বিচারপতি বিদ্রোহ! এক দিকে প্রধান বিচারপতি। তাঁর বিরুদ্ধে শীর্ষ আদালতের চার প্রবীণ বিচারপতি।

স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এ হেন অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী রইল শুক্রবারের রাজধানী দিল্লি। সুপ্রিম কোর্টের চার বিচারপতি আজ সাংবাদিক সম্মেলন করে অভিযোগ তুলেছেন, প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রর অধীনে শীর্ষ আদালতের কাজকর্ম প্রথা মেনে চলছে না।

কোন মামলার শুনানি কোন বেঞ্চে হবে, তা ঠিক করার ক্ষেত্রে অন্যায্য সিদ্ধান্ত হচ্ছে। কয়েক জন বাছাই করা বিচারপতির বেঞ্চেই পাঠানো হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ মামলা, বিশেষত সরকার ও শাসক দলের নেতারা যাতে অভিযুক্ত।

বিচারপতি চেলমেশ্বর আজ মন্তব্য করেছেন, ‘‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা না-থাকলে গণতন্ত্র বাঁচবে না। নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা জরুরি।’’ অভিযোগ স্পষ্ট, বর্তমান প্রধান বিচারপতির জমানায় সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীনতা থাকছে না। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও অভিযোগ করেছেন, ‘‘বিচার বিভাগে কেন্দ্রের যথেচ্ছ হস্তক্ষেপ গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক।’’

প্রধান বিচারপতি বনাম চার বিচারপতির মধ্যেই অবশ্য এই বিবাদ থেমে নেই। আজ শীর্ষ আদালত কার্যত দুই ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে। ক্ষুব্ধ বিচারপতিদের নেতৃত্বে অবশ্যই দ্বিতীয় প্রবীণতম বিচারপতি জে চেলমেশ্বর। তুঘলক রোডে তাঁর বাড়িতেই আজ সাংবাদিক সম্মেলন হয়েছে। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন বিচারপতি রঞ্জন গগৈও— যিনি পরবর্তী প্রধান বিচারপতি। আবার গগৈয়ের পরে যাঁর প্রধান বিচারপতি হওয়ার কথা, সেই বিচারপতি শরদ অরবিন্দ বোবদেও সাংবাদিক সম্মেলনের পর চেলমেশ্বরের সঙ্গে দেখা করেন। সঙ্গে ছিলেন আর এক বিচারপতি এল নাগেশ্বর রাও। বিচারপতি চেলমেশ্বরদের সাংবাদিক সম্মেলনের পরে প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র দু’দফায় অন্য বিচারপতিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এক বার সাংবাদিক সম্মেলন শেষ হওয়ার ঠিক পরে, বেলা ১টায়। পরে বিকেলেও।

বিচারপতিদের সাংবাদিক সম্মেলনের পরে সোলি সোরাবজির মতো আইন বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেছেন, ‘‘চার বিচারপতি এটা না-করলেই ভাল হত।’’ তাঁর মতে, প্রকাশ্য সংঘাত এড়ানো যেত। কারণ সাধারণ মানুষ শীর্ষ আদালতে আস্থা রেখে বাঁচেন। আবার উল্টো যুক্তি হল— বিচার ব্যবস্থাতেও পচন ধরেছে। সেখানে দুর্নীতি, অনিয়মের অভিযোগ কম নয়। এ বার তা প্রকাশ্যে চলে আসায় লাভই হবে। প্রবীণ আইনজীবী দুষ্মন্ত দাভের যুক্তি, ‘‘আলোচনা না-হলে স্বচ্ছ ব্যবস্থা তৈরি হবে কী করে?’’ আর চেলমেশ্বর বলেছেন, ‘‘বাধ্য হয়েই এই পথ নিতে হয়েছে। না হলে ভবিষ্যতে বলা হত, সকলেই তাঁদের বিবেক বিকিয়ে দিয়েছিলেন।’’

আরও পড়ুন: চেলমেশ্বরের বাড়িতে রাজা

শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় যখন শীর্ষ আদালতের শুনানি শুরু হয়, তখনও কেউ বোঝেননি কী ঘটতে চলেছে। তার আগেই বিচারপতিদের মধ্যে এক প্রস্ত বিবাদ হয়ে গিয়েছে। সিবিআই কোর্টের বিচারক ব্রিজগোপাল লোয়া-র রহস্যময় মৃত্যুর তদন্তের দাবিতে করা মামলার শুনানি বিচারপতি অরুণ মিশ্রর বেঞ্চে পাঠানো নিয়ে বিতর্কের শুরু। ওই বিচারক গুজরাত পুলিশের বিরুদ্ধে সোহরাবুদ্দিনকে ভুয়ো সংঘর্ষে মেরে ফেলার অভিযোগের মামলা শুনছিলেন। যাতে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের নামও রয়েছে। ২০১৪-য় বিচারক লোয়ার মৃত্যু হয়।

প্রধান বিচারপতির কাছে এ বিষয়ে আপত্তি তোলেন চার বিচারপতি। বিচারপতি গগৈ জানান, লোয়া-মামলা নিয়েই তাঁরা আপত্তি তুলেছিলেন। কিন্তু সমস্যা মেটেনি। এর পরেই সওয়া ১২টায় বিচারপতি চেলমেশ্বর তাঁর তুঘলক রোডের বাড়িতে সাংবাদিক সম্মেলন ডাকেন। অন্য বিচারপতিদের কাছে এ খবর পৌঁছলে প্রায় সকলেই শুনানি মুলতুবি করে দেন। প্রধান বিচারপতিও বেলা ১২টায় শুনানি মুলতুবি করে টিভি-র সামনে বসে পড়েন। বিচারপতি লোয়া-র মৃত্যুরহস্য মামলার শুনানি অবশ্য তত ক্ষণে হয়ে গিয়েছে।

আরও পড়ুন: ‘এই গোলমালের সুযোগ রাজনীতিকরা নিলে বিপদ’

আইনজীবী দুষ্মন্ত দাভেও প্রধান বিচারপতির কাজকর্ম নিয়ে সংবাদপত্রে কলাম লিখেছেন। বিচারপতি অরুণ মিশ্রর বেঞ্চে এর শুনানি নিয়ে তিনি তীব্র আপত্তি তোলেন। বলেন, বম্বে হাইকোর্ট যখন দেখছে, তখন সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ দরকার নেই। কিন্তু প্রধান বিচারপতি মহারাষ্ট্র সরকারকে নোটিস জারি করেন।

 

নজরে যাঁরা

 

প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র

• গত বছর অগস্টে দায়িত্ব নিয়েছেন। প্রধান বিচারপতি হওয়ার ঠিক আগে তাঁর বিরুদ্ধে আইনজীবী থাকাকালীন তথ্য গোপন করে সরকারি জমি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।

বিচারপতি জাস্তি চেলামেশ্বর

• দ্বিতীয় প্রবীণতম বিচারপতি। তবে তিনি প্রধান বিচারপতি হতে পারবেন না। অনেক দিন ধরেই কলেজিয়ামের মাধ্যমে বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে সরব। প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি জে এস খেহরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন, কলেজিয়ামের বৈঠকও নিয়মমাফিক হয় না। অসন্তোষের জন্য দীর্ঘদিন কলেজিয়ামের বৈঠকেও যোগ দেননি।

বিচারপতি রঞ্জন গগৈ

• অক্টোবরে প্রধান বিচারপতি হবেন। আদালত অবমাননার নোটিস জারি হওয়ায় এজলাসে চিৎকার করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি মার্কণ্ডেয় কাটজু। বিচারপতি গৈগ তাঁকে নিরাপত্তা রক্ষী দিয়ে বাইরে বার করে দেওয়ার নির্দেশ দেন।

বিচারপতি মদন বি লোকুর

• মৃদুভাষী, কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে কড়া রায় দিতে ইতস্তত করেন না।

বিচারপতি কুরিয়েন জোসেফ

• সুপ্রিম কোর্টের একমাত্র খ্রিস্টান বিচারপতি।

সাংবাদিক সম্মেলনের পরে গুজব ছড়ায় প্রধান বিচারপতিও মুখ খুলবেন। কিন্তু তা হয়নি। আইনজীবীরা বলছেন, গত কয়েক মাসে কিছু মামলা নির্দিষ্ট কিছু বিচারপতির এজলাসেই পাঠানো হচ্ছে। তা নিয়েই একাংশ বিচারপতি আপত্তি তোলেন। বিচারপতি চেলমেশ্বর জানিয়েছেন, দু’মাস আগে তাঁরা সাত পাতার চিঠি লেখেন প্রধান বিচারপতিকে। সেই চিঠিও আজ প্রকাশ করেন বিচারপতিরা।

তবে একে প্রধান বিচারপতির প্রতি পুরোপুরি অনাস্থা বলছেন না বিচারপতিরা। প্রধান বিচারপতির ‘ইমপিচমেন্ট’ নিয়ে তাঁদের জবাব, ‘‘এ বিষয়ে আমাদের কিছু করার নেই।’’