পর্যাপ্ত সময় পেয়ে, ঘর গুছিয়েই রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে লড়তে নেমেছেন বিমল গুরুঙ্গ। পাহাড়ের গোপন ঘাঁটি ও নেপালে সরিয়ে ফেলেছেন অস্ত্রভাণ্ডার। এমনটাই মত রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দাদের। একই সঙ্গে রাজ্য সরকারের দমননীতিকে সামনে রেখে সফল ভাবে গোর্খা আবেগকে উস্কে পাহাড়ের মানুষের সমর্থনও আদায় করে নিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, অসমের এনডিএফবি, আবসু-র মতো পৃথক রাজ্য গঠনের দাবিতে তৈরি যৌথমঞ্চগুলিরও প্রকাশ্য সমর্থন পেল গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা।

আসাম রাইফেলস সূত্রে খবর, মায়ানমার-অরুণাচল সীমান্তের টিরাপ জেলায় আসাম রাইফেলস বৃহস্পতিবার এক সশস্ত্র জঙ্গিকে গ্রেফতার করেছিল। পরে জেরায় জানা গিয়েছে, সে আসলে আলফা নয়, গোর্খাল্যান্ড আর্মির সদস্য। মায়ানমারে এনএসসিএন খাপলাং শিবিরে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরছিল সে। গোর্খা লিবারেশন আর্মির লেফটেন্যান্ট পদে থাকা ওই যুবকের নাম রাজেশ লামা ওরফে গণেশ রাই। তার কাছ থেকে গুলিভরা বিদেশি পিস্তলও মিলেছে। জানা গিয়েছে, আরও গোর্খা যুবক মায়ানমারে প্রশিক্ষণ নিয়েছে।

তেলঙ্গানা আন্দোলনের সময় থেকেই ন্যাশনাল ফেডারেশন অব নিউ স্টেটস-এর নেতারা অসমে আসতেন। সেখানে পৃথক গারোল্যান্ড, বড়োল্যান্ড, কামতাপুর রাজ্যের দাবিতে আন্দোলন করা নেতারাও একমঞ্চে হাজির হতেন। এসেছেন বিমল গুরুঙ্গও। এ বার দার্জিলিংয়ের পরিস্থিতি নিয়ে এনএফএনএস যেমন গুরুঙ্গ ও পৃথক গোর্খাল্যান্ডের দাবিকে সমর্থন জানিয়েছেন, তেমনই অসমের বড়ো ছাত্র সংগঠন আবসু, পৃথক রাজ্য গঠনের যৌথমঞ্চ পিজিএসিবিএম এবং এনডিএফবি প্রগ্রেসিভ যৌথ বিবৃতি দিয়ে গোর্খাল্যান্ডের স্বপক্ষে সরব হয়েছে। তাদের দাবি, বড়োল্যান্ড ও গোর্খাল্যান্ড ঐতিহাসিক ও সাংবিধানিক দিক থেকে ন্যায্য অধিকার। আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে যেমন তেলঙ্গানার জন্ম হয়েছে, তেমনই বড়ো ও গোর্খাদের দাবিকেও সম্মতি জানানো উচিত ছিল কেন্দ্রের। দার্জিলিঙের আগুন ও রক্তপাতের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাবকে দোষ দিয়েছে বড়ো সংগঠনগুলি। পাশাপাশি, অসমের তেজপুরের বিজেপি সাংসদ তথা অসম গোর্খা সম্মেলনের সভাপতি আর পি শর্মা রবিবার বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ থেকে পৃথক হওয়া যে দাবি গোর্খারা জানাচ্ছে, তা ন্যায়সঙ্গত।” আইনজীবী শর্মা জানান, মোর্চার দাবি ও আন্দোলনে নিঃশর্ত সমর্থন জানাচ্ছে অসম ও উত্তর-পূর্বের গোর্খারা। মোর্চার শান্তিপূর্ণ আন্দোলন যে ভাবে বলপ্রয়োগ করে দমন করছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার তা নিন্দনীয়।

পুলিশের মতে, এত দিন গুরুঙ্গের বিরোধী পক্ষ সক্রিয় থাকলেও, দার্জিলিংয়ের বর্তমান পরিস্থিতিতে নেপালীদের সমর্থন পুরোপুরি আদায় করে নিতে পেরেছেন গুরুঙ্গ। তাই তাঁর আশ্রয় পেতে ও বদল করতে সমস্যা হচ্ছে না। অথচ খবর পাচ্ছে না পুলিশ। তাঁকে ঘিরে থাকছে নাগাল্যান্ড ও মায়ানমারে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফেরা গোর্খা বাহিনীর সদস্যরা।

রাজ্য পুলিশের কাছে খবর, দার্জিলিঙে লড়াই চালানোর জন্য অসমে জঙ্গিদের সাহায্য চেয়েছে মোর্চা। অসমে দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় ইউনাইটেড গোর্খা পিপলস অরগানাইজেশন। মোর্চার উত্তর-পূর্ব কো-অর্ডিনেশন কমিটির বৈঠকেও তাদের নেতারা আসতেন। গুরুঙ্গের দলের অনেকের সঙ্গেই তাদের যোগাযোগ প্রমাণিত। তাই তাদের মাধ্যমে নাগাল্যান্ডে জঙ্গি সংগঠন ও উত্তরবঙ্গে মূল স্রোতে ফেরা কেএলও নেতাদের মাধ্যমে অসমে কেএলও জঙ্গিদের কাছে ইতিমধ্যে সাহায্যের বার্তা পাঠিয়েছেন মোর্চা নেতারা। চাওয়া হয়েছে অস্ত্র ও গুলি। তাই বাংলার সঙ্গে ভুটান ও অসমের কোকরাঝাড়, চিরাং, ওদালগুড়ি, ধুবুড়ির সব সীমানায় নজরদারি কড়া করা হয়েছে। খাপলাং বাহিনীও জিএলপিকে অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করত। তারা এখন নেতৃত্বের লড়াই নিয়ে ব্যস্ত। সেই সুযোগে দলের জঙ্গিরা নাগাল্যান্ডে থাকা অস্ত্র ও গুলি বিক্রি করতে চাইছে। কেএলও ও ইউজিপিএর মাধ্যমে সেই সুযোগ নিতে চাইছে মোর্চা।

মোর্চা নেতা ও সদস্যদের হাতে প্রচুর বিদেশি মারণাস্ত্র থাকলেও মোর্চা দফতরে হানা দিয়ে তেমন কিছুই মেলেনি। অথচ পুলিশ নিশ্চিত, এ কে সিরিজ রাইফেল, বিদেশি সাব-মেশিনগান, বিদেশি পিস্তল ইউজিপিএর হাত ঘুরে নাগাল্যান্ড থেকে পাহাড়ে ঢুকেছে। কিন্তু সেই সব অস্ত্র সম্ভবত আগেই গোপন ঘাঁটি বা নেপালের ঘাঁটিতে সরিয়ে ফেলেছেন গুরুঙ্গরা। গোর্খাল্যান্ড পার্সোনেল বাহিনীর প্রশিক্ষণের সময় থেকেই নেপালের মাওবাদীদের সঙ্গও মোর্চা নেতাদের সদ্ভাব ছিল। কিন্তু গোয়েন্দারা জেনেছেন অস্ত্র আনলেও দীর্ঘ দিন লড়াই চালানোর মতো গুলির রসদ তাঁদের নেই। তাই আপাতত অসম থেকে গুলির জোগাড়ের চেষ্টায় আছে মোর্চার অ্যাকশন টিমের নেতারা। পুলিশ আপাতত মোর্চার সেই অস্ত্রভাণ্ডার খুঁজছে।