ক্ষমতায় এসেই জেলা স্বাস্থ্য অধিকর্তাদের কড়া অনুশাসনে বেঁধেছিলেন তিনি। এ বার সরকারি ডাক্তারদের ছুটির নিয়ন্ত্রণও হাতে নিচ্ছেন স্বাস্থ্যসচিব অনিল বর্মা।

স্বাস্থ্য দফতর রীতিমতো নির্দেশিকা জারি করে সরকারি চিকিৎসকদের ছুটির রাশ স্বাস্থ্য সচিবের হাতে তুলে দিয়েছে। এর ফলে পুজো, দীপাবলি বা ক্রিসমাস কিংবা বর্ষশেষের মতো উৎসবের মরসুমে সরকারি হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ এবং ব্লাডব্যাঙ্ক খালি করে ডাক্তারবাবুদের অবকাশযাপনের প্রচলিত অভ্যাসে হয়তো দাঁড়ি পড়তে চলেছে।

২৮ ডিসেম্বর জারি করা সেই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে: ইএল, হাফ-ডে লিভ ও কমিউটেড লিভ (বেতনহীন ছুটি) মিলিয়ে বছরে ১৫টি ছুটি নেওয়া হয়ে গেলেই পরবর্তী কোনও ছুটির জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি চিকিৎসককে খোদ স্বাস্থ্যসচিবের অনুমতি নিতে হবে। যখন-তখন ইচ্ছেমতো কাজে ডুব দেওয়ার দিন শেষ। সরকারি ডাক্তারদের ছুটি দেওয়ার ক্ষমতা স্বাস্থ্যসচিবের হাতে কেন্দ্রীভূত হল। সরকারি চিকিৎসককে ইএল, হাফ-ডে লিভ এবং কমিউটেড লিভের জন্য ৩০ দিন আগে অনলাইনে আবেদন জানাতে হবে। সেই ছুটি বছরে ১৫ দিনের কম গোত্রে পড়লেও ছুটি অনুমোদনের তথ্য নথিভুক্ত রাখতে হবে স্বাস্থ্যসচিবের কাছে। শুধু সিএল দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হাতে।

এ-হেন নির্দেশিকায় অধিকাংশ ডাক্তারই ক্ষুব্ধ। তবে স্বাস্থ্যকর্তাদের যুক্তি, একসঙ্গে চিকিৎসকেরা ছুটি কাটাতে যাওয়ায় রোগীরা পরিষেবা পাচ্ছেন না। অস্ত্রোপচার আটকে থাকছে। ব্লাডব্যাঙ্কে শিবির করা যাচ্ছে না। এমনকী রোগীর জীবনসংশয় হচ্ছে হাসপাতালে। ধাক্কা খাচ্ছে ডাক্তারি পঠনপাঠনও। হাসপাতাল চালানোই দায় হয়ে উঠছে। তাই এই জায়গাটায় রাশ টানা দরকার ছিল। ইচ্ছেমতো ছুটির উদাহরণ? কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের অ্যানেস্থেশিয়া বিভাগের প্রফেসর দেবব্রত সর্বপল্লি দেড় বছরের বেশি সময় ধরে ছুটি নিয়ে বসে আছেন।
শুধু মেডিক্যাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (এমসিআই)-র পরিদর্শনের দিন তিনি হাজিরা দেন। তাঁর কথায়, ‘‘অনেক দিন অবসাদে রয়েছি। তাই যাই না।’’

স্বাস্থ্য ভবন সূত্রের খবর, বর্মা স্বাস্থ্যসচিব হয়েই জেলা স্বাস্থ্য অধিকর্তাদের সাপ্তাহিক কাজ নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। এতে জেলায় স্বাস্থ্য প্রশাসনের কাজে গতি এসেছিল। সম্প্রতি জেলায় জেলায় সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে তাঁর চোখে পড়ে, কিছু চিকিৎসক, বিশেষত সিনিয়র চিকিৎসকেরা বছরের কোনও কোনও সময়ে দলবদ্ধ ভাবে দীর্ঘ ছুটি নিচ্ছেন। স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা দেবাশিস ভট্টাচার্যের পর্যবেক্ষণ, ডাক্তারবাবুরা যখন-তখন অন্য কলেজে পরীক্ষা দিতে, সেমিনার করতে
কিংবা নিছক ছুটি কাটাতে চলে যাচ্ছেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। ‘‘একসঙ্গে সকলে ছুটিতে চলে গেলে হাসপাতাল চলবে কী করে? তাই ছুটির ব্যাপারে একটা ‘সিঙ্গল হ্যান্ডেড কন্ট্রোল’ রাখতে চাইছেন স্বাস্থ্যসচিব,’’ বলেন দেবাশিসবাবু।

মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসকদের হাজিরায় কড়াকড়ি করেছে এমসিআই ও ডেন্টাল কাউন্সিল। ২১ ডিসেম্বর বর্ধমান ডেন্টাল কলেজে কাউন্সিলের পরিদর্শনের সময়ে একসঙ্গে ২৬ জন শিক্ষক-চিকিৎসক অনুপস্থিত ছিলেন। তা নিয়ে গত ২৮ ডিসেম্বরই কড়া চিঠি দিয়েছে ডেন্টাল কাউন্সিল। কেন্দ্রের নতুন স্বাস্থ্য কমিশনও হাজিরার ক্ষেত্রে একই পথের পথিক। স্বাস্থ্য দফতরের বক্তব্য, হাজিরা ঠিক না-হলে কলেজে পঠনপাঠনের অনুমোদনও যে মিলবে না, রাজ্য সরকার সেটা বুঝেছে।

বিদায়ী স্বাস্থ্য অধিকর্তা বিশ্বরঞ্জন শতপথী জানাচ্ছেন, ওয়েস্টবেঙ্গল সার্ভিস রুলে বলা রয়েছে, কর্মীদের ছুটির বিষয়টি কে দেখাশোনা করবেন, সেটা সংশ্লিষ্ট দফতর ঠিক করবে। এত দিন ডাক্তারদের বছরে ১২০ দিন পর্যন্ত ছুটির অনুমোদন দিতে পারতেন সুপার, অধ্যক্ষ বা সিএমওএইচ। ‘‘এখন তাঁরা ১৫ দিনের বেশি ছুটি মঞ্জুর করতে পারবেন না। নতুন নির্দেশিকার ফলে কে, কখন, কোথায় ক’দিনের ছুটিতে যাচ্ছেন, তার উপরে স্বাস্থ্যসচিব নজরদারি চালাতে পারবেন,’’ বলেন বিশ্বরঞ্জনবাবু।