ইনশা মুস্তাক বছর পনেরোর কাশ্মীরি কিশোরী। উপত্যকায় পেলেট গান ব্যবহার শুরু হওয়ার পর তার জীবন কিছুটা বদলে গিয়েছে। গত বছর ছর্‌রার আঘাতে দু’চোখই গিয়েছে ইনশার। সেই থেকে আরও গোঁড়া পাক সমর্থক ইনশা। এমনিতে শাহিদ আফ্রিদি তার বরাবরের প্রিয় ক্রিকেটার। কিন্তু পাকিস্তানের জয়ে এত উল্লাস আগে কখনও করেছে কি না, চট করে মনে করতে পারে না ইনশা নিজেও। রবিবার ওভালে যখন ভারত-পাক ম্যাচের ভবিষ্যৎ প্রায় স্পষ্ট, এক গাল হাসি নিয়ে তখন ‘দ্য টেলিগ্রাফ’কে কাশ্মীরি ওই কিশোরী বলে, ‘‘আমি চাই পাকিস্তান জিতুক। হতেও চলেছে সেটাই।’’ ‘‘আমি খুব খুশি’’— খোলাখুলিই জানায় ইনশা।

শ্রীনগরে কাশ্মীরি তরুণদের বিরাট অংশ রবিবার রাতে যে ভাবে আতসবাজি পুড়িয়ে উদ্‌যাপন করেছে পাকিস্তানের জয়, তাতে প্রশাসনের উদ্বেগ স্বাভাবিক ভাবেই বেড়েছে। ছবি: এএফপি।

চোখে এখন আর দৃষ্টিশক্তি নেই। ইনশা খেলা দেখতে পায়নি। কিন্তু পাড়া-পড়শির উল্লাস আর বাজি-পটকার আওয়াজে ম্যাচের গতিপ্রকৃতি টের পাচ্ছিল। ইনশার কথায়, ‘‘খেলাটা দেখতে পেলে আরও ভাল লাগত। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি না বলে আফসোস নেই। ভাই পাশের বাড়িতে খেলা দেখতে গিয়েছে। আমাকে সারা ক্ষণ ও স্কোর জানাচ্ছে।’’

ইনশা মুস্তাক কোনও বিচ্ছিন্ন দৃষ্টান্ত ছিল না রবিবার রাতে। কাশ্মীর উপত্যকার বিভিন্ন অংশে উৎসব দেখা গিয়েছে এ দিন। লন্ডনের মাঠে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের জয় তরুণ প্রজন্ম রাস্তায় নেমে উদ্‌যাপন করেছে। অনেক এলাকায় সেনা ছাউনির খুব কাছাকাছি গিয়ে পটকা ফাটানো হয়েছে বলেও খবর। দীর্ঘ দিন কোনও উৎসব ছিল না। তার পরিবেশও ছিল না। উপত্যকা জুড়ে শুধুই সংঘর্ষের ছবি দেখা যাচ্ছিল টানা প্রায় বছর দেড়েক। রবিবার রাতটা হঠাৎ অন্য রকম হয়ে উঠল। আতসবাজির আলো আর পটকার আওয়াজে গমগম করে উঠল শ্রীনগর, পুলওয়ামা, পুঞ্চ, রাজৌরি, বারামুলা, সোপিয়াঁ, কুপওয়ারার বিভিন্ন এলাকা। কাশ্মীরি তরুণদের একাংশ যে ভাবে পথে নামলেন, তুমুল উল্লাসে যে ভাবে পাকিস্তানের জয় উদ্‌যাপন করলেন, তাতে উপত্যকার প্রশাসনের কপালে উদ্বেগের রেখা বাড়তে বাধ্য।

ভারতীয় আধা-সামরিক বাহিনীর ছাউনিতেও রবিবার অনেকেরই চোখ ছিল টিভির পর্দায়। যত এগিয়েছে ম্যাচ, ততই জওয়ানদের চোখেমুখে ফুটে উঠেছে হতাশা। ছবি: এএফপি।

পাকিস্তান জিতলে উপত্যকায় এমন ছবি যে তৈরি হতে পারে, প্রশাসন তা আগে থেকেই আঁচ করেছিল। নিরাপত্তা বাহিনীকে সতর্কও করা হয়েছিল। কিন্তু তাতেও অশান্তি এড়ানো যায়নি পুরোপুরি। জম্মু-কাশ্মীর পুলিশ সূত্রকে উদ্ধৃত করে ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ জানিয়েছে, গভীর রাতের দিকে উল্লাসকারীদের সঙ্গে কোথাও কোথাও নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়েছে বলে যে সব খবর ভেসে বেড়াচ্ছে, তা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

ভারতীয় বাহিনী যখন উপত্যকার এই ছবি দেখে উদ্বিগ্ন, তখন স্বাভাবিক ভাবেই পাক বাহিনী অত্যন্ত উল্লসিত। পাক সেনার মুখপাত্র মেজর জেনারেল আসিফ গফুরের টুইটার হ্যান্ডলই পাক বাহিনীর সে উল্লাস স্পষ্ট করে দিয়েছে। মেজর জেনারেল গফুর প্রথমে এমন একটি ছবি টুইট করেন, যাতে পাক সেনাপ্রধান জেনারেল কমর জাভেদ বাজওয়া ভিকট্রি সাইন দেখাচ্ছিলেন। তার পরই বালুচিস্তান এবং শ্রীনগরে উল্লাসের ছবি টুইট করেন আসিফ।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গত বছর স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে বালুচিস্তান এবং গিলগিট-বাল্টিস্তান নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকা ওই দুই অঞ্চলে স্বাধীনতার দাবি তীব্র হচ্ছে বলে মোদী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। মেজর জেনারেল আসিফ গফুর তাই রবিবার রাত ১১টা ৫২ নাগাদ একটি উল্লাসের কোলাজ টুইট করে লেখেন, ‘‘...এই হল আমাদের বালুচিস্তান।’’

পাক সেনার মুখপাত্র এতেই থামেননি। রাত ১২টা ২৩ নাগাদ একটি ভিডিয়োও টুইট করেন তিনি। তাতে আতসবাজি পুড়িয়ে, নেচে-গেয়ে উৎসব করতে দেখা যাচ্ছে অনেককে। মেজর জেনারেল আসিফ গফুর লেখেন, ‘‘এবং এই হল... শ্রীনগর!!’’

এই প্রথম ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে উপত্যকায় এমন ছবি তৈরি হল, তা কিন্তু নয়। ১৯৮৩ সালের অক্টোবরে শ্রীনগরে প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজিত হয়েছিল। ভারত বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সে বছরই সদ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছে ভারত। দেশ জুড়ে জাতীয়তাবাদের হাওয়া। শ্রীনগরের মাঠে খেলা শুরু হতেই সে হাওয়া জোর ধাক্কা খেয়েছিল। দেশের বাকি অংশগুলিতে বসে টিভির পর্দায় চোখ রাখা ভারতীয়রা দেখেছিলেন, শ্রীনগরের ভিড় ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সমর্থন করছে। উপত্যকায় ভারত বিরোধী ভাবাবেগের আঁচটা সম্ভবত সেই প্রথম খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল দেশের বাকি অংশের কাছে।

আরও পড়ুন: পাকিস্তানকে সাত গোল, অভিশাপ কাটল নেগির

ওভালে ভারত-পাক ম্যাচকে ঘিরে আবার ১৯৮৩ সালের সেই দিনটার মতোই একটা দিন ফিরল উপত্যকায়। আরও তীব্রতা নিয়ে ফিরল ভারত বিরোধিতা, ফিরল পাক-প্রেম। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে হিজবুল কম্যান্ডার বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর থেকেই একটানা উত্তপ্ত উপত্যকা। ২০১৬-র ইদ উ্‌দযাপনও ছিল মলিন। এ বারও পরিস্থিতি একই রকম ছিল কাশ্মীরের বিভিন্ন অংশে। বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের খবর আসছিল প্রায় রোজ। ইদের উৎসব কতটা জমজমাট হবে, সংশয় ছিল। লন্ডনে পাকিস্তানের জয় কিন্তু আগেভাগেই উৎসবের রোশনাই এনে দিল উপত্যকার বিভিন্ন অংশে।