ক্লিন চিট পেলেন না পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। পানামা পেপার্স কাণ্ডে তাঁর বিরুদ্ধে যে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, সেই অভিযোগের তদন্তের নির্দেশ দিল পাক সুপ্রিম কোর্ট। যৌথ তদন্তকারী দল (জেআইটি) গঠন করেছে আদালত। নওয়াজ শরিফকে সেই তদন্তকারী দলের সামনে হাজিরা দিতে হবে এবং জেরার মুখোমুখি হতে হবে। ৬০ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জেআইটি-কে।

সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর প্রধানমন্ত্রী পদে নওয়াজের আর থাকা উচিত কি না, তা নিয়ে পাকিস্তানে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। ২০১৬ সালে ফাঁস হওয়া পানামা পেপার্স থেকে জানা গিয়েছিল, নওয়াজ শরিফের পরিবারের সদস্যদের নামে বিদেশে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি রয়েছে। তার প্রেক্ষিতেই সুপ্রিম কোর্টে দুর্নীতি মামলা শুরু হয়। নওয়াজকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাজ চালাতে দেওয়া হবে, না কি ওই পদে থাকার অযোগ্য বলে ঘোষণা করে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হবে, বেশ কিছু দিন ধরে সে দিকেই তাকিয়ে ছিল গোটা পাকিস্তান।

প্রধানমন্ত্রী পদ ছেড়ে যদি সরে দাঁড়ান নওয়াজ, তা হলেও সরকার তাঁর দলের হাতেই থাকবে। বাইরে থেকে তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন সরকারকে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে সেনার ভূমিকা কী হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে কোনও কোনও শিবিরের। —প্রতীকী ছবি।

পানামার ল ফার্ম মোসাক ফনসেকা-র প্রায় ১ কোটি ১৫ লক্ষ গোপন নথি ফাঁস হয়ে গিয়েছিল গত বছর। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ধনী ও ক্ষমতাবানদের নামে ভিনদেশে নামে-বেনামে কত সম্পত্তি রয়েছে, সেই তথ্য প্রকাশ হয়ে পড়েছিল পানামা পেপার্স ফাঁস হওয়ায়। সেই তালিকায় নওয়াজ শরিফের নামও ছিল। তাঁর চার সন্তানের নামে বিদেশে প্রচুর সম্পত্তি রয়েছে বলে পানামা পেপার্স থেকে জানা যায়। নওয়াজের যে মেয়েকে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী মনে করা হয়, সেই মরিয়মের সন্তানদের নামেও বিপুল সম্পত্তি বিদেশে রয়েছে বলে জানা যায়। ওই সব সম্পত্তি নওয়াজের দুর্নীতির ফসল, অভিযোগ করেন পাকিস্তানের বিরোধী দলনেতা ইমরান খান। নওয়াজকে বরখাস্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার দাবিতে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের প্রধান ইমরান খান সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। নওয়াজের বিরুদ্ধে আরও বেশ কয়েকটি আবেদন জমা পড়ে। সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি গ্রহণ করে এবং তার শুনানিও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেই শেষ হয়। আজ, বৃহস্পতিবার মামলাটির রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। নওয়াজকে ক্লিন চিট দেওয়া হল না। দেশের ফেডেরাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির অ্যাডিশনাল ডিরেক্টরের নেতৃত্বে যৌথ তদন্তকারী দল গঠন করল সর্বোচ্চ আদালত। দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখে ৬০ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হল।

পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দাবি, তিনি কোনও দুর্নীতি করেননি। শরিফ পরিবার শিল্পপতি। পারিবারিক ব্যবসার উপার্জন থেকেই বিদেশে সম্পত্তি কেনা হয়েছে বলে শরিফ পরিবারের দাবি। কিন্তু ইমরান খান-সহ নওয়াজ বিরোধীরা বলছেন, বিদেশে শরিফ পরিবারের এই সব সম্পত্তি আসলে দুর্নীতির ফসল।

সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষিত হওয়ার আগে পাকিস্তানে জল্পনা ছিল, নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে তদন্তের স্বার্থে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরিয়ে দিতে পারে সুপ্রিম কোর্ট। প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে কারওকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ পাক সুপ্রিম কোর্ট আগেও দিয়েছে। পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) ক্ষমতায় থাকাকালীন ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকে আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে প্রধানমন্ত্রী পদ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। সেই দৃষ্টান্ত তুলে ধরে পিপিপি-র শীর্ষনেতা তথা পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি বলেছেন, ‘‘সুপ্রিম কোর্ট যখন ইউসুফ রাজা গিলানিকে সরানোর নির্দেশ দিয়েছিল, আমরা তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করিনি। আমরা নতুন প্রধানমন্ত্রী বেছে নিয়েছিলাম। নওয়াজেরও সেই পথই অনুসরণ করা উচিত।’’

আরও পড়ুন: রেহাই পেলেন না আডবাণী

নওয়াজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার অযোগ্য বলে সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করেনি। তবে বিরোধী শিবির বলছে, অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত নওয়াজের। না হলে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত প্রভাবিত হবে। নওয়াজ যদি পদত্যাগ করেন, তা হলেও সরকারের সঙ্কট হওয়ার কথা নয়। নওয়াজের সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ। তিনি সরে গিয়ে নিজের পছন্দের কোনও ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী পদে বসাতে পারেন। কিন্তু পাকিস্তানের শাসন ব্যবস্থায় অত্যন্ত প্রভাবশালী যে সেনাবাহিনী, সেই সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক এখনও খুব মধুর নয়। এই পরিস্থিতিতে নওয়াজ দুর্বল হলে অসামরিক মন্ত্রিসভার পক্ষে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে বলে ওয়াকিবহাল মহলের মত।