বৃহস্পতিবার কার্যত আত্মসমর্পণের সুরে বিমল গুরুঙ্গ জানিয়েছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তিনি আলোচনায় বসতে রাজি। তাঁর মুখে গোর্খাল্যান্ড প্রসঙ্গও শোনা যায়নি। তার পরে ২৪ ঘণ্টা চলে গিয়েছে। এখন প্রশ্ন, মুখ্যমন্ত্রী এর পরে কী করবেন? রাজ্য প্রশাসন সূত্রে খবর, তিনি এখনই এই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে বুঝতে চাইছেন, গুরুঙ্গ কি সত্যিই বোঝাপড়া করতে চান? নাকি এর পিছনে গুরুঙ্গ এবং বিজেপির অন্য কোনও মতলব রয়েছে?

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্র থেকে অবশ্য জানা গিয়েছে, গত কয়েক মাসে যে ভাবে পাহাড়ে নেতৃত্বের হাল ধরতে শুরু করেছেন বিনয় তামাঙ্গ, জিটিএ-র কেয়ারটেকার বোর্ডের পাশাপাশি যে ভাবে তাঁরা পাহাড়ের পুরসভাগুলিও দখল করেছেন, তাতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল ‘ফেরার’ গুরুঙ্গের। তাই বেশ কিছু দিন ধরেই তিনি মমতার সঙ্গে আলোচনায় বসতে চাইছিলেন। এ জন্য তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী স্বরাজ থাপাকেও দৌত্য করতে পাঠাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নিজে না বসে গুরুঙ্গের প্রতিনিধিকে রাজ্য পুলিশের আইজি-র সঙ্গে বসতে বলেন মমতা। ভানুভবনে হামলার ঘটনায় স্বরাজ অন্যতম অভিযুক্ত। তাই এই বৈঠকের প্রস্তাব ভেস্তে যায়।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ কিন্তু চাইছিলেন মমতার সঙ্গে গুরুঙ্গকে বসাতে। কারণ, গুরুঙ্গের দলের শরিক বিজেপি। পাশাপাশি বিজেপির একাংশ বিশ্বাস করে, পাহাড়ের সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও গুরুঙ্গের প্রভাব যথেষ্ট। দার্জিলিঙের সাংসদ সুরেন্দ্র সিংহ অহলুওয়ালিয়া নিজেই এক সময় দৌত্য করতে চান। কিন্তু গুরুঙ্গ-অহলুওয়ালিয়ার কথোপকথনের কথা জেনে যান মমতা। তাঁর ধারণা হয়, গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনকে উস্কে রাজ্য সরকারকে বিপাকে ফেলতে চাইছে কেন্দ্র। ফলে অহলুওয়ালিয়ার সঙ্গে বৈঠকে তিনি রাজি হননি। 

এর মধ্যে গুরুঙ্গের প্রতিনিধিদের সঙ্গে রাজনাথের কথা হয়। তাঁদের তিনি বলে দেন, মমতাকে বাদ দিয়ে ত্রিপাক্ষিক বৈঠক সম্ভব নয়। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্পর্ক ভাল। সেই সুবাদে মমতাকে রাজনাথ এখন বলছেন, বর্তমানে গুরুঙ্গ সব দিক থেকে যথেষ্ট দুর্বল। তাঁর সঙ্গে বসার এটাই উপযুক্ত সময়। বিনয় তামাঙ্গ জিটিএ প্রধান হলেও ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে দুর্বল গুরুঙ্গকে ডাকলে মমতার পক্ষে দার্জিলিঙের উপরে পুরো নিয়ন্ত্রণ আনা সম্ভব হবে।

মমতা কিন্তু মনে করেন, বিনয় ধীরে ধীরে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দখল করছেন। এই প্রক্রিয়াকে ভেস্তে দিতেই যে গুরুঙ্গ বৈঠকে বসতে চাইছেন না, তা কে বলতে পারে! আগামী ১৫ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে গুরুঙ্গের করা মামলার শুনানি রয়েছে। সেখানে নিজের গতকালের বিবৃতি দেখিয়ে গুরুঙ্গ বলতেই পারেন, তিনি দেশদ্রোহী নন। গোর্খাল্যান্ডেরও কথা বলছেন না। তখন তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলির তদন্তভার কেন্দ্রীয় কোনও সংস্থাকে দিতে পারে আদালত। গুরুঙ্গের এই কৌশলের কথা আঁচ করতে পারছে রাজ্য প্রশাসন। তাই তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে তড়িঘড়ি আলোচনায় না বসে আরও একটু দেখে নিতে চাইছেন মমতা। গুরুঙ্গের আসল মতলবটা কী, তা হলে সেটা আর একটু স্পষ্ট হবে— মনে করছে রাজ্য।