প্রশ্ন: সেঞ্চুরিয়নে কী প্রত্যাশা করছেন? কারা এগিয়ে? ভারত কি পারবে ফিরে আসতে?

অ্যালান ডোনাল্ড: আমার মনে কোনও সন্দেহ নেই যে, সেঞ্চুরিয়নে অ্যাডভ্যান্টেজ দক্ষিণ আফ্রিকা। ওরা নিজেদের সবচেয়ে ফেভারিট দু’টি কেন্দ্রে শেষ দু’টি টেস্ট খেলছে। দু’টো জায়গারই পিচের মুখ্য চরিত্র হচ্ছে পেস আর বাউন্স। সেটা দক্ষিণ আফ্রিকার বোলিং আক্রমণকে বাড়তি সুবিধে দেবেই। বিশেষ করে ওদের বোলিং বিভাগে যখন তিন জন খুব লম্বা পেসার রয়েছে।

 

প্র: ডেল স্টেন নেই। দক্ষিণ আফ্রিকা কাদের নিয়ে বোলিং আক্রমণ সাজাবে মনে হচ্ছে?

ডোনাল্ড: রাবাডা, মর্কেল আর ফিল্যান্ডারকে নিয়ে তো কোনও সংশয়ের জায়গাই নেই। আমি টিমের সঙ্গে নেই। কিন্তু দূরে বসে মনে হচ্ছে, ওরা ক্রিস মরিস-কেও অবশ্যই খেলাবে। আবার বলছি, এটা আমার ধারণা। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ যখন বলছেন, তিনি পেস-কে অস্ত্র করেই পুরো গ্রীষ্মে খেলতে চান, তার মানে টিমের মনোভাব তো খুবই পরিষ্কার। পেসার বোঝাই করে বোলিং আক্রমণ সাজানোর চিন্তাভাবনা করছে ওরা।

 

প্র: ভারতীয় দলের দিক থেকে তার মানে কঠিন লড়াই সামনে?

ডোনাল্ড: ভারতীয় দলকে কঠিন লড়াইয়ের সামনে পড়তে হবে, সন্দেহ নেই। প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে। বিশেষ করে সেঞ্চুরিয়ন বিদেশি দলের জন্য খুব কঠিন জায়গা। আমি জানি না, কতটা ঘাস রাখা হয়েছে পিচে।

 

প্র: না, খুব ঘাস আর নেই এখন। অনেকটাই কেটে ফেলা হয়েছে।

ডোনাল্ড: ওহ্, তাই নাকি? তা হলে সেটা কিন্তু আকর্ষণীয় হতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকা নিশ্চয়ই খুব নিষ্প্রাণ উইকেট চাইবে না। তবু বলব, সিরিজের শেষ দু’টি টেস্টের কেন্দ্র দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য খুবই সফল দুই কেন্দ্র। আমরা এই দু’টো জায়গায় ক্রিকেট খেলতে ভালবাসি।

 

প্র: সেঞ্চুরিয়নের উইকেট কি তা হলে পুরোপুরি বোলারদের উইকেট?

ডোনাল্ড: না, ব্যাটসম্যানরাও রান পেতে পারে। সেঞ্চুরিয়ন খুব ফাস্ট স্কোরিং গ্রাউন্ড। খুব দ্রুত রান উঠতে পারে এখানে। কোনও ব্যাটসম্যান যদি প্রাথমিক আক্রমণ সামলে থিতু হতে পারে, তা হলে শট খেলতে পারবে পরের দিকে। যার জন্য দেখা যাবে, সেঞ্চুরিয়নে সব দলেরই ইনিংসের রান রেট বেশ ভালই থাকে। ওভার প্রতি অন্তত ৩.৫ রানের স্কোরিং রেট প্রায়ই দেখা যায়। কখনও-সখনও ওভার প্রতি চার রানেও পৌঁছে যায়। কিন্তু সেঞ্চুরিয়নের উইকেটে সারাক্ষণই খুব ভাল গতি থাকে। বল ভাল যায়, বাউন্সও আছে ভাল। সেটা পেসারদের খুব উৎসাহিত করে।

পূর্বাভাস: সেঞ্চুরিয়নে দক্ষিণ আফ্রিকা-কে এগিয়ে রাখছেন অ্যালান ডোনাল্ড।

প্র: বিরাট কোহালির সঙ্গে তো আপনি কোচ হিসেবে কাজ করেছেন রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরে। বিরাট এবং তাঁর দলের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা আপনার? এই দলটার মধ্যে কি বিদেশে পারফর্ম করার দক্ষতা রয়েছে? চলতি সিরিজে বিরাট-রা কি প্রত্যাবর্তন ঘটাতে পারেন?

ডোনাল্ড: দক্ষিণ আফ্রিকায় এসে প্রথম যে সাংবাদিক সম্মেলনটা করল ভারতীয় দল, সেখানে কোচ রবি শাস্ত্রী বলেছিল, ওরা এখানে ঘুরতে আসেনি। ওরা জানে, এখানে ওদের কী দেওয়া হবে এবং কোনও অজুহাত ওরা দেবে না। পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায়। এবং, আমার মনে হয় ভারতীয় দল কথা রেখেছে। কেপ টাউনে প্রথম টেস্টে ওরা অবশ্যই দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। শুরুতেই দারুণ বোলিং করে দক্ষিণ আফ্রিকাকে চাপে ফেলে দিয়েছিল, তার পর দক্ষিণ আফ্রিকা কাউন্টার অ্যাটাক করল। বিশেষ করে প্রথম ইনিংসে এ বি ডিভিলিয়ার্সের ইনিংসটা খুব বড় তফাত করে দিল। দ্বিতীয় ইনিংসেও দারুণ ভাবেই ম্যাচের মধ্যে ছিল ভারত। দক্ষিণ আফ্রিকায় আমরা জানি, এই ভারতীয় দলটায় সত্যিই দারুণ সব প্রতিভা রয়েছে। আমার মনে কোনও সন্দেহ নেই যে, বিরাট ওর টিমকে চাঙ্গা করে তোলার চেষ্টা করছে, প্রত্যাঘাত করার জন্য। বিরাট দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে এসেছেই একটা অন্য রকম মনোভাব, অন্য শরীরী ভাষা নিয়ে। এমনিতেই ও বেশ আক্রমণাত্মক। অবাক হব না, যদি এখানে ওকে আরও আগ্রাসী হতে দেখি। বিরাটের মধ্যে অসম্ভব একটা খিদে আছে ভাল করার। ও নিজেও জানে, ক্রিকেট বিশ্ব ওর টিমকে বিচার করবে বিদেশের মাঠে পারফরম্যান্স দিয়ে। বিরাট সেই শৃঙ্গে পৌঁছতে চাইবে। তাই আমার মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে, এই ভারতীয় দল অনমনীয় মানসিকতা নিয়ে দ্বিতীয় টেস্টেই ঝাঁপিয়ে পড়বে। দারুণ উপভোগ্য দু’টো টেস্ট বাকি সিরিজে অপেক্ষা করছে বলে আমার মনে হয়।

 

প্র: সেঞ্চুরিয়ন সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেকটা উঁচুতে বলে বোলারদের নাকি সমস্যা হতে পারে। আপনি তো এখানে অনেক বোলিং করেছেন। এই তথ্য কি ঠিক?

ডোনাল্ড: একদম ঠিক। সেঞ্চুরিয়নে এই সমস্যাটা হতে পারে। যারা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উঁচু জায়গায় বল করেনি, তাদের ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যা হতে পারে এখানে এসে। লম্বা স্পেল করতে গেলে হাঁফিয়ে উঠতে পারে, অন্য জায়গার তুলনায় বেশি তাড়াতাড়ি ক্লান্ত করে দিতে পারে। তবে আমার মনে হয় না এটা নিয়ে খুব চিন্তিত হওয়ার কারণ আছে। সেঞ্চুরিয়ন ক্রিকেট খেলার পক্ষে দারুণ একটা মাঠ। দর্শনীয় একটা মাঠ। আমি নিশ্চিত, ভারতীয় বোলাররাও এই পরিবেশ উপভোগ করবে। বল ভাল ট্র্যাভেল করে, তাই পেসাররা বল করে আনন্দ পাবে। হয়তো যশপ্রীত বুমরা-র মতো কোনও বোলার, যে কখনও প্রিটোরিয়াতে খেলেনি, তার সামান্য অসুবিধে হতে পারে। তার জন্য ট্রেনিংয়ে বাড়তি সময় দিলেই হয়। আমি যখন সেঞ্চুরিয়নে খেলতাম, ট্রেনিংয়ের সময়টা বাড়িয়ে দিতাম। যাতে উঁচু জায়গার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে বেশি ধকল নিতে পারি। জানি না কেন, আমার খুব শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা হতো সেঞ্চুরিয়নে বল করার সময়।

 

প্র: ভারতীয় বোলিং নিয়ে আপনার কী মনে হয়? এমন কোনও ভারতীয় পেস বোলার আছে, যাঁকে আপনার বিশেষ ভাবে ভাল লেগেছে?

ডোনাল্ড: কেপ টাউনে চতুর্থ দিনে যে রকম বোলিং করেছে ভারতীয় পেসাররা, তা থেকে দারুণ ইতিবাচক তরঙ্গ পাওয়া উচিত টিমের। চতুর্থ দিন সকালে আসলে ৬৭-৬৮ রানে দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসকে মুড়িয়ে দিয়েছিল ওরা। দুর্দান্ত বোলিং পারফরম্যান্স। বিশ্বের যে কোনও প্রান্তেই হোক, এই বোলিং পারফরম্যান্স অন্যতম সেরা হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। ভারতীয় পেসারদের পরিণত বোধ আমাকে সবচেয়ে মুগ্ধ করেছে। সঠিক জায়গায় ওরা বল করে গিয়েছে। এমন নয় যে, দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটসম্যানরা ক্রিজে এসে উইকেট ছুড়ে দিয়ে গিয়েছে। একটাও আলগা উইকেট ছিল না। সব ক’টা ক্লাসিক ডেলিভারিতে অর্জন করা। আমার মনে হয়, বিরাট ওর বোলিং আক্রমণ নিয়ে খুব আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে কেপ টাউন টেস্টের পারফরম্যান্সের পরে। আমি প্রথম থেকেই বলে আসছি যে, পিচ যদি পেস-সহায়ক হয়, তা হলে দু’টো দলের মধ্যে ব্যবধান খুব কমে যাবে। কারণ ভারতের এখনকার বোলিং আক্রমণ খুবই ভাল এবং সমীহ করার মতো। আর ভারতের বোলিং আক্রমণে এখন সব কিছু আছে।

 

প্র: সব কিছু আছে বলতে বৈচিত্রের কথা বোঝাতে চাইছেন?

ডোনাল্ড: হ্যাঁ। এক্সপ্রেস গতিতে বল করার মতো পেস বোলার এখন ভারতের হাতে আছে। আবার ভুবনেশ্বর কুমার দারুণ সুইং করাতে পারে। ও অনেকটা ভার্নন ফিল্যান্ডারের ঘরানার। আমার খুব ভাল লেগেছে যশপ্রীত বুমরা-কে। প্রথম টেস্ট আন্দাজে নিজেকে দারুণ ভাবে সংগঠিত করেছে। খুব ভাল মানিয়ে নিয়েছে। দেখে মনে হয়েছে, টেস্ট ক্রিকেটের পৃথিবীতে খুব ভাল ভাবেই থাকতে এসেছে বুমরা। আমার মনে কোনও সন্দেহ নেই, বুমরার কাছ থেকে টেস্ট ক্রিকেটেও এ বার আমরা নেক কিছু দেখতে পাব। ওর বলে বেশ ভাল গতিও আছে। আমার মনে হয় না, কেপ টাউনের বোলিং আক্রমণ থেকে খুব বেশি পরিবর্তন ভারতীয় দল করতে চাইবে। আমাকে জিজ্ঞেস করলে বলব, একই বোলিং আক্রমণ নিয়েই নামা উচিত। আর আমি মনে করি, এই পরিবেশে দারুণ ভাবে সফল হওয়ার মতো দক্ষতা ভারতের বোলিং আক্রমণের আছে।

 

প্র: সেঞ্চুরিয়নের পিচে অশ্বিনকে খেলানো হবে নাকি বাড়তি ব্যাটসম্যান হিসেবে অজিঙ্ক রাহানের আসা উচিত, তা নিয়ে একটা তর্ক চলছে। আপনার কী মনে হয়?

ডোনাল্ড: আমি জানি না, পিচ থেকে কতটা ঘাস উড়িয়েছে ওরা। তবে সেঞ্চুরিয়নে বল টার্ন করে না। সে দিক দিয়ে রাহানেকে খেলাতে হলে অশ্বিনকে নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে ভারতীয় দলকে। রাহানে এই কন্ডিশনের জন্য ভাল ব্যাটসম্যান। গত বার এখানে খেলতে এসে রান করে গিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকাও ওকে সম্মান করে। জানে, ও এই পরিবেশে রান করার ক্ষমতা রাখে। রোহিত শর্মাকে কেন খেলিয়েছে ভারতীয় দল, সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। রোহিত দুর্দান্ত ফর্ম নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় এসেছে। তাই ওকে বসানো কঠিন। আবার এটাও বলব যে, এক জন বোলার কম নিয়ে সেঞ্চুরিয়নে খেলতে নামাটা খুব বুদ্ধিদীপ্ত পরিকল্পনা নয়।    

—ফাইল চিত্র।