আগামী বছর দক্ষিণ কোরিয়ার পিয়ংচ্যাংয়ে শীতকালীন অলিম্পিক্স থেকে নিষিদ্ধ করা হল রাশিয়াকে। তিন বছর আগে নিজেদের দেশে  শীতকালীন অলিম্পিক্সে রাষ্ট্র পরিচালিত ডোপিং করার অভিযোগেই এই শাস্তি।

দেশ হিসেবে তো পিয়ংচ্যাংয়ে অংশ নিতে পারবেই না রাশিয়া, তাদের সরকারের প্রতিনিধিদের কারও প্রবেশাধিকারও থাকছে না এই প্রতিযোগিতায়। রাশিয়া থেকে অ্যাথলিটরা অংশ নিতে পারবেন নিরপেক্ষ প্রতিযোগী হিসেবে। একমাত্র ডোপিংয়ের কালো দাগ না থাকা রুশ প্রতিযোগীদেরই নামতে দেওয়া হবে। সোচি অলিম্পিক্সের সময় রাশিয়ার ক্রীড়ামন্ত্রী ভিটালি মুটকো এবং তাঁর সহ-ক্রীড়ামন্ত্রী ইউরি নাগরনিখ-কে সমস্ত অলিম্পিক্স থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সন্দেহ যে, নিজেদের দেশে রাষ্ট্র পরিচালিত ডোপিংয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মুটকো।

আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির নেওয়া কঠোর সিদ্ধান্তে আরও জানানো হয়েছে, রাশিয়ার পতাকা উড়বে না ২০১৮ শীতকালীন অলিম্পিক্সে। বাজানো হবে না তাদের জাতীয় সঙ্গীতও। একটা আশঙ্কা ছিল যে, পিয়ংচ্যাং থেকে নির্বাসিত করা হলে রাশিয়াও সরে দাঁড়াতে পারে অলিম্পিক সংস্থা থেকে। ভবিষ্যতের সব অলিম্পিক্স তারা বয়কট করতে পারে। বুধবার রাত পর্যন্ত সে রকম কোনও বিবৃতি রাশিয়ার পক্ষ থেকে আসেনি। তবে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আগের মতোই রাষ্ট্র পরিচালিত ডোপিংয়ের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন,  এ সবই রাশিয়াকে টেনে নামানোর চক্রান্ত ছাড়া কিছু নয়।  

২০১৪ সালে সোচিতে শীতকালীন অলিম্পিক্সের আসর বসেছিল। ৩৩ পদক জিতে সেরা হয় রাশিয়া। তার এক-তৃতীয়াংশ পদক সন্দেহজনক বলে দাবি। পজকজয়ীদের অনেকের নাম নথিভূক্ত হয়েছে বিশ্ব ডোপ-বিরোধী সংস্থা ওয়াডা-র তালিকায়। কারও কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে পদকও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। 

আরও পড়ুন: ওয়ান ডে-র মতো এখন ব্যাট করছি টেস্টে, মত কোহালির

ডোপিংয়ের রোমহর্ষক এই কাহিনি ফাঁস করেন সোচি গেমসের সময় রাশিয়ার ডোপ-বিরোধী ল্যাবরেটরির ডিরেক্টর গ্রিগরি রচেঙ্কভ। তিনি জানান, অ্যাথলিটদের নমুনা সংরক্ষণের ঘরের পাশে বসেই সরকারের মদতে রাতের অন্ধকারে তাঁরা মুত্রের নমুনা পাল্টে দিতেন। এ ব্যাপারে তাঁদের সাহাষ্য করতেন রাশিয়ার ইন্টেলিজেন্স বিভাগের এক দুঁদে কর্তা। তিনি আরও জানান, শীতকালীন গেমস চালু হওয়ার আগে থেকেই রাশিয়ার ডোপিং সক্রিয়তা বেড়ে গিয়েছিল। মদ্যপানীয়ের মধ্যে মিশিয়ে রাশিয়ার অ্যাথলিটদের নাকি ডোপিং করানো হতো।

অভিযোগ ওঠার পরে বিশ্ব ডোপ-বিরোধী সংস্থা ওয়াডা তদন্তে নামে। একেবারে উটকো অভিযোগ যে নয়, সেটা তাদের অনুসন্ধানেও ধরা পড়ে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে অলিম্পিক সংস্থা। আইওসি প্রেসিডেন্ট থমাস বাখ বলেছেন, ‘‘রাশিয়ার ঘটনা অলিম্পিক গেমস এবং খেলার সততার উপর নজিরবিহীন আঘাত।’’ ওয়াডা-র এতকালের সুরক্ষিত ল্যাবরেটরির ‘কোড’ ভেঙে ঢুকে পড়ে সেখান থেকে ডোপ পরীক্ষার নমুনা ধরে রাখা বোতল বদলে ফেলার ঘটনা বিশ্বাস করাই কঠিন ছিল, মানছেন অলিম্পিক কর্তারাও।

ক্রীড়া বিশ্ব উৎসুক ফিফার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্যও। মুটকো এখন রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের খুবই ঘনিষ্ঠ। আগামী বছরেই রাশিয়ায় বসছে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর এবং মুটকো সেই বিশ্বকাপ আয়োজনে অন্যতম প্রধান ব্যক্তি। ফিফা এ দিন বলেছে, ‘‘অলিম্পিক সংস্থার সিদ্ধান্তের প্রভাব ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের উপর পড়বে না।’’ সেই মন্তব্য খুব ভাল ভাবে নেয়নি ক্রীড়া মহল। সোশ্যাল মিডিয়ায় ফুটবল ভক্তরা বলতে থাকেন, এমনিতেই দুর্নীতিতে ডুবে রয়েছে ফিফা। সেপ ব্লাটারের মতো প্রশাসককে সরে যেতে হয়েছে। তার পরে আবার ডোপিংয়ের দায়ে অভিযুক্ত রুশ মন্ত্রীকে কেন সমর্থন করা হচ্ছে?

 

রাতের অন্ধকারে কী ভাবে ডোপ করা রুশ অ্যাথলিটের মূত্রের নমুনা পাল্টে দেওয়া হতো নিষ্কলঙ্ক নমুনায়? সোচিতে শীতকালীন অলিম্পিক্স চলাকালীন রোমহর্ষক সেই ডোপিং-থ্রিলারের বিবরণী তুলে দেওয়া হল...

১. অ্যাথলিটদের থেকে পরিষ্কার নমুনা সংগ্রহ করে রাখা হয়েছিল সোচিতে শীতকালীন অলিম্পিক্স শুরুর কয়েক মাস আগে থেকে।

২. রুম নম্বর ১২৪-কে বাছা হয়েছিল কারণ তার পাশেই ছিল রুম নম্বর ১২৫। সরকারি ভাবে সংগ্রহ করা নমুনা রাখা থাকত যে ঘরটিতে।

৩. ডক্টর রচেঙ্কভ বোতলটি পেয়ে তুলে দিতেন এক বিশেষ ব্যক্তির হাতে। মনে করা হয়, এই ব্যক্তি রাশিয়ার ইন্টেলিজেন্স বিভাগের এক দুঁদে কর্তা। যাঁর অসাধ্য নাকি কিছুই নেই। বোতলটি নিয়ে তিনি চলে যেতেন কাছের এক আবাসনে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বোতলটি না ভেঙে রচেঙ্কভের হাতে তিনি ফিরিয়ে দিতেন ছিপি পুরো খোলা বা আলগা করা অবস্থায়।

৪. ইভেন্ট শুরুর পরে ডোপ পরীক্ষায় ডাক পাওয়া অ্যাথলিট মোবাইলে ছবি তুলে রাখতেন ডোপ সংক্রান্ত বিশেষ ফর্মের (নাম ডোপিং কন্ট্রোল ফর্ম)। সেই ছবি অ্যাথলিট পাঠিয়ে দিতেন বিশেষ এক ব্যক্তির কাছে। কোন নমুনাটি কার, মোবাইলে পাঠানো এই ছবি থেকেই পরিষ্কার হয়ে যেত।

৫. মূত্র নমুনা সংগ্রহ করে যে বোতলে রাখা হতো, সেটি বিশেষ ভাবে তৈরি হয় বিশ্ব ডোপ-বিরোধী সংস্থা (ওয়াডা)-র নির্দেশে। একটি সুইস সংস্থা (বার্লিংগার) এমন ভাবে এই বোতলটি তৈরি করে, যাতে বোতলের মুখ একবার বন্ধ করে দিলে, না ভেঙে কিছুতেই খোলা যাবে না। 

৬. মূত্রের নমুনা রাখার বোতলটি বিশেষ ভাবে সুরক্ষিত তো থাকতই, ব্যবহার করা হতো ‘কোড’-ও। যার সন্ধান কারও পাওয়ার কথাই নয়। তবু কীভাবে বোতলের মুখ খুলে ফেলতেন রুশ ইন্টেলিজেন্স বিভাগের ওই ব্যক্তি, তা দেখেই তাজ্জব হয়ে গিয়েছেন ওয়াডা-র কর্তারা!

৭. রাশিয়ার ডোপ-বিরোধী ল্যাবরেটরির প্রাক্তন ডিরেক্টর গ্রিগরি রচেঙ্কভ এই রোমহর্ষক ডোপিং প্রক্রিয়ার কথা ফাঁস করেন। তাঁর কথায়, সরকার নিযুক্ত এক ক্রীড়া কর্তা তাঁকে প্রত্যেক রাতে একটি তালিকা পাঠাতেন। তাতে চিহ্নিত করা থাকত কাদের নমুনা পাল্টাতে হবে।

৮. মাঝরাত পেরিয়ে ডক্টর রচেঙ্কভ একটি সংকেত পেতেন। তার পরেই শুরু হতো তাঁর কাজ। সংকেত পেয়েই তিনি চলে যেতেন রুম নম্বর ১২৪-এ। যেটা আদতে ছিল একটি স্টোরেজ। কিন্তু সোচি অলিম্পিক্সের সময় পরিণত করে ফেলা হয়েছিল অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরিতে। অভিযোগ, এই ঘরেই ঘটেছে  ইতিহাসের সবচেয়ে রোমহর্ষক ডোপিং কাহিনিগুলোর একটি।

৯. যখন ওয়াডা-র ডাক্তাররা ইভেন্টের সময় সংগ্রহ করা এই নমুনা পরীক্ষা করেন, বোতলের মুখটিকে একটি বিশেষ যন্ত্র দিয়ে ভাঙতে হয়। সেই যন্ত্রটিও সুইস সংস্থাটিই সরবরাহ করে। এতটাই নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং সতর্কতা অবলম্বন করা হয় ডোপ পরীক্ষা নিয়ে।

১০. রাতের অন্ধকারে রুম নম্বর ১২৪-এ মুখ বন্ধ করা বোতল হাতে পেতেন ডক্টর রচেঙ্কভ। ওয়াডা-র তদন্তে বেরিয়েছে, রুম নম্বর ১২৫ এবং ১২৪-এর মধ্যে একটি ছোট্ট গর্ত তৈরি করা হয়েছিল। অভিযোগ, সেই গর্ত দিয়েই সংগৃহীত নমুনার বোতলটি আসত রচেঙ্কভের হাতে।

১১. ডক্টর রচেঙ্কভের হাতে ছিপি খোলা অবস্থায় বোতলটি ফিরে আসার পরেই শুরু হয়ে যেত ‘বিশেষ’ কাজ। ইভেন্টে সংগৃহীত রুশ অ্যাথলিটদের সন্দেহজনক নমুনা ফেলে দিয়ে বোতলে রেখে দেওয়া হতো কয়েক মাস আগে সংগ্রহ করা পরিষ্কার মূত্র। তার পর তা আবার মুখ আটকে রেখে দেওয়া হতো ১২৫ নম্বর রুমে। ওয়াডা-র ডাক্তাররা পরীক্ষার সময় ডোপ করা নমুনা নয়, পরিষ্কার নমুনা হাতে পেতেন।

১২. সোচিতে ৩৩টি পদক জিতেছিল রাশিয়া। পদকজয়ীদের এক-তৃতীয়াংশের নাম রয়েছে ডোপিং তালিকায়। ঘটনা সাংঘাতিক কারণ, সরকারি পরিকল্পনায় ডোপিং হয়েছিল বলে অভিযোগ। তার জেরেই বুধবার রাশিয়াকে সাসপেন্ড করেছে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি। পিয়ংচ্যাংয়ে আসন্ন শীতকালীন অলিম্পিক্সে নামতে পারবে না রাশিয়া।