ইংল্যান্ড ৩  :  মেক্সিকো ২

শেষ বাঁশিটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটার মাথা নিচু হয়ে গেল। ক্লান্ত শরীরটা যখন সাইডলাইনের দিকে ধীরে ধীরে আসছে, যুবভারতী উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে।

স্বপ্নপূরণ তার হয়নি। নায়ক হয়ে উঠতে উঠতে থেমে যেতে হয়েছে। বুধবার ভোরে সমূদ্রস্পৃষ্ঠ থেকে ন’হাজার ফিট উচ্চতায় যে অলৌকিক ফুটবল দেখেছে বিশ্ব, তা তো দেখতে পারত কলকাতাও। দেখতে পারত অবিশ্বাস্য এক প্রত্যাবর্তনও। কিন্ত তা হয়নি।

ইকুয়েডরের কুইটোয় ভোরের লিওনেল মেসি পেরেছিলেন আর্জেন্তিনাকে জেতাতে। সন্ধ্যার কলকাতার যুবভারতীতে মেক্সিকান মেসি— দিয়েগো লাইনেজ তার সব কিছু উজাড় করেও জেতাতে পারল না দেশকে। ইংল্যান্ডের কাছে ২-৩ হেরে দু’বারের চ্যাম্পিয়নদের কাপ স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার মুখে। ইংল্যান্ড উঠে গেল নক আউটে।

মেসিই তার আদর্শ, মেসিই তার স্বপ্নের নায়ক। ‘‘আমি সকালেই জেনেছিলাম, মেসি কী ভাবে হ্যাটট্রিক করে আর্জেন্তিনাকে জিতিয়েছে,’’ ম্যাচের পরে মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে বলার সময় একবার আলোকিত হয়ে উঠল লাইনেজের মুখটা। তার পরেই অন্ধকার, ‘‘আমি পারলাম না। হেরে গিয়ে খুব খারাপ লাগছে।’’  

আরও পড়ুন: চোকার নয়, প্রমাণ করল ফুটবলের জাদুকর

হেরে গিয়েছে ঠিকই, কিন্তু যুবভারতী কি সহজে ভুলে যেতে পারবে ১৭ বছরের লাইনেজ-কে? চেহারার সাদৃশ্য, দুর্দান্ত বল কন্ট্রোল আর অসাধারণ একটা বাঁ-পায়ের জন্য যাকে দেওয়া হয়েছে ওই বিশেষ নামটা— মেক্সিকান মেসি।

ফ্রি-কিকে দুরন্ত গোল ইংল্যান্ডের রিয়ান ব্রিউস্টারের।

ম্যাচটা হওয়ার কথা ছিল জ্যাডন স্যাঞ্চো বনাম এই মেক্সিকোর মেসিরই। ১৭ আর ১৯ মিনিটের মাথায় দেখা গেল দুই জিনিয়াসের ঝলক। প্রথমে বাঁ দিক থেকে বল পেয়ে, দু’জনকে ড্রিবল করে বক্সে ঢুকে এসেছিল লাইনেজ। কিন্তু ফাইনাল পাসটা বাড়াতে পারেনি। এর দু’মিনিটের মধ্যে মাঠের উল্টো দিকে একেবারে অ্যাকশন রিপ্লে। ঠিক একই ভাবে ড্রিবল করে বক্সে ঢুকে আসা। একই ভাবে ফাইনাল পাসে আটকে যাওয়া। এ বার কুশীলব স্যাঞ্চো।

এর পর যদি মনে হয়, প্রথম থেকেই ম্যাচটা জমে উঠেছিল, তা হলে ভুল ভাবা হবে। শুরু থেকে মনে হচ্ছিল, মাঠে একটাই দল, ইংল্যান্ড। একটা ওপেন নেট মিস, একটা দুর্দান্ত ভলি গোলে ঢুকলেও অফসাইড। বাঁ দিক থেকে স্যাঞ্চো, সঙ্গে ক্যালম হাডসন ওডোই এবং রিয়ান ব্রিউস্টারের ত্রিফলা তখন মেক্সিকান ডিফেন্সকে ছিঁড়ে ফেলছে।

যে চাপের সামনে ফাউল করে ফেলল মেক্সিকো, ৩৯ মিনিটে। গোলের ৩৫ গজ দূরে ফ্রি কিক। আগের ম্যাচে মোটামুটি এই জায়গা থেকেই অসাধারণ একটা বাঁক খাওয়ানো ফ্রি কিকে গোল করেছিল অ্যাঞ্জেল গোমেজ। কিন্তু গোমেজ তো প্রথম এগারোয় নেই। তা হলে কি ইংল্যান্ড ভুল করল ফ্রি কিক বিশেষজ্ঞকে না নামিয়ে? ভাবতে ভাবতে প্রেস বক্স থেকে দেখা গেল, বলটা শূন্যে উড়ে, কিছুটা রামধনুর মতো বাঁক খেয়ে গোলে ঢুকে গেল। আর স্কোরারের নাম সেই ব্রিউস্টার, যে কি না ম্যাচের শুরুতে ছ’গজের মধ্যে থেকে ফাঁকা গোলে বল মারতে পারেনি।

দ্বিতীয়ার্ধে ত্রিশূলটা একটু বদলে গেল। স্যাঞ্চোর সঙ্গে গোমেজ এবং ফিলিপ ফোডেন। আর তাতে মেক্সিকো ডিফেন্স আরও ফালাফালা হয়ে যেতে থাকে। স্যাঞ্চোর পাস থেকে ফোডেনের বাঁ পায়ের ভলি এবং তার পরে স্যাঞ্চোরই পেনাল্টি থেকে গোল। স্কোরলাইন ৩-০। যুবভারতী একতরফা ম্যাচ দেখতে দেখতে ঝিমিয়ে পড়েছে। আর তখনই ছেলেটা ম্যাচটা ধরল।

বাঁ পায়ের এক একটা টোকায় কেটে যেতে লাগল ইংলিশ ডিফেন্স। মেক্সিকান ওয়েভ কী জিনিস, বোঝা যাচ্ছিল। ৬৪ মিনিটে বক্সের ওপর থেকে মারা শটটা ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে জালে জড়িয়ে যেতেই স্টেডিয়ামের ঘুম ভাঙল। আট মিনিটের মধ্যেই বক্সের মধ্যে দু’জন ডিফেন্ডারকে টেনে এনে বাঁ দিকের কোণ ঘেঁষে প্লেসমেন্ট। স্কোর ইংল্যান্ড ৩ মেক্সিকান মেসি ২।

যুবভারতী গর্জে উঠল। এর পর যতবার লাইনেজ আক্রমণে উঠেছে, স্টেডিয়ামের চল্লিশ হাজার দর্শককে সঙ্গে পেয়েছে।

ম্যাচের পরে লাইনেজ এবং মেক্সিকোর কোচ মারিও আর্তেয়াগা, দু’জনেই বলে গেলেন, ‘‘এই যুবভারতী অসাধারণ। একে ভোলা যাবে না। আমরা আবার এখানে ফিরে আসতে চাই।’’

যুবভারতীও ভুলবে না। যুবভারতীও অপেক্ষায় থাকল।