এখান থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দুরে পশ্চিম আফ্রিকার একটা ছোট্ট দেশ মালি। আর সেই মালির ফুটবলারদের জীবনে মাসের প্রথম বুধবারটা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
না, ফুটবলের সঙ্গে বুধবারের কোনও সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক আছে ভারতের। যে দিনটার জন্য মুখিয়ে থাকে আলকালিফা, হায়দারা, ত্রাওরেরা। বুধবার দিল্লির হোটেলে দাঁড়িয়ে সে কথাই শোনাচ্ছিল তাদেরই দলের মিডফিল্ডার দোম্বিয়া। 
নয়াদিল্লির টিম হোটেলে একবার ঢুঁ মারতে গিয়েছিলাম ভারতীয় দলের প্লেয়ারদের খোঁজে। নানান প্রতিবন্ধকতা সেখানে। কথা বলা যাবে না। এ বার তো টিম ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে সঙ্গে তাতে বাধ সাধতে শুরু করেছেন হোটেল কর্তৃপক্ষও। অজুহাত নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়মবিধি। তার মধ্যেই এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলাম।
আরও পড়ুন

হোটেলের লবিতে আমার পাশে বসেই ইয়ারফোন লাগিয়ে গান শুনছিল এক ফুটবলার। জার্সি দেখে বুঝলাম সে মালির। এত দিন তারা খেলছিল নবি মুম্বইয়ে। সেখান থেকে এক দিন আগেই পৌঁছেছে দিল্লিতে। গ্রুপের শেষ ম্যাচ নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে তারা খেলবে জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে।

ভারতের সঙ্গে খেলা নেই তাই মালি নিয়ে তেমন কোনও আগ্রহও ছিল না। অনেকেই লবিতে ঘুরছে, ফিরছে, প্রায় সকলেরই ইয়ারফোন লাগানো। লবি জুড়ে যেন তাদেরই রাজত্ব। হঠাৎই কানে লাগল সেই ফুটবলারের গুনগুন সুর। কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে! কোথায় শুনেছি, কোথায় শুনেছি ভেবে মনে করতে না পেরে জিজ্ঞেস করেই বসলাম। কান থেকে যন্ত্র খুলে লাজুক লাজুক মুখে সে বলল, ‘ম্যায় বনি তেরি রাধা’। উচ্চারণ বুঝতে বেশ বেগ পেতে হল। যখন বুঝলাম তখনও চমকের বাকি ছিল আরও অনেক। বলে কী ছেলে! এ তো হিন্দি গান। এখানেই শেষ নয়। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে সে বলল, ‘শাহরুখ খান, শাহরুখ খান।’ তার পরই জানা গেল মাসের প্রথম বুধবারের গুরুত্ব।
ঠিক কী হয় মাসের প্রথম বুধবার?
সেখানকার এক টেলিভিশন চ্যানেল প্রতিমাসের প্রথম বুধবার একটি করে বলিউড সিনেমা চালায়। আর তার জন্য সারা মাস মুখিয়ে থাকে পুরো দেশ। সব কাজ ফেলে নাকি সেই তিনঘণ্টা টিভির সামনেই কাটে এই অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবল দলের অনেকেরই। কোচও জানেন। তাই সেই সময় অনুশীলনে ছুটি। আর ছুটি না পেলেই আবারও একমাসের অপেক্ষা। ফুটবলের জন্য আপাতত ছাড়তে হলেও ভারতীয় হিন্দি সিনেমায় মজে মালি অনূর্ধ্ব-১৭ দলের ফুটবলাররা। 
জাতীয় পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে মালির যুব ফুটবল দল।
ভারত থেকে মালির দুরত্ব ঠিক কতটা?
গুগল করে জানা গেল, সেই দূরত্ব  ৮৬১৮ কিলোমিটার। কিন্তু, এই দূরত্ব মুহূর্তেই কমে যায় যখন প্রসঙ্গটা আসে বলিউডের। ফুটবলের পাশাপাশি বলিউডেই মজে পুরো মালি দল। মুম্বইতে খেলা শুনে দারুণ খুশি হলেও শাহরুখ খানের সঙ্গে দেখা করার সৌভাগ্য হয়নি দলের ফুটবলারদের। কারণ তাদের উপর ছিল নানা প্রতিবন্ধকতা। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে, শুধু মাঠ আর হোটেলেই সীমাবদ্ধ জীবনে বলিউডের অবস্থান শুধু ইয়ারফোনেই। আর টেভিলিভশনের পর্দায় মাঝে মাঝে যদি একঝলক দেখা যায়। বলিউড তারকাদের বাড়ি দেখার ইচ্ছেটাও সফল হয়নি কঠিন প্রতিযোগিতার নিয়মে বাধা পড়ে। তবুও ছুঁয়ে এসেছে শাহরুখ, সলমনের মুম্বইকে। টিম ম্যানেজমেন্ট কথা দিয়েছে, সেমিফাইনালে পৌঁছলে সেই ব্যবস্থাও হবে। 
জাতীয় যুব দলের সভাপতি সিকো মাসিয়ের সেলাও নাকি অমিতাভ বচ্চনের অন্ধ ভক্ত। দল সেমিফাইনালে পৌঁছলে তিনিও আসবেন। আর দলকে সমর্থন করতে তিনি স্টেডিয়ামে অমিতাভ বচ্চনকে চান, বলছিল দোম্বিয়া। কিন্তু দোম্বিয়ার পছন্দ শাহরুখ। মাহামানে ত্যুরের পছন্দ সলমন খান। শুনিয়েও দিল সে, চুলবুল পাণ্ডের কথা। দোম্বিয়া বলছিল, ‘‘শাহরুখ, সলমনের লড়াই আমাদের টিমের মধ্যে লেগেই থাকে। কিন্তু আমরা এখন এই সব ভুলে শুধুই খেলায় মন দিতে চাইছি। গান শুনে নিজেদের সতেজ রাখি। বলিউডের গান।’’
আরও পড়ুন

দেখলে শাহরুখ খানের বাড়ি?

মুখে একরাশ অন্ধকার নেমে এল, যেন ম্যাচে হারতে হয়েছে। তার পর মাথা নেড়ে বলল, ‘‘না, সেমিফাইনালে উঠলে বলেছে নিয়ে যাবে। আমরা এখন খেলায় মন দিতে চাই। ওটাই আসল। সেমিফাইনালে পৌঁছতে চাই।’’

কোচ জোনাস কোমলা অবশ্য স্পষ্টই বুঝিয়ে দিয়েছেন, লক্ষ্য স্থির রাখার কথা। তবে সময় ভাগ করা রয়েছে। বলিউড মুভি দেখার ছাড় রয়েছে দিনের একটা সময়। এখানে অবশ্য বুধবার বলে কিছু নেই। ভারতের মাটিতে বসে টেলিভিশন চ্যানেল খুললেই তো দেখা যাচ্ছে হিন্দি ছবি। তবে এখানে সাব টাইটেল না থাকায় একটু সমস্যায় পড়েছে দোম্বিয়ারা। তবুও হিন্দি ছবি তো দেখা যাচ্ছে এটাই বা কম কীসে!