় আবার আঘাত আসছে। এক দল হিংস্র উন্মাদ ইসলামের নামে খেপে উঠেছে। সেই সঙ্গে অন্য দেশের স্বৈরতান্ত্রিক শাসকরা মুক্ত গণতন্ত্র এবং নাগরিক সমাজকে তাদের বিপদ বলে গণ্য করছে। মুক্ত চিন্তা এবং বিপরীত মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা... গণতন্ত্রের কাছে এই বিপদটা গাড়িবোমা বা ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর।...

আমাদের সংবিধান আমাদের জন্য এক অসামান্য উপহার। কিন্তু এমনিতে সেটা কাগজের টুকরো মাত্র। তার নিজের কোনও ক্ষমতা নেই। আমরা নাগরিকরাই তাকে ক্ষমতা দিই, তাকে অর্থবহ করে তুলি।...জর্জ ওয়াশিংটন তাঁর শেষ বক্তৃতায় বারবার বলেছিলেন দেশবাসীর পবিত্র ঐক্যবন্ধনকে নষ্ট করার চেষ্টাকে অঙ্কুরে বিনাশ করতে হবে।...আমরা সেই বন্ধনকেই দুর্বল করে তুলব যদি আমাদের রাজনীতির ভাষা কদর্যতায় ঢেকে যায়। সচ্চরিত্র নাগরিকরা তা হলে আর সরকারি কাজে যোগ দেওয়ার কথা ভাববেন না।

নাগরিকবৃন্দ, গণতন্ত্রে আপনাদের সঙ্গে পাওয়াটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। শুধু ভোটের সময় নয়, সারা জীবন জুড়ে। যদি কোথাও কিছু মেরামত করার থাকে, জুতোর ফিতে বাঁধুন। সবাইকে জড়ো করুন। যদি জনপ্রতিনিধি আপনাকে হতাশ করেন, ক্লিপবোর্ড হাতে নিন। সই সংগ্রহ করুন। নিজেরা এগিয়ে যান।

প্রিয় আমেরিকাবাসী, আপনাদের কাজে লাগতে পেরে আমি ধন্য। বাকি জীবনটাও আপনাদের সঙ্গেই থাকব। কিন্তু তার আগে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার শেষ অনুরোধ— আট বছর আগের একটা দিন যা বলেছিলাম, আজও তাই বলছি— পরিবর্তন আনার ভরসা রাখুন। আমার উপরে নয়, নিজেদের উপর।

ইয়েস উই ক্যান। ইয়েস উই ডিড। ইয়েস উই ক্যান।

ধন্যবাদ। ঈশ্বর আপনাদের মঙ্গল করুন। আমেরিকার মঙ্গল হোক।

(বিদায়ী বক্তৃতার নির্বাচিত অংশ)