তিনি নিজে মনে করেন, তিনি এর যোগ্য নন। কিন্তু এই সম্মান তাঁর জীবনকে পূর্ণ করে দিল। বৃহস্পতিবার  আচার্য কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর হাত থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডিলিট গ্রহণ করে বললেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

ক’মাস আগে যখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মুখ্যমন্ত্রীকে সাম্মানিক ডিলিট দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন, বিতর্ক শুরু হতে দেরি হয়নি। কেন মুখ্যমন্ত্রীকে ডিলিট দেওয়া হবে, কী তার উদ্দেশ্য, তাই নিয়ে কাটাছেঁড়া শুরু হয়। হাইকোর্টে এ নিয়ে মামলাও চলছে। এই আবহে মুখ্যমন্ত্রী যে নিজেও বিব্রত ছিলেন, সেটা এ দিন তাঁর কথায় স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। ডিলিট পাওয়ার পরে দীক্ষান্ত ভাষণে মমতা বলেন, তাঁর জীবনটাই অবহেলার, অসম্মানের। এমনকী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যখন তাঁকে এই সম্মান দেওয়ার চেষ্টা করছেন তা নিয়েও তাঁকে কম অসম্মান করা হয়নি। তিনি আদৌ এ দিন এই সম্মান গ্রহণ করতে আসবেন কি না, তা নিয়ে দোটানায় ছিলেন।

মমতার কথায়, ‘‘আসার আগে আজকে পার্থদাকে (শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়) বলছিলাম, আমার মনের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব হচ্ছে যাব কি যাব না। আমি সে সব জায়গায় যেতে চাই যেখানে মিনিমাম সম্মানটুকু পাওয়া যায়। যেখানে সম্মান পাওয়া যায় না সেখানে যেতে চাই না।’’ সমাবর্তন শেষে পার্থবাবুও একই সুরে জানান, এই ডিলিট নিয়ে যে ভাবে নানা জনে নানা কথা বলছেন তাতে মুখ্যমন্ত্রী আহত। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘‘আজ সকালে উনি খুবই আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। আমি বলি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ এই সম্মান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আচার্য তথা রাজ্যপাল তা অনুমোদন করেছেন। সকলে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।’’

আরও পড়ুন: প্রকাশ্যে এসেও সুর নরম গুরুঙ্গর

তবে শেষ পর্যন্ত সমাবর্তনে এসে যে তাঁর খুবই ভাল লেগেছে, সেটা অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীর কথাতেই পরিষ্কার। তিনি বলেন, ‘‘বিশ্বাস করুন আমি কিন্তু ডিগ্রিটা কোনও দিন ব্যবহার করব না। আপনারা আমাকে সাম্মানিক দিয়েছেন, সেটা সাম্মানিকই থাকবে। কিন্তু আপনারা আমার জীবনকে পূর্ণ করে দিয়েছেন।’’ এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রাক্তন ছাত্রী তিনি। কখনও ভাবেননি, এ ভাবে এক দিন সমাবর্তনে ভাষণ দেবেন। আগেও তাঁকে অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে এ ধরনের সম্মান দিতে চেয়েছিল। তিনি রাজি হননি। ‘‘আমি ক্ষুদ্র মানুষ। আমার এ সবের যোগ্যতা নেই বলেই গ্রহণ করিনি...সারা জীবন লড়াই করতে করতে, মরতে মরতে একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি।’’

এ দিন মুখ্যমন্ত্রীকে সাম্মানিক ডিলিট দেওয়া হয়েছে সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং সামাজিক ক্ষেত্রে অবদানের জন্য। বিরোধীরা কটাক্ষ করছেন তা নিয়েই। বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের মন্তব্য, ‘‘সরকার এমন এক জনকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করেছে, যিনি কোনও দিন কলেজে পড়াননি। তিনিও প্রতিদানে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন!’’ বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু বলেন, ‘‘যে বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকার অনুদান দিচ্ছে, সেই সরকারেরই প্রধানকে বিশ্ববিদ্যালয় ডিলিট দিচ্ছে, অদ্ভুত ব্যাপার!’’ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ডিলিট দিয়েছিল জ্যোতি বসুকেও। নিজেই সেই প্রসঙ্গ এনে বিমানবাবু বলেন, ‘‘তখন জ্যোতিবাবু মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন না।’’

একটু ভিন্ন মত অবশ্য কংগ্রেসের ওমপ্রকাশ মিশ্রের। তাঁর বক্তব্য, ‘‘কেন্দ্রীয় সরকারে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রক সামলেছেন মমতা। গত ছ’বছর ধরে তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সমাজসেবার স্বীকৃতি দিতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যদি ডিলিট দেয়, এত বিতর্কের কী আছে? যদি প্রণব মুখোপাধ্যায়কে ডিলিট দিতে পারে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, তা হলে মমতাকে নয় কেন? রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু এমন ব্যক্তিগত আক্রমণ সমর্থন করছি না।’’