লিও মেসির বার্সেলোনার পর মেসুত ওজিলের আর্সেনাল। প্যারিস সঁ জরমঁ-র কাছে ০-৪ গোলে উড়ে গিয়েছিল বার্সেলোনা। আর বায়ার্ন মিউনিখের সামনে ১-৫ গোলে দুরমুশ হল আর্সেনাল।

তারকাদের বিপর্যয়ের মধ্যেই কলকাতার ফুটবলভক্তদের জন্য উঠে আসছে আতঙ্কিত হওয়ার মতো তথ্য। বিদেশের সমস্ত ফুটবল লিগে এখন গোলের ছড়াছড়ি। আর আমাদের ফুটবলে চলছে গোল-খরা। প্রশ্ন উঠছে, দর্শকেরা কি এই কারণেই দেশের ফুটবল থেকে মুখ ঘুরিয়ে  চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ইপিএল বা লা লিগার মতো বিদেশি লিগ দেখার জন্য টিভি-র সামনে বসছেন? 

দু’দিনে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে শেষ ষোলো পর্বের চারটি ম্যাচে হয়েছে  মোট ১৫ গোল। গ্যালারি হাউসফুল। ভারতে আই লিগে সেখানে এক শিলিগুড়ির ডার্বি ছাড়া বাকি সমস্ত ম্যাচেই থাকছে ফাঁকা গ্যালারি। তাও ডার্বিতে গোলই হয়নি। এ মরসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এখন পর্যন্ত মোট গোল হয়েছে ২৯৩টি। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে চলতি মরসুমে মোট গোলের সংখ্যা ৭০৪। লা লিগায় এ মরসুমে এখন পর্যন্ত গোল হয়েছে ৬২৭টি। সেখানে আই লিগে গোলের সংখ্যা এখন পর্যন্ত মাত্র ৯৭। যদিও বহির্বিশ্বের লিগগুলি প্রায় শেষের দিকে। আই লিগে বড় দলগুলির হাতে রয়েছে ৯-১০টি করে ম্যাচ।   

আই লিগে খুব কম ম্যাচে লোকেরা পাঁচ গোল হতে দেখছে। এর কারণ কী? বোর্নমুথে এক সময় খেলা ইস্টবেঙ্গলের কোচ ট্রেভর জেমস মর্গ্যান বলছেন, ‘‘বাইরের লিগের সঙ্গে কোনও তুলনা হয় না। ওখানকার ফুটবলাররা বিশ্বকাপের তারকা। স্কিল বা টেকনিকে আকাশ-পাতাল তফাত।’’

মোহনবাগান কোচ সঞ্জয় সেন-ও সরাসরি বলে দিচ্ছেন, ভারতে খেলা ফুটবলারদের ফিনিশিংয়ের মান খুবই নিম্ন। ‘‘টেকনিক আর স্কিল মিশলে গোল হয়। হয় ফুটবলারেরা একে অপরের সঙ্গে সমঝোতা তৈরি করে গোল করে। আর নয়তো বড় ফুটবলাররা ব্যক্তিগত নৈপুণ্যতায় গোল করে। আমাদের এখানে দু’টোর কোনওটাই তো নেই।’’ বিদেশের সমস্ত ক্লাবে উন্নত অ্যাকাডেমি আছে। সেখান থেকেই নতুন প্রজন্মের ফুটবলারেরা উঠছে। এখানে সে সবের বালাই নেই। অ্যাকাডেমি থাকলেও পেশাদারিত্ব নেই। সঞ্জয় যেমন উদাহরণ দিলেন, ‘‘বল মারার সময় নন-কিকিং ফুটকেও ঠিকঠাক পোজিশনে রাখতে হয়। বিদেশে এ সব জিনিস সবাই ছোটবেলা থেকেই শিখে আসে।’’

চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচ দেখে হতাশ হয়ে পড়ছেন প্রাক্তন স্ট্রাইকার শিশির ঘোষও। যিনি আই লিগে ফুটবলারদের মধ্যে কোনও উন্নত টেকনিকই খুঁজে পাচ্ছেন না। বাংলার অন্যতম সেরা গোলস্কোরার বলছেন, ‘‘ফুটবলারদের গুণগত মান আগের তুলনায় অনেক পড়ে গিয়েছে। বিশেষ করে বিদেশিদের। ব্যক্তিগত দক্ষতা খুব কম দেখতে পাই। কোনও ভাল মুভ তৈরি হয় না। এখানে তো দেখি শুধুই লং বলে খেলা চলছে। বল পাওয়া মানেই উড়িয়ে দিলাম। ও ভাবে আক্রমণ তৈরি হয় নাকি?’’

আরও পড়ুন:

মেঝেতে কাটল রাত, জেল কোনও আবদার মানল না, ব্রেকফাস্টে চাটনি-ভাত

পরিসংখ্যান বলছে, বুধবার রাতের ম্যাচে মোট ২৪টা শট মেরেছে বায়ার্ন। তুলনায় আর্সেনালের শট মাত্র ৭টা। বায়ার্নের বল পজেশন ৭০ শতাংশের বেশি। এ সব পরিসংখ্যান এখনও ভারতীয় ফুটবলে কল্পনাতীত। প্রশ্ন, খেলার ভঙ্গি যদি আনন্দ না দেয়, এই ফুটবল কে দেখবে? পুরনো সেই তর্ক— জিতব না আনন্দ দিয়ে জিতব? ব্রাজিলের শেষ বিশ্বকাপজয়ী দলকে কেউ মনে রাখেনি। কিন্তু কাপ না জিতলেও মনে রেখেছে সক্রেটিসের ব্রাজিলকে। তার কারণ সক্রেটিসদের শৈল্পিক ফুটবল।

ময়দানে এক সময় গোলের ঝড় তুলেছিলেন জামশেদ নাসিরি। তাঁর ও মজিদ বাসকারের জুটি এখনও সবচেয়ে জনপ্রিয় যুগলবন্দি হয়ে আছে। জামশেদ বলছেন, ‘‘ডার্বি দেখে মনে হয়েছে ফিটনেসে সমস্যা হচ্ছে ফুটবলারদের। গোল করার দায়িত্ব শুধু স্ট্রাইকারদের নয়। বিদেশি ফুটবলে আমরা অনেক বার দেখেছি সাইডব্যাক বা মাঝমাঠ থেকেও অনেক গোল আসে।’’ যোগ করলেন, ‘‘মাঝমাঠের কাজ আরও সক্রিয় হওয়া। বায়ার্নে যেমন দেখলাম অনবরত ভিদাল আর আলকান্তারা পরিশ্রম করে গেল। বারবার চেষ্টা করছিল পাস বাড়াতে। কিন্তু এখানে মাঝমাঠ মানে তারা অযথা ট্যাকল করবে, ফাউল করবে।’’

ফুটবলকে বলা হয় ‘দ্য বিউটিফুল গেম’। সুন্দর খেলা সুন্দর হয়ে ওঠে ভাল গোলের কারণে।  গোল করার লোকই আমাদের নেই, ফুটবল কী ভাবে আর সুন্দর হয়ে উঠবে!