শিষ্য এবং ভক্তদের স্বামী বিবেকানন্দ একটি আশ্চর্য কথা বলতেন। বলতেন, ‘তোদের এমনই ভালবাসি যে খুব খুশি হব, যদি শুনি যে তোরা অপরের জন্য খেটে খেটে মরে গিয়েছিস!’ তাঁর অধিকাংশ শিষ্যই অপরের জন্য অকল্পনীয় পরিশ্রম করে খুব কম বয়সে বিদায় নেন। তাঁদের মধ্যে যেমন সুপ্রসিদ্ধ ভগিনী নিবেদিতা আছেন, তেমনই আছেন তুলনায় কম পরিচিত স্বামী স্বরূপানন্দ। শ্রীরামকৃষ্ণের শিষ্য এবং স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি ভক্তিতে অবিচল স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ দক্ষিণ ভারতে স্বামীজির ‘আত্মনো মোক্ষার্থম্ জগদ্ধিতায় চ’ বাণীকে সার্থক করে তোলার জন্য অনলস এবং নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাঁর অকালপ্রয়াণ ঘটে। দক্ষিণ ভারতে তিনি যে আন্দোলন শুরু করেন, তা এখন মহীরূহের আকার ধারণ করেছে— লক্ষ লক্ষ দুর্গত মানুষ সেখানে শ্রীরামকৃষ্ণের অনন্য আশীর্বাদে ধন্য হয়ে চলেছেন, যে আশীর্বাদের চারটি রূপ: অন্নদান, প্রাণদান, বিদ্যাদান এবং জ্ঞানদান।

রামকৃষ্ণ আন্দোলন মূর্ত হয়েছে রামকৃষ্ণ মিশন এবং মঠের মধ্য দিয়ে। এই আন্দোলনের অপরূপ স্বাতন্ত্র্য হল, এটি এমন এক সম্প্রদায়, যার কোনও সাম্প্রদায়িকতা নেই। কিংবা, স্বামী বিবেকানন্দের কথায়, এটি এমন এক গোষ্ঠী, যার কোনও গোষ্ঠী-সত্তা নেই। এই প্রতিষ্ঠান সবাইকে আপন করে নেয়, নিজের করে নেয়, এর চরিত্র সর্বজনীন। ব্যক্তি আসেন, যান, শ্রীরামকৃষ্ণের আদর্শের অক্ষয় মহিমায় এই সংঘ উজ্জ্বল, অমলিন থেকে যায়। ব্যক্তি যত বড়ই হোন, রামকৃষ্ণ সম্প্রদায়ে তাঁর কোনও আনুষ্ঠানিক আরাধনা হয় না, শ্রীরামকৃষ্ণই একমাত্র আরাধ্য (তার সঙ্গে আছেন ঠাকুরের শক্তিস্বরূপিণী মা সারদাদেবী, তাঁর পরমপ্রিয় নরনারায়ণ ঋষি স্বামী বিবেকানন্দ এবং তাঁর প্রত্যক্ষ শিষ্যগণ। পরে যাঁরা এসেছেন তাঁরা পরমানন্দে পুরুষোত্তম যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণের মহিমায় ও ঐশ্বর্যে একীভূত হয়ে যান।

এমনই এক জন হলেন আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় স্বামী আত্মস্থানন্দজি, রামকৃষ্ণ মঠ এবং মিশনের প্রেসিডেন্ট মহারাজ। তিনি রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের আদর্শ পূরণের জন্য নিজের জীবনের শেষ মুহূর্ত অবধি কাজ করে গিয়েছেন, সার্থক করেছেন স্বামীজির সেই বাণী: অপরের জন্য খেটে খেটে মরে যা। তরুণতর সন্ন্যাসী এবং শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্তদের কাছে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, এক অসামান্য প্রেরণা।

সেটা ১৯৭৬-৭৭ সাল। রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠের তৎকালীন সহকারী সাধারণ সম্পাদক, প্রয়াত স্বামী গম্ভীরানন্দজির আগ্রহে এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট, স্বামী বীরেশ্বরানন্দজির মধ্যস্থতায় স্বামী আত্মস্থানন্দজিকে বেলুড় মঠে নিয়ে আসা হল। তখন সেখানে উদ্যমী নেতৃত্বের খুব প্রয়োজন। সে সময় স্বামী আত্মস্থানন্দজি ছিলেন গুজরাতের রাজকোটে রামকৃষ্ণ আশ্রমের প্রধান। সেখানেই এক তরুণ রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শিক্ষা গ্রহণ করছিলেন, তাঁর নাম নরেন্দ্র মোদী। তিনি স্বামী আত্মস্থানন্দকে গভীর ভাবে শ্রদ্ধা করতেন, তাঁকে গুরুজি বলে সম্বোধন করতেন।

আরও পড়ুন:রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী আত্মস্থানন্দ প্রয়াত

স্বামী আত্মস্থানন্দজির উপস্থিতি এবং কথা মানুষকে প্রবল অনুপ্রেরণা দিত। তাঁর দৃপ্ত কণ্ঠস্বর কী ভাবে সরাসরি শ্রোতার হৃদয়কে মথিত করত, সেটা বেলুড় মঠে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন, পৌরুষই তাঁর নতুন ধর্মবাণী। যাঁরাই স্বামী আত্মস্থানন্দজির সংস্পর্শে এসেছেন, তাঁরাই বলবেন, এই পৌরুষ কী ভাবে তাঁর আচরণে, চলাফেরায়, কথাবার্তায়, কণ্ঠস্বরে, ভক্তিতে, ভালবাসায় নিহিত ছিল, কী ভাবে তা তাঁর ব্যক্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। স্বামী বিবেকানন্দের মতোই তিনিও প্রয়োজনে কঠোর তিরস্কার করতেন। কিন্তু সেই তিরস্কারের পরেই মিলত তাঁর কোমল স্নেহময় স্পর্শ। তাঁর ভক্তি ছিল আবেগময়, তাই তাঁর আচরণে কঠোরতা এবং কোমলতার খুব দ্রুত পালাবদল ঘটত, তাঁর দু’চোখ সহজেই অশ্রুপূর্ণ হয়ে উঠত। তাঁর স্বভাব ছিল খোলামেলা এবং স্বচ্ছ। নিজের মনোভাব গোপন করে একটা নকল ব্যক্তিত্ব ধরে রাখার চেষ্টা করা তাঁর ধাতে ছিল না। কারও ওপর ক্রুদ্ধ হলে তাঁর রুদ্রমূর্তি তার অন্তরাত্মা সুদ্ধ কাঁপিয়ে দিত, আবার পরমুহূর্তেই তিনি হয়ে উঠতেন কোমল করুণার প্রতিমূর্তি। মনে হত, ভর্ৎসনার পরে যদি এমন ভালবাসা মেলে, তবে আরও ভর্ৎসনা করুন তিনি!

এই স্বচ্ছ, অকৃত্রিম ব্যক্তিত্বের গুণে যেমন তিনি সকলের প্রিয় ছিলেন, তেমনই ছিলেন স্বাভাবিক নেতৃত্বের অধিকারী। স্বামী বিবেকানন্দ প্রায়ই বলতেন, শ্রীরামকৃষ্ণ কেমন করে তাঁকে ‘বীর’ বলে সম্বোধন করতেন, তাঁর অন্য শিষ্যদের আত্মিক ভাবে বীর হতে উদ্বুদ্ধ করতেন— কাঁদুনে, ঘ্যানঘেনে ভক্ত নয়, মহাবীর হনুমানের মতো শৌর্যময় ভক্ত হতে বলতেন। স্বামী আত্মস্থানন্দজির সংস্পর্শে যাঁরা এসেছেন, তাঁরাই সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মধ্যে দেখেছেন এক যথার্থ ‘বীর’কে, এক নির্ভীক সৈনিককে, যিনি পরবর্তী জীবনে ‘আত্মনো মোক্ষ’ এবং ‘জগদ্ধিত’য় সমর্পিতপ্রাণ রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ বাহিনীর সেনাপতির দায়িত্ব নিয়ে বিবেকানন্দের সেই উপদেশ আক্ষরিক অর্থে নিজের জীবনে রূপায়িত করেছেন: অপরের জন্য খেটে খেটে মরে যা।

তিনি বলতেন, তাঁর তিনটি পরম ইচ্ছা আছে। এক, একটি বড় হাসপাতাল গড়ে তোলা। দুই, শ্রীরামকৃষ্ণের একটি বিরাট বিশ্বজনীন মন্দির প্রতিষ্ঠা করে সেখানে আলোচনা, ভজন, ধ্যান ইত্যাদির মাধ্যমে তাঁর মতাদর্শ প্রচারের আয়োজন করা। তিন, আত্মিক উত্তরণ ও মুক্তির জন্য সকলকে রামকৃষ্ণ মন্ত্রে দীক্ষা দেওয়া। এই তিনটি অভীষ্টই তিনি পূরণ করে গিয়েছেন। এক, রেঙ্গুনে তিনি একটি চমৎকার হাসপাতাল তৈরি করান। আক্ষেপের কথা, সেই হাসপাতাল সে দেশের সরকারের হাতে তুলে দিয়ে তাঁকে বিষণ্ণচিত্তে দেশে ফিরে আসতে হয়েছিল। দুই, রাজকোটে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের এক সুন্দর বিশ্বজনীন মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। সেটির আনুষ্ঠানিক উৎসর্গের আগেই অবশ্য তাঁকে বেলুড় মঠের দায়িত্ব নিয়ে চলে আসতে হয়। তিন, হাজার হাজার ভক্তকে তিনি শ্রীমকৃষ্ণ মন্ত্রে দীক্ষা দেন, যে মন্ত্রের বন্দনায় স্বামী বিবেকানন্দ গেয়েছিলেন তাঁর প্রসিদ্ধ আরাত্রিক স্তোত্র।

এই তিনটি কাজ সম্পন্ন করার পরে বেলুড় মঠের প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বামী আত্মস্থানন্দজি এক ভিন্ন মূর্তিতে স্থিত হন— শান্ত, বেশির ভাগ সময় জপে ও ধ্যানে আত্মস্থ, ভালবাসা ও স্নেহে পরিপূর্ণ, অগণিত সন্ন্যাসী ও ভক্তের প্রতি আশীর্বাদ প্রদানে রত। এক বছরের বেশি সময় শয্যাশায়ী থেকে কেন তাঁকে এতটা ভোগ করতে হল, সেই রহস্যের সম্যক উত্তর জানার সামর্থ্য মানুষের নেই। ভক্তজনের বিশ্বাস, যে অগণিত মানুষকে তিনি মহামন্ত্রে দীক্ষিত করেছেন, তাঁদের কর্মফল কোনও দুর্জ্ঞেয় পথে তাঁর পার্থিব শরীরে প্রবিষ্ট হয়েছে, আর সেটাই ইহজীবনের শেষভাগে সেই নশ্বর শরীরের যন্ত্রণার কারণ। অবশ্য, আমরা যাকে যন্ত্রণা ভেবেছি, তা কি নিতান্তই বাইরের কিছু লক্ষণমাত্র? আসলে কি তিনি আপনার গভীরে এক স্বর্গীয় আনন্দ উপভোগ করছিলেন? কে বলতে পারে? ঈশ্বরই একমাত্র সেই উত্তর জানেন।

স্বামী বিজ্ঞানানন্দজির শিষ্য ছিলেন তিনি। শ্রীরামকৃষ্ণের প্রত্যক্ষ শিষ্যদের যাঁরা শিষ্য, তিনি ছিলেন সেই বর্গের শেষ প্রতিনিধি। তাঁর প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গে একটা যুগের অবসান ঘটল। কিন্তু রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ আন্দোলনের ধারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রবাহিত হয়ে চলবে, ঠিক যেমনটি বলে গিয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ।

আলফ্রেড টেনিসনের (দ্য ব্রুক) ছোট নদী নিজের জীবনের কথা শেষ করেছিল এই কথা বলে: ‘মেন মে কাম অ্যান্ড মেন মে গো, বাট আই গো অন ফর এভার।’ (মানুষ আসবে, মানুষ যাবে, আমি চিরকাল প্রবাহিত হব।) এই লেখকের কিশোর বয়সে রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট, প্রয়াত স্বামী কৈলাসানন্দজির আধ্যাত্মিক তত্ত্বাবধানে অনুরূপ একটি বাণী আত্মস্থ করার পরম সৌভাগ্য হয়েছিল: ‘সন্ন্যাসীরা আসতে পারেন, সন্ন্যাসীরা যেতে পারেন, কিন্তু ঠাকুর চিরকাল থাকবেন।’ ওঁ তৎ সৎ।

 

(লেখক রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ বিশ্ববিদ্যালয়, বেলুড় মঠের উপাচার্য)