জাপানি রাজকুমারীর বিয়ের রূপকথা ও কাহিনিতে কি ছেদ পড়তে চলেছে রূপকথার মতোই?

রাজকুমারী মাকোর রাজপথ কি জনপথে গিয়ে মিশছে না শেষমেশ?

প্রশ্ন উঠছে, কারণ, জাপানি রাজপ্রাসাদের ইম্পিরিয়াল হাউসহোল্ড এজেন্সি মঙ্গলবার একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, রাজকুমারী মাকো ও তাঁর প্রেমিক কেই কোমুরোর বিয়ের যাবতীয় অনুষ্ঠান স্থগিত রাখা হল। সেই বিবৃতিতে রাজকুমারী মাকো আর তাঁর অতি সাধারণ কেরানি প্রেমিক কেই কোমুরো, দু’জনের বক্তব্যই রয়েছে।

কেন বিয়ে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত?

ইম্পিরিয়াল হাউসহোল্ড এজেন্সির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘‘বিয়ের বিভিন্ন আচার, অনুষ্ঠান ও বিবাহিত জীবনের জন্য প্রস্তুতি নিতে দু’জনের কেউই এখনও যথেষ্ট সময় পাননি।’’

আরও পড়ুন- সাধারণ মানুষকে বিয়ে করে প্রাসাদ ছাড়ছেন জাপানের রাজকুমারী​

আর এক মাস পরেই মার্চে রাজকুমারী মাকো ও তাঁর প্রেমিক কোমুরোর বিয়ের এনগেজমেন্ট অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল সাড়ম্বরে। অনেক আগের ঘোষণা সত্ত্বেও জাপানি রাজপরিবারের কোনও বিয়ের অনুষ্ঠান আচমকা স্থগিত হওয়ার ঘটনা আর ঘটেনি বললেই চলে।

রাজপ্রাসাদের তরফে সরকারি ভাবে যে কারণই দেখানো হোক, কৌতূহল সর্বত্রই।

‘বোঝানো মুশকিল’ বলে এড়িয়ে গিয়েছেন ইম্পিরিয়াল হাউসহোল্ড এজেন্সির এক প্রবীণ অফিসার। যদিও যুবরাজ আকিশিনোর বড় মেয়ে ‘পাত্রী’ রাজকুমারী মাকো বলেছেন, ‘‘মনে হচ্ছে, আমরা একটু তাড়াহুড়ো করে ফেলেছি। আমাদের অপরিণতমনস্কতার জন্যই এটা ঘটেছে। এর জন্য আমরা দুঃখিত।’’

অ্যালবাম থেকে। ১৭ মে, ২০১৭: জাপানি রাজকুমারী মাকো ও তাঁর প্রেমিক কেই কোমুরোর ঘোষণা, ‘বিয়ে করছি।’

সত্যি সত্যিই কি ‘খুব তাড়াহুড়ো’ করে মাকো-কোমুরোর এনগেজমেন্টের দিন ঘোষণা করা হয়েছিল?

গত ১৭ মে জাপানি রাজপ্রাসাদের তরফে একটি বিবৃতিতে জানানো হয়, রাজকুমারী মাকো বিয়ে করবেন কেই কোমুরোকে। পাত্র কোমুরো টোকিওয় একটি ল’ফার্মে সাধারণ কেরানির চাকরি করেন। এ-ও জানানো হয়, রাজপ্রাসাদের যাবতীয় সুখ, বিলাস ছেড়ে রাজকুমারী মাকোর ‘রাজপথ’ গিয়ে মিশবে জনপথে। ‘স্বামী’ কোমুরোর সঙ্গে সাধারণ জীবনযাপন করবেন রাজকুমারী মাকো।

মানুষের ধারণা হয়েছিল, শৈশব থেকে প্রাসাদের বৈভব তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করার পর এ বার সম্ভবত বৈরাগ্য এসেছে তাঁর! তাই রাজপ্রাসাদের বিলাস বৈভবের মোহ ছেড়েছুড়ে তিনি মেতে গিয়েছেন আমজনতার স্রোতে। বিয়ে করতে চলেছেন এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেকে। পাত্র কেই কোমুরো তাঁর বহু দিনের প্রেমিক। কলেজে পড়তে পড়তেই তাঁর সঙ্গে আলাপ জাপানের রাজকুমারী মাকোর।

সে দিন অনেকেই মেনে নিতে পারেননি...

তবে জাপানি রাজবংশের বাইরে সাধারণ পরিবারের কাউকে বিয়ে করলেই তাঁকে বরাবরের জন্য রাজপ্রাসাদের যাবতীয় মোহ, সম্পত্তির অংশ পুরোপুরি ছেড়ে দিতে হয়। তিনি রাজা হোন, রাজপুত্র, রাজকুমারী হোন বা রাজপরিবারের যে কোনও সদস্যই হোন না কেন। জাপানের রাজবংশের এটাই নিয়ম।

টোকিওয় জাপানের রাজপ্রাসাদ। ছবি- সংগৃহীত।

তাই ভালবাসার টানে বরাবরের জন্য প্রাসাদ ছেড়ে রাজকুমারী চলে যাবেন সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে, সেটা মন থেকে সে দিন অবশ্য অনেকে মেনেও নিতে পারেননি।

জাপানি রাজকুমারীর বিয়ের রূপকথা ও কাহিনীর সেই শুরু। তার পর ৯ মাস তো খুব কম সময় নয়! মাকো-কোমুরোর এনগেজমেন্ট অনুষ্ঠান তো হওয়ার কথা ছিল মার্চে। প্রশ্ন উঠছে, তা হলে ‘খুব তাড়াহুড়ো’ কোথায়?

অন্য কোনও কারণ?

মঙ্গলবার বিকেলে সাংবাদিক সম্মেলনে ওই বিয়ে স্থগিত রাখার ঘোষণা করে ইম্পিরিয়াল প্রিন্সেস’ হাউসহোল্ড অ্যাফেয়ার্সের সুপারভাইজার তাকাহারু কাচি জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্রাট আকিহিতোর স্বেচ্ছায় সিংহাসন ছেড়ে দেওয়ার সময়সূচির সম্পর্ক রয়েছে।

শারীরিক অসুস্থতার কারণে, আগামী বছরে স্বেচ্ছায় সিংহাসন ছেড়ে দেওয়ার কথা জাপানের সম্রাট আকিহিতোর। গত বছর মে মাসেই সম্রাটের সেই ইচ্ছার কথা রাজপ্রাসাদের তরফে একটি বিবৃতিতে জানানো হয়েছিল।

৯ মাস পর রাজকুমারী মাকো বিয়ে স্থগিত রাখার কারণ দর্শাতে গিয়ে কেন বললেন, ‘খুব তাড়াহুড়ো করে ফেলছি আমরা। আমাদের অপরিণতমনস্কতার জন্য’, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

কয়েক মাস ধরে জাপানের সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন, ট্যাবলয়েডগুলিতে নিয়মিত ভাবে এই খবর বেরতে থাকে যে পাত্র কোমুরোর পরিবারের অর্থনেতিক অবস্থা মোটেই ভাল নয়।

আরও পড়ুন- ইসলাম অবমাননার অভিযোগে খুন, অভিযুক্তকে ফাঁসির সাজা পাক আদালতে​

ইম্পিরিয়াল প্রিন্সেস’ হাউসহোল্ড অ্যাফেয়ার্সের সুপারভাইজার কাচি অবশ্য সেই জল্পনা ধামাচাপা দিতে মঙ্গলবার বলেছেন, ‘‘বিয়ের ইচ্ছা থেকে কিন্তু কেউই সরে আসেননি।’

দু’জনের দু’টি পথ কি দু’টি দিকে গেল বেঁকে?’

সাংবাদিক সম্মেলনের পর সন্ধ্যায় রাজপ্রাসাদের গাড়িতে চেপে টোকিওর মিনাটো ওয়ার্ডের আকাসাকা এস্টেটে ফিরে যান রাজকুমারী মাকো। কালো পোশাক পরা রাজকুমারী মাকো এক বারও তাকাননি অপেক্ষারত সাংবাদিকদের দিকে। মাথা নিচু করে ঢুকে গিয়েছেন এস্টেটে।

তার ১০ মিনিট পর ‘পাত্র’ কোমুরোকে দেখা যায় টোকিওর চুও ওয়ার্ডে ঢুকতে। সেখানেই তাঁর ল’ফার্মের অফিস। কোমুরোও ছিলেন ভাবলেশহীন, অন্তত প্রকাশ্যে। আশপাশের কারও সঙ্গে কথা বলেননি। সাংবাদিকদের দেখে হাতও নাড়েননি।

তাই প্রশ্ন, আজ দু’জনের দু’টি পথ কি দু’টি দিকে গেল বেঁকে?

রাজপথ এসে মিশল না জনপথে?