ওঁরা চিন্টু আর পাপালি। কিন্তু স্টিভ স্মিথদের কাছে আপাত নিরীহ এই দু’টো ছেলে যেন কোনও দৈত্য ও দানব।

চেতেশ্বর পূজারা ও ঋদ্ধিমান সাহা। এক জনের জন্ম রাজকোটে, অন্য জনের শিলিগুড়িতে।

এই দুই নাম সোমবারের পর থেকে অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ইতিহাসেও জায়গা পেতে পারে। যদি দ্বিতীয় ইনিংসে ভেঙে পড়ে টেস্টটা হেরে বসেন স্মিথরা।

রাঁচীতে প্রথম ইনিংসে সাড়ে চারশো তুলে ফেলার পরেই সাফল্যের অপেক্ষায় দিন গুনছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু স্মিথরা প্রায় সাড়ে চোদ্দো ঘণ্টা মাঠে কাটাতে কাটাতে দেখলেন, পূজারা ও ঋদ্ধি তাঁদের সেই স্বপ্ন ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছেন। ম্যাচ নিয়ে চলে যাচ্ছেন নিজেদের দিকে।

সোমবার টেস্টের শেষ দিন জেতার জন্যই নামবে ভারত। খুব বেশি রান করতে না দিয়ে আর আট উইকেট তুলে নিলেই তো হল। অস্ট্রেলিয়া বড়জোর ম্যাচটা বাঁচাতে পারে। জেতা এখন দূর অস্ত্‌।

অস্ট্রেলীয় বোলারদের টানা ২১০ ওভার বল করানোর পরে ৬০০ রান তুলে বিরাট কোহালি ইনিংস ঘোষণা করে কামিন্স-লায়নদের রেহাই দিলেন ঠিকই, কিন্তু অতিথি ব্যাটসম্যানদের কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিলেন। দিনের শেষে ২৩ রানে দু’উইকেট হারানো অস্ট্রেলিয়ার পরীক্ষাটা ক্রমেই কঠিন হচ্ছে।

জেএসসিএ স্টেডিয়ামের প্রেসবক্সের পাশেই টিভি কমেন্ট্রি বক্স। কাচের দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে সব কিছু দেখা যায়। বহুদিন পরে সেখানে এক সঙ্গে দেখা গেল অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটের চার মহারথী— ম্যাথু হেডেন, মার্ক ওয়, মাইকেল ক্লার্ক এবং ব্রেট লি-কে। মাঠে পাথরসম দুই ব্যাটসম্যান যখন কামিন্সদের শাসন করছেন, তখন শুধু মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিলেন তাঁরা। যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলেন। 

একটু পরে বোধহয় সংবিৎ ফেরার পরে হেডেন বেরিয়ে এলেন। বললেন, ‘‘ওরা দু’জনেই তো ম্যাচটা বার করে নিল। ব্রিলিয়ান্ট ব্যাটিং। অসাধারণ। ম্যাচটাকে নিজেদের দিকে নিয়ে চলে এল।’’ সকাল থেকে বিকেল মাঠ মেঘে ঢাকা। কৃত্রিম আলোয় ভরা। এমন এক দিনের শেষে ভারতের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার ব্যবধান ১৪৯ রান। সোমবার টেস্টের শেষ দিন রবীন্দ্র জাডেজা-আর অশ্বিনরা জ্বলে উঠলে জয় আসতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আর রাঁচীর বহুচর্চিত উইকেট কিন্তু শেষ দিনে স্পিনারদের সঙ্গ দেবে বলেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

ওপেনার ওয়ার্নার ও নৈশপ্রহরী লায়নের স্টাম্প তো রবিবার শেষ বিকেলেই ছিটকে দিলেন জাডেজা। হারাধনের দশটি ছেলের রইল বাকি আট। অস্ট্রেলিয়া দলের ‘হারাধন,’ মানে স্মিথ অবশ্য তিন নম্বরে ব্যাট করতে নামেননি। সাড়ে চোদ্দো ঘণ্টা ফিল্ডিং করার পরে কি আর প্যাড-আপ করে ব্যাট হাতে নামার ইচ্ছা থাকে? সোমবার সকাল থেকেই তো তাঁর হার বাঁচানোর লড়াই শুরু।   

চেতেশ্বর পূজারার অদম্য ধৈর্য ও চরম একাগ্রতাকে রবিবারও সারা দিন ধরে টলাতে পারলেন না স্মিথের বোলাররা। আগের দিনের মতো রবিবারও তাঁর ব্যাটের শো কেসে দেখা গেল শটবৈচিত্রের সম্ভার। কামিন্স, হেজেলউড, ও’কিফ, লায়নদের সামনে প্রায় সারা দিন দেওয়াল তুলে দাঁড়িয়ে রইলেন নয়া ‘শ্রী নির্ভরযোগ্য’।

তা হলে কি নতুন রাহুল দ্রাবিড়কে পেয়ে গেল ভারত? ম্যাথু হেডেনকে প্রশ্নটা করতে তিনি যেন একটু অস্বস্তিতেই পড়লেন। বললেন, ‘‘এখনই তা বলব না। আর ক’টা দিন অপেক্ষা করুন না।’’ হেডেন মানতে না চাইলেও পূজারা কিন্তু ৬৭২ মিনিট ক্রিজে থেকে রাহুল দ্রাবিড়কে ছাড়িয়ে গেলেন। ১১ ঘণ্টা ১২ মিনিট! এত লম্বা টেস্ট ইনিংস আর কোনও ভারতীয় খেলেননি। অনেকের হয়তো মনে আছে, ২০০৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে রাহুল দ্রাবিড়ের ৪৯৫ মিনিটের ব্যাটিং? পূজারা টপকে গেলেন তাঁকে। 

তৃতীয় দিন পর্যন্ত স্মিথ-ম্যাক্সওয়েল জুটির জবাব দিতে পারেনি ভারত। চতুর্থ দিন সুদসহ তা ফিরিয়ে দেওয়া হল ঋদ্ধিদের ১৯৯ রানের পার্টনারশিপ দিয়ে। পূজারা যদি হন ভারতীয় ইনিংসের ভিত, তা হলে স্তম্ভ অবশ্যই ঋদ্ধিমান। ৩২ বছরের বঙ্গসন্তানের ১১৭-র সাহসী ইনিংস আর দায়িত্ববোধ দেখে অবাক সুনীল গাওস্কর। প্রেসবক্সের পিছনের সিটে বসে বললেন, ‘‘ছেলেটার দায়িত্ববোধ দেখলাম। সত্যিই অসাধারণ। ধৈর্যও অসীম। কী কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ব্যাটিং করে গেল! তাও আবার অস্ট্রেলিয়ার বোলিংয়ের বিরুদ্ধে। খুব কঠিন মানসিকতার ছেলে।’’

প্যাট কামিন্স ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের চাপে ফেলছিলেন শর্ট বলে। চারটের মধ্যে তিন উইকেটই পান এই অস্ত্রে। বুক ও মাথার উচ্চতায় বা অফ স্টাম্পের বাইরে বল রেখে ফাঁদে ফেলছিলেন কোহালিদের। এই রাস্তাটাই আটকে দেন পূজারা ও ঋদ্ধি।