নতুন জেলা গঠনের পরে মুখ্যমন্ত্রীর প্রথম ঝাড়গ্রাম সফর, প্রথম প্রশাসনিক বৈঠক। আর সেখানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করে দিলেন, জঙ্গলমহলের এই জেলার উন্নয়নের কাজে তিনি সন্তুষ্ট নন। পদক্ষেপেও দেরি করেননি তিনি।

মঙ্গলবার প্রশাসনিক বৈঠকের পরেই অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ মন্ত্রী চূড়ামণি মাহাতোকে তৃণমূলের ঝাড়গ্রাম জেলা সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত জেলা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুরে দলের জেলা সভাপতি অজিত মাইতিকে। সমান্তরাল ভাবে ঝাড়গ্রামের জেলাশাসক আর অর্জুনের মাথায় বসানো হয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলাশাসক জগদীশপ্রসাদ মিনাকে। ঝাড়গ্রাম জেলাপরিষদের ভারপ্রাপ্ত পদে থাকা পশ্চিম মেদিনীপুরের অতিরিক্ত জেলাশাসক সজলকান্তি টিকাদারকেও সরিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ঝাড়গ্রামের অতিরিক্ত জেলাশাসক টি সুব্রহ্মণ্যমকে।   

এ দিন দুপুরে ঝাড়গ্রামে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে প্রশাসনিক বৈঠকের শুরুতেই মুখ্যমন্ত্রী জেলার প্রশাসনিক কর্তাদের বলেন, ‘‘আপনাদের পারফরম্যান্স ভাল নয় বলেই আমাকে প্রশাসনিক বৈঠক করতে আসতে হয়েছে।’’ এলাকার একটি স্কুলের সমস্যা থেকে শুরু করে হাতির হানায় ফসলের ক্ষতি, সাম্প্রতিক নানা ঘটনায় জঙ্গলমহলে আদিবাসীদের ক্ষোভ সামাল দিতে পুলিশ-প্রশাসন ব্যর্থ বলে ক্ষোভ জানান তিনি। আমলাদের পাশাপাশি বিস্তর বকাঝকা করেন দলের নেতা-মন্ত্রীদেরও। ধমক খান জেলাশাসক ও ঝাড়গ্রামের আইসি তানাজি দাস।

আরও পড়ুন:ঋতব্রতের নামে এ বার দায়ের ধর্ষণের অভিযোগ

মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানান, ডিএম-এসপিদের উপর নির্ভর করে একটা জেলা। তাঁরাই সরকারের মুখ। কোনও সমস্যায় ডিএম-এসপি তৎক্ষণাৎ সক্রিয় হলে তা মিটে যায়। কিন্তু ঝাড়গ্রামে তেমনটা হয়নি। মমতার কথায়, “আগুন লাগলে সঙ্গে সঙ্গে জল ঢালতে হয়। পাঁচ মিনিট দেরি করলে সব জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।” মুখ্যমন্ত্রীর উপলব্ধি, জঙ্গলমহলের আমজনতার মনের খবরই রাখে না ঝাড়গ্রাম জেলা প্রশাসন ও তাঁর দলের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। এই সূত্রেই এ দিনের বৈঠকে দলনেত্রীর ধমক খান মন্ত্রী চূড়ামণি মাহাতো। মমতা তাঁকে বলেন, ‘‘তুমি ঠিকমতো কাজ করছ না। তোমার নামে অভিযোগ পাচ্ছি।’’ মন্ত্রী জানান, প্রশাসনের কর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেই চলছেন তিনি। মমতা পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘‘আগে তো চাষবাস করতে, এখন করো না?’’ মন্ত্রীর ‘না’ জবাবে ক্ষুব্ধ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘জমিতে কাজ করলে তবেই তো মানুষের কথা জানবে। রাস্তায় নেমে কাজ করো।’’

এর কিছুক্ষণ পরেই তৃণমূলের  ঝাড়গ্রাম জেলা সভাপতির পদ থেকে সরানো হয় চূড়ামণিকে। বিধায়ক সুকুমার হাঁসদাকে জেলা কার্যকরী সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পদ হারানো প্রসঙ্গে পরে ফোনে জিজ্ঞাসা করা হলে চূড়ামণির মন্তব্য, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি। দল যা চাইবে তাই হবে।’’

গত কয়েক মাসে ঝাড়গ্রামের আদিবাসী-মূলবাসীদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভের চোরাস্রোত বয়েছে। এলাকার একটি স্কুল নিয়ে আদিবাসী সমাজের নালিশ, সর্বত্র অলচিকিতে পড়াশোনার ব্যবস্থা না হওয়াজনিত ক্ষোভ, বঞ্চনার অভিযোগে হুল দিবসের সরকারি অনুষ্ঠান বয়কট, নানা দাবিতে কুড়মালি সমাজের অবরোধ কর্মসূচি ‘ডহর ছেঁকা’র সাক্ষী থেকেছে জঙ্গলমহল। এ সবে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন গোয়েন্দারাও। সূত্রের খবর, আদিবাসী ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে পুরনো কায়দায় জঙ্গলমহলে অশান্তি বাধানোর চেষ্টা হচ্ছে।

এই অবস্থায় আমলা-মন্ত্রীদের ধমকে, দলীয় সংগঠন ও প্রশাসনে রদবদল করে মমতা বুঝিয়ে দিয়েছেন, ‘জঙ্গলমহলের হাসি’ ধরে রাখতে তিনি কতখানি সক্রিয়। তিনি বলেন, ‘‘জঙ্গলমহল খুব সেনসিটিভ। আমি কোনও অভিযোগ শুনতে চাই না। মানুষের সমস্যা হলে ডেকে মেটাতে হবে। সরকারের যেন বদনাম না হয়।’’